advertisement
advertisement

রাজপথে বাড়ছে ভুখা মানুষের স্রোত

দিনমজুর ও ভাসমান রাজধানীবাসী

সানাউল হক সানী
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ১০:৪৭
advertisement

খুনহারা মুখে, ম্লান মরাচোখে/প্রাণঝরা শোকে, বুকফাটা দুখে/ক্ষুধায় কোঁকাই মোরা বেকার মজুর। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে লেখা কবি দিলওয়ারের কবিতার মতোই কর্মহীন লাখ লাখ শ্রমিকের চোখ এখন মøান, মরা; ক্ষুধায় কাতর। করোনার প্রাদুর্ভাবে পুরো দেশ কার্যত লকডাউনে। দুমুঠো খাবার জোগাতে পথে পথে ঘুরছে কর্মহীন মানুষ। ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষের বেঁচে থাকার এ প্রাণান্ত লড়াইয়ে কেউ কেউ বাড়িয়ে দিচ্ছেন সহায়তার হাত।

তবে তা তাদের অভাব ঘোচানোর জন্য পর্যাপ্ত নয়। কাজেই রাজধানীর রাজপথে ভুখা মানুষের স্রোত ক্রমেই বাড়ছে। চলমান অচলাবস্থা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এ স্রোতও তত বাড়বে; নির্মাণ শ্রমিক, বাসাবাড়ির কাজের মানুষ, ভ্যান-রিকশা চালক, ফুটপাতের দোকানদারসহ ছিন্নমূল ও ভাসমান মানুষের বেঁচে থাকা ততই কষ্টকর হয়ে পড়বে।

মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস রোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সরকারি বেসরকারি অফিস আদালতসহ সবকিছুই এখন বন্ধ। ফলে বেকার হয়ে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছেন তারা। সরকার ত্রাণ দিলেও অনেকেই তা পাচ্ছেন না। অনেকেই খাদ্য জোগান দিতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছেন। দ্বারে দ্বারে হাত পাতছেন কেউ কেউ। বিশেষ করে

রাজধানীতে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করা নিম্ন আয়ের মানুষেরা রয়েছে বেশি বিপদে। অনেকদিন ধরেই তারা কোনো কাজ পাচ্ছেন না। কাজ না থাকায় তাদের উপার্জনও বন্ধ। ফলে পরিবার-পরিনজন নিয়ে এ মানুষগুলো দিনযাপন করছে উৎকণ্ঠায়।

গতকাল মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় দেখা মেলে শফিকুল ইসলাম নামের এক মাঝ বয়সী নির্মাণ শ্রমিকের। দুপুরের ত্রাণের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বলেন, চারজনের সংসার। আয়-রোজগার বন্ধ পনেরো দিন। প্রথম কয়েকদিন জমানো টাকায় চলতে পারলেও এখন ফুরিয়েছে সব। তাই হাত পাততে হচ্ছে মানুষের কাছে। দুপুরে অনেকেই খাবার দেয়। নিজে খাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের জন্যও নিতে হয়। কখনো খাবার পাই, আবার কখনো পাই না।

কেবল নির্মাণ শ্রমিকই নয়, রাজধানীতে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে কাজ করে বিপুলসংখ্যক মানুষ। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এসব মানুষও কর্মহীন। ফলে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে তারা।

ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে এখন ২৫ লাখ গৃহকর্মী বা গৃহশ্রমিক আছেন। ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপে বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ লাখ গৃহকর্মী রয়েছেন? এর মধ্যে ঢাকা শহরে বিভিন্ন বাসায় নিয়োজিত আছে প্রায় দুই লাখ গৃহশ্রমিক।

লালবাগের দুটি বাসায় রান্নার কাজ করেন খাদিজা বেগম নামের এক স্বামী পরিত্যক্তা নারী। দুই সন্তান নিয়ে থাকেন বস্তিতে। তবে গত তেরো দিন ধরে কাজ বন্ধ। সামনের দিনে এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কীভাবে বেঁচে থাকবেন তা জানেন না খাদিজা। এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের সাহায্য পাননি তারা।

ইতোমধ্যে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসব অসহায় মানুষকে নানা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তবে এসব কর্মহীন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে অসচেতন বিধায় সে সাহায্যও মিলছে না।

কেবল নির্মাণ শ্রমিক ও গৃহশ্রমিকই নয়, রিকশাচালক, বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় মসলা বাটা, পানি সরবরাহ করা, কাগজ ও পানির বোতল কুড়িয়ে বিক্রি করা, ঘুরে ঘুরে পান, বিড়ি-সিগারেট বিক্রি করা, বিভিন্ন বেসরকারি অফিস ও দোকানে ফুটফরমায়েশ খাটা অসংখ্য মানুষও রয়েছেন বিপদে। এদের মধ্যে কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে নানা সহায়তা পেলেও অনেকেই এ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

রাজধানীতে সরকারি ও সিটি করপোরেশনের ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কাউন্সিলরা। তবে এ ক্ষেত্রেও বাদ যাচ্ছেন প্রান্তিক পর্যায়ের এসব মানুষ। কেন না এসব মানুষ মূলত সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার নন। এ ক্ষেত্রে বাদ পড়ছে ছিন্নমূল মানুষরা। এ ধরনের মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত তার সঠিক কোনো তালিকা নেই সরকারের কাছেও।

advertisement