advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আসলে কী, কেন অতিজরুরি

মেহেনাজ হাসান ও জাহাঙ্গীর আলম
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ১৯:২৭
advertisement

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রতিরোধ ও ঝুঁকি প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকেন্দ্র (সিডিসি) অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনায় সোশ্যাল ডিসট্যান্সিংকে সংজ্ঞায়িত করেছে এভাবে- ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং হলো গণজমায়েত থেকে দূরে থাকা, জনসমাগম এড়িয়ে চলা এবং যখনই সম্ভব অন্যের থেকে দৈহিক দূরত্ব (প্রায় ৬ ফুট বা ২ মিটার) বজায় রাখা।’

এই সংজ্ঞার আলোকে এটা প্রতীয়মান যে, আমরা ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ অভিধাটির বাংলা পরিভাষায় শুধু শারীরিক দূরত্বকে ইঙ্গিত করতে পারি না; এর চেয়ে বেশি কিছু বোঝানো হচ্ছে এ শব্দযুগল দ্বারা। এর পরিচ্ছন্ন পরিভাষা হতে পারে, ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’।

সিডিসির নির্দেশনায় গণজমায়েত (কংগ্রিগেট সেটিং) বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘অন্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হতে পারে এমন জনাকীর্ণ জায়গা, যেমন শপিংমল, সিনেমা হল, স্টেডিয়াম।’

আর ঘনিষ্ঠ যোগোযোগ (ক্লোজ কন্ট্যাক্ট) বলতে বোঝানো হয়েছে, ‘কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির (বা প্রাণীর) থেকে ছয় ফুট (বা দুই মিটার) দূরত্বের মধ্যে সংস্পর্শে থাকা।’

ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ এড়াতে ‘অন্তত তিন ফুট’ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।

যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যান্ডারবিট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগব্যাধি বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম শাফনার মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনকে বলেছেন, ‘ছয় ফুট দূরত্ব’ বজায় রাখার এই নীতিটা এসেছে শ্বসন শারীরতত্ত্ব থেকে। শাফনার ব্যাখ্যা করছেন, ‘নিঃশ্বাস ফেলার সময় আমরা যদি না কাশি বা না হাঁচি, তা হলে পরস্পরের মধ্যকার তিন থেকে ছয় ফুট দূরত্বকে শ্বাসবান্ধব বলয় বলা হয়।’

আমাদের নিঃশ্বাস বাতাসে মিশে যায়। ফলে হাঁচি বা কাশি দিলে নিশ্বাসের এই বাড়তি ফোঁটাগুলোও (ড্রপলেট) বায়ুতে মিশে যাবে। তাই, বলছেন শাফনার, ‘যদি আপনি আমার থেকে ৩-৬ ফুট দূরত্বের মধ্যেই থাকেন, তা হলে আমি যে নিশ্বাস ত্যাগ করব, হয়তো আপনি শ্বাস নেওয়ার সময় তার কিছু অংশ আপনার প্রশাসের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। আর যদি আমি ভাইরাসে আক্রান্ত হই, তা হলে আমার শ্বাসত্যাগের সময় আনুবীক্ষণিক ভাইরাসও বের হবে।’

এ ক্ষেত্রে হুর পরামর্শ হলো শ্বসন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। এর মানে হলো কাশি বা হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ ও নাকের সামনে বাঁকানো কনুই কিংবা টিস্যু ধরা। কারণ হাঁচি-কাশির ফোঁটা ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম। আক্রান্ত ব্যক্তি তাই শ্বসন স্বাস্থ্যবিধি না মানলে তার সংস্পর্শে আসা সুস্থ ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে।

খুব সরলীকরণ করলে, সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং অভিধাটি দিয়ে ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শ বা যোগাযোগ থেকে বিরত থাকার কথা বলে। যে জন্য তিন থেকে ছয় ফুট (বা হুর ভাষায়, ন্যূনতম তিন ফুট) শারীরিক দূরত্ব (ফিজিক্যাল ডিসটেন্স) বজায় রাখতে হবে।

কিন্তু দূরত্বের চেয়ে বেশি কিছুর ধারণা দেয় সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, যা সিডিসির সংজ্ঞাতেই স্পষ্ট- যে কোনো গণজমায়েত ও জনসমাগম থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া।

২০১৫ সালে প্রকাশিত মডেলিং টু ইনফর্ম ইনফেকশাস ডিজিজ কন্ট্রোল গ্রন্থে নিলস বেকার পাঁচটি পদক্ষেপের কথা বলেছেন, যা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অন্তর্ভুক্ত। এগুলো হলো- এক. জনসমাগমস্থলে (পাবলিক প্লেস) যাওয়া থেকে বিরত থাকতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা; দুই. আক্রান্তদের অন্তরীণ করা; তিন. আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসাদের সঙ্গরোধে রাখা; চার. স্কুল বন্ধ করা এবং পাঁচ. জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা।

দি আটলান্টিকে প্রকাশিত দ্য ডুজ অ্যান্ড ডোন্ট’স অব ‘সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং’ প্রবন্ধে লেখক কেটলিন টিফানিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করতে হলে জনসমাগমস্থল এড়িয়ে চলতে হবে; পুনর্মিলনী বা বাসায় সামাজিক আয়োজন স্থগিত রাখতে হবে, সামাজিক অংশগ্রহণ যতটা সম্ভব কমাতে হবে; জিমে না যাওয়া, বাজারসদাই করতে গেলে বেশি সংখ্যক ক্রেতা থাকলে বাইরে অপেক্ষা করা, জরুরি এবং কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার বাধ্যতা না থাকলে গণপরিবহন ব্যবহার না করা ইত্যাদি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বৃহৎ অর্থকে প্রকাশ করে।

যেমনটা বলেছেন মার্কিন মহামারী রোগ বিশারদ জেনিফার হর্নি। ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ারের এই অধ্যাপক এ প্রবন্ধের দ্বিতীয় লেখককে এক ইমেইল আলাপে বলেন, ‘কোভিড-১৯ রোগটি যেহেতু নতুন এক ভাইরাসের সংক্রমণ, এই মুহূর্তে টিকা বা অন্য কোনো চিকিৎসাবিধি আমাদের জানা নেই মানুষকে যা এ সংক্রমণের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। সুতরাং [এখন] আমাদের অবশ্যই অনৌষধী (নন-ফার্মাসিউটিক্যাল) অন্য পদক্ষেপের ওপর ভরসা করতে হবে। যেমন অসুস্থ ব্যক্তিদের অন্তরীণ (আইসোলেশন) করা, তাদের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গরোধ (কোয়ারেন্টিন) করা, স্বেচ্ছায় সব অনুষ্ঠান বাতিল করা এবং লোকেরা সাধারণত যে জায়গাগুলোয় জড়ো হয় সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া। জনসমাজের এসব উদ্যোগকে একত্রে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।’

অন্তরীণ ও সঙ্গরোধ নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়; কিন্তু সামাজিক বিচ্ছিন্নতার নির্দেশনা কথাটা একটা গোত্রের বা দেশের সব মানুষের ওপর জারি করা হয়।

একটি বৈশ্বিক মহামারী ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা

১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নিয়েছিল। টাউবেনবার্গার ও মোরেন্স ২০০৬ সালে এমারজিং ইনফেকশাস ডিজিজ জার্নালে স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত এ মহামারীকে ‘সব বৈশ্বিক মহামারীর মা’ বলে অভিহিত করেন। তারা বলেন, ‘ওই মহামারীতে তখন বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। মারা গিয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ।’

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে এক প্রবন্ধে স্ট্রকলিক ও চ্যামপিন অবশ্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি মানুষ মারা যাওয়ার কথা লিখেছেন। ২০০৭ সালে জার্নাল অব দি আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনে এক প্রবন্ধে মারকেল ও তার সতীর্থ গবেষকরা জানান, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই মারা গিয়েছিল সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ।

এই মহামারী ১৯১৮ সালের জানুয়ারির থেকে ১৯২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। মারকেলের দল ৮ সেপ্টেম্বর ১৯১৮ থেকে ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ পর্যন্ত ২৪ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩টি শহরে মহামারীতে মৃত্যুহার নিয়ে গবেষণা করেছেন। নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জায় এ সময় দেশটিতে এক লাখের বেশি মানুষ মারা যায়। এক লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে শহরপ্রতি গড়ে মৃত্যুসংখ্যা ৫০০।

কিন্তু পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়া শহরে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার ছিল লাখে ৮০৭ জন। এর তুলনায় মিসৌরির সেন্ট লুইসে মৃত্যুহার অর্ধেকেরও কম ছিল, লাখে ৩৫৮ জন।

‘এই তারতম্য, মারকেলদের ভাষায়, ‘সত্যিই ভাববার বিষয়।’ এবং তারা দেখিয়েছেন, কীভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কৌশল মৃত্যুহার দমিয়ে রেখেছিল সেন্ট লুইসে।

মারকেলরা দেখিয়েছেন, যেসব শহর অনৌষধী পদক্ষেপ আগেভাগে এবং বৃহৎ পরিসরে গ্রহণ করেছিল, সেসব শহরে প্রাণহানি কম ঘটেছে এবং চূড়ান্ত মৃত্যুহার দেরিতে ঘটেছে। তারা লিখেছেন, ‘ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে শ্বাসনালির রোগের সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা।’

হ্যাচেট ও তার দল প্রসেডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস সাময়িকীতে লিখেছেন, ১৯১৮ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রথম রোগী ধরা পড়ে ফিলাডেলফিয়ায়। কিন্তু জনসমাবেশ বন্ধ করার গুরুত্ব উপেক্ষা করে কর্তৃপক্ষ। এমনকি ২৮ সেপ্টেম্বর শহরে যোদ্ধাদের কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়েছিল (স্ট্রকলিক ও চ্যামপিনের তথ্যমতে, এ মহড়া দেখতে দুই লাখ লোক জড়ো হয়েছিল)। এর পর যখন রোগীতে ভরে গেল শহরের হাসপাতালগুলো, ৩ অক্টোবরে স্কুল বন্ধ করা ও গণজমায়েত নিষিদ্ধ করাসহ সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পদক্ষেপ নিল শহর কর্তৃপক্ষ।

আর সেন্ট লুইসে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৫ অক্টোবর। ৭ অক্টোবরেই তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কৌশল প্রয়োগ ও কার্যকর করা শুরু করে।

মার্কিন মহামারী রোগ বিশারদ স্টিফেন মোর্স ২০০৭ সালে প্যানডেমিক ইনফ্লুয়েঞ্জা : স্টাডিং দ্য লেশনস অব হিস্ট্রি প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘১৯১৮ সালে শল্যমাস্ক থেকে শুরু করে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা পর্যন্ত- বেশকিছু অনৌষধী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অংশ হিসেবে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, জনাসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, অসুস্থদের হয় হাসপাতালে অন্তরীণ করা হয়েছিল কিংবা তাদের বাসায় থাকার জন্য উৎসাহী করা হয়েছিল।’

একাধিক ভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে মোর্স বলেন, ‘গবেষণাগুলো অনৌষধী পদক্ষেপের কৌশলগুলোর মূলভিত্তি হিসেবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সাধারণ ধারণাকেই সমর্থন করে।’

সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সূত্র

অনৌষধী পদক্ষেপ হিসেবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কতখানি ভূমিকা রাখতে পারে, একটি সূত্র থেকে তা আমরা সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। মডেলিং টু ইনফর্ম ইনফেকশাস ডিজিজ কন্ট্রোল গ্রন্থে নিলস বেকার সে বিষয়ে বিস্তর আলোকপাত করেছেন। সূত্রটি এ রকম : R* = [1 - (1 - a2) f ] Ro।

এখানে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মেনে না চললে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা হলো Ro। আর সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পদক্ষেপ কার্যকরের পর যে সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে, R* হলো সেই সংখ্যা। শতকরা যে পরিমাণ লোক সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মেনে জনসমাগম ও জনসমাবেশ এড়িয়ে চলবে, সেই অংশকে f দিয়ে সূচিত করা হয়। এই লোকরা আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ শতকরা যতভাগ করবে, a হলো সেই অংশের মান।

সূত্রটি থেকে দেখা যায়, a এর মান যত বেশি হবে এবং f এর মান যত কম হবে, R* এর মান ততই বাড়বে। আর a এর মান যত কম হবে এবং f এর মান যত বেশি হবে, R* এর মান ততই কমবে।

যেমন ধরা যাক, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা না মানলে একটা অঞ্চলের ১০০ জন মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হলো। এবার এদের মধ্যে যদি ২৫ ভাগ মানুষ বাইরে যাওয়া বাদ দেয় কিন্তু পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আগের তুলনায় ৭৫ ভাগ বজায় রাখে তা হলে ৮৯ জন মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত হবে।

আর এমন যদি হয়, ৭৫ ভাগ মানুষ বাইরে যাওয়া বন্ধ করল এবং পরস্পরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আগের তুলনায় ২৫ ভাগ রাখল তা হলে আক্রান্ত হবে মাত্র ২৯ জন।

এই সূত্র স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে, আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ আগের মতোই শতভাগ বজায় রাখলে ঝুঁকিতে থাকা শতভাগ মানুষই আক্রান্ত হবে। আর এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ শূন্য হলে মানে সবাই যদি সবার সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখে, তা হলে কেউই আক্রান্ত হবে না।

পরিবর্তিত সামাজিকতা

আমেরিকা’জ ফরগোটেন প্যানডেমিক : দি ইনফ্লুয়েঞ্জা অব নাইনটিন এইটটিন গ্রন্থে মার্কিন ইতিহাসবিদ আলফ্রেড ক্রসবি লিখেছেন, ‘১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় জনস্বাস্থ্যপ্রধান উইলিয়াম এইচ স্টুয়ার্ট অভয় দিয়ে বলেছিলেন, আমরা সংক্রামক ব্যাধিকে কবর দিয়েছি। তিন বছর পর, ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব ইনফেকশাস ডিজিজ গ্রন্থের চূড়ান্ত সংস্করণে লেখক ও নোবেলজয়ী [ভাইরাসবিদ] ম্যাকফারলেন বারনেট সিদ্ধান্ত টানেন, সংক্রামক ব্যাধির ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্ভাব্য পূর্বাভাস হলো, এরা খুব নিস্তেজ হয়ে পড়বে।’

কিন্তু এর পর আশির দশকেই আমরা দেখেছি এইডস, এখনো যে মহামারী বিশ্বব্যাপী রয়ে গেছে; হুর তথ্যমতে, এ রোগে তিন কোটির বেশি মানুষ মারা গেছে। ২০০৩ সালের সার্স করোনা ভাইরাস মহামারীতে মারা গেছে ৭৭৪ জন; ২০০৯ সালের সোয়াইন ফ্লু মহামারীতে ১৮ হাজার ৩৬ জনের মৃত্যু হয়; ২০১২ সালের মার্স মহামারীতে মারা গেছে ৮৫৮ জন।

মোর্স বলেছেন, বেশিরভাগ ভাইরাসবিদের ধারণা, প্রতি শতাব্দীতে আমরা অবধারিতভাবে একটা না একটা বৈশ্বিক মহামারীর মুখোমুখি হব। এমনকি একাধিক অতিমারীর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ডলফিনসহ আরও অনেক প্রাণীর মধ্যে ‘সামাজিকতা’ থাকলেও মানুষ নিজেকে আলাদ দাবি করে ‘সামাজিক জীব’ হিসেবেই। সেই সামাজিকতাই এখন উপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে দ্বিপদী এ প্রাণীটি। অবশ্য ‘বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণী’ এবং ‘ভবিষ্যৎদ্রষ্টা’ হিসেবেও মানুষ গর্ব করে থাকে। সেই দিক থেকে পরিস্থিতি বুঝে কৌশলী হওয়াটাও তার বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ বটে।

এবং চার্লস ডারউইনের ভাষায়, যোগ্যই জিইয়ে থাকবে এ ধরাধামে। মানুষ বহু পরীক্ষা দিয়েছে অতীতে। হয়তো নতুন করোনা ভাইরাসের সঙ্গে লড়াইয়ে সামাজিক বিচ্ছিন্নতাই তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে।

মানুষ যোগাযোগপ্রিয় প্রাণী। যোগাযোগ অনস্বীকার্য এবং অবশ্যাম্ভাবীও। কিন্তু প্রাণঘাতী ভাইরাসে প্রকম্পিত পৃথিবীর এই মহাসংকটকালে সত্যিকার অর্থে ‘মুখোমুখি বসিবার’ বুঝি আর দরকার নেই। এখন ‘সামাজিক বিচ্ছিন্নতা’র কৌশলই কাম্য। এটাই এখন ‘পরিবর্তিত সামাজিকতা’।

মেহেনাজ হাসান ও জাহাঙ্গীর আলম : শিক্ষার্থী, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

advertisement