advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ফিরিয়ে আনতে হবে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:৫২
advertisement

করোনা ভাইরাসের ‘বিশ্বমহামারী’ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-সতর্কতার নজিরবিহীন বেহালের মাঝেই পার হয়ে গেল এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ৪৯তম বার্ষিকী। পাকিস্তানের শাসনামল এবং একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধও ছিল করোনা ভাইরাসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ। ‘রোগ সংক্রামক, স্বাস্থ্য নহে’Ñ এটি সত্য হলেও আরও বড় সত্য হলো ‘শেষ পর্যন্ত সত্যের (তথা স্বাস্থ্যের) জয় হবেই।’ একাত্তরেও তেমনই হয়েছিল। করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও শেষ পর্যন্ত তেমনই ঘটবে বলে আমার বিশ্বাস। এই দুর্যোগ মোকাবিলার কাজের মাঝেও আজ মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই লিখছি।

জাতি হিসেবে গৌরব করার মতো আমাদের যা কিছু আছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, একাত্তরের বীরত্বপূর্ণ বিজয়ের অনন্য গৌরবগাথা। একাত্তর জাতিকে এনে দিয়েছিল এক ঐতিহাসিক বিজয়, বাঙালির ললাটে এঁকে দিয়েছিল গৌরবের তিলক। সেই বিজয়-গৌরবকে অবলম্বন করে জাতির সামনে উদ্ভাসিত হয়েছিল অনিন্দ্যসুন্দর এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন। ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধের’ সুখস্বপ্ন। দেশবাসী ভেবেছিল, আশা করেছিল, সেই সুখস্বপ্ন চির অম্লান থাকবে।

কিন্তু স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে জাতি আজ এ ক্ষেত্রে এক কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন। একাত্তরের অমূল্য বিজয়ের সেই গৌরবের সুধা কি জাতি ধরে রাখতে পেরেছে? এই প্রশ্নের দ্ব্যর্থহীন জবাব হচ্ছে, না! পারেনি। অমূল্য বিজয়ের সেই ফসল দেশবাসীর ঘরে ঘরে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। পরাজয়ের গ্লানি ও হতাশার দুঃখবোধ দেশের মানুষকে আজ তাই তীব্রভাবে দংশন করে চলেছে।

এই গ্লানি আর দুঃখবোধের জন্য একাত্তরের বিজয় দায়ী নয়। দায়ী একাত্তর-পরবর্তী প্রায় পাঁচ দশকের ঘটনাবলি। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিচার করে আজ এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, একাত্তরের অর্জিত বিজয়সম্ভার পঞ্চাশ বছরে আরও সমৃদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ধারা আরও দৃঢ়মূল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি সেদিনের বিজয় ও সাফল্যগুলো পরিপূর্ণভাবে ধরে রাখাও সম্ভব হয়নি। কোনো কিছুতে লক্ষ্য অর্জন করতে না পারা কিংবা অর্জনের পর সেই পথ ধরে আরও এগিয়ে না যেতে পারা নিঃসন্দেহে বেদনাবহ। কিন্তু কিছু একটা অর্জনের পরে তা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার গ্লানি ও যন্ত্রণা অপরিসীম। জাতির জন্য তা একটা কলঙ্ক।

জাতির এই কলঙ্ক, জনগণের এই গ্লানি ও যন্ত্রণা মোচন করতে হবে। বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার পথে দেশকে ফিরিয়ে এনে একাত্তরের স্বপ্ন তথা ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধের’ পুনর্জাগরণের দ্বারাই কেবল তা করা সম্ভব হতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তী বছরের আগমনকে সামনে রেখে এটিই আজ জাতির সামনে ঐতিহাসিক ও প্রধান কর্তব্য।

একাত্তরের বিজয়ী মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সংগঠিত হয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার ও প্রগতির পথে বিকশিত হওয়ার অমূল্য সুযোগ এনে দিয়েছিল। বিজাতীয় শক্তির ঔপনিবেশিক রাজনৈতিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে আমরা সেদিন যে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম, সেই রাষ্ট্রে সাম্য, মৈত্রী, শান্তি, স্বাধীনতা ও প্রগতির পথে নবজীবনের সূচনা করার সম্ভাবনা ও পথরেখা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেশকে প্রগতির সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে দেওয়া হয়নি।

দেশবাসীর দীর্ঘকালের গণসংগ্রামে লালিত চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের মরণপণ প্রত্যয় ও দেশবাসীর সম্মিলিত আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তাকে বহুলাংশে প্রতিফলিত করে আমরা আমাদের দেশের সংবিধান রচনা করেছিলাম। বাহাত্তরে রচিত সেই সংবিধানের মূল মর্মবাণীর মাঝেই প্রতিফলিত হয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক অর্জনের ধারা। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাÑ ঘোষণা করা হয়েছিল যে, এই চারটি নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে।

অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ‘জাতীয়তাবাদের’ প্রত্যয়ের মাঝে ছিল গভীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী উপাদান। যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে, যার ঔপনিবেশিক ধরনের শোষণ-শাসনের জিঞ্জির ভেঙে আমরা বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিলাম, সেই পাকিস্তান ছিল আমেরিকাসহ বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের পদলেহী একটি রাষ্ট্র। ‘পাকিস্তান আন্দোলন’ ছিল সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রমূলক খেলার সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা। রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এই রাষ্ট্রটি হয়ে উঠেছিল সাম্রাজ্যবাদের ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-সামরিক আধিপত্যবাদী স্ট্র্যাটেজির একটি প্রধান হাতিয়ার। সিয়াটো, সেন্টো ও বিভিন্ন পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তির বদৌলতে পাকিস্তান হয়ে উঠেছিল বিশ্বের এই অঞ্চলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের একটি সামরিক ও রাজনৈতিক আউটপোস্ট। পাকিস্তান পরিণত হয়েছিল মার্কিন ও সাম্রাজ্যবাদী পুঁজির অবাধ শোষণের লীলাক্ষেত্রে।

পাকিস্তানি আমলে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মহলের কোনো কোনো অংশের মধ্যে এমন একটি ভ্রান্তি ও মোহ ছিল যে, সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর কাছে তদবির ও দেনদরবার করে বাঙালির স্বাধিকার আদায় করে নেওয়া যাবে। যেভাবে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের তোয়াজ করে ও তাদের ষড়যন্ত্রের সহযোগী হয়ে ভারত ভেঙে আদায় করা সম্ভব হয়েছিল পাকিস্তান। কিন্তু দেনদরবারে কাজ হয়নি। স্বাধীনতার জন্য জনগণকে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। লড়াই করতে হয়েছিল প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। একাত্তরের সংগ্রাম পরিণত হয়েছিল বাঙালি জাতির সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে। এই জাতীয় মুক্তির অন্তর্নিহিত মর্মবাণীকে অবলম্বন করেই মুক্তিযুদ্ধের ‘জাতীয়তাবাদকে’ অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতিরূপে সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়েছিল।

জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সে পথে নবপ্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নবপ্রতিষ্ঠিত বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী সরকার ও শাসক দল ছিল দুর্বল ও দোদুল্যমান। আর পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই পথ সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে দেশকে উল্টো পথে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। দেশকে বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল পথ ধরেই দেশ এখনো চলছে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতীয় বৃহৎ পুঁজির ও হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক শাসকচক্রের আধিপত্য। একই সঙ্গে চলছে সৌদি আরবসহ প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক ও মার্কিন অনুগত রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অশুভ মিতালি। প্রায় পাঁচ দশকের বুর্জোয়া শাসন এ দেশকে এখন সাম্রাজ্যবাদ-আধিপত্যবাদনির্ভর একটি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।

পাকিস্তান ছিল সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারীÑএকনায়কত্ববাদী ব্যবস্থায় পরিচালিত একটি রাষ্ট্র। ভাষার অধিকার, ভোটাধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মৌলিক নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলোর গ্যারান্টিÑ পাকিস্তানে এসব ছিল নির্বাসিত। সত্তরের নির্বাচনের গণরায়কে কার্যকর হতে যখন বাধা দেওয়া হয়েছিল, তখনই তার প্রতিবাদে গর্জে উঠেছিল এ দেশের জনগণ। নির্বাচনের গণরায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনেই বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হয়েছিল। পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসন পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সমাজ ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। জনগণের মৌলিক অধিকারগুলোর অলঙ্ঘনীয় নিশ্চয়তা, আইনের শাসন, নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও পার্লামেন্টারি শাসনব্যবস্থা, পূর্ণ কর্তৃত্ববান নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার, সব নাগরিকের জন্য অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থানের নিশ্চয়তা, বৈষম্যের অবসান ইত্যাদি ছিল জনগণের প্রত্যাশা। সেসব ব্যবস্থার আলোকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতিরূপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ‘গণতন্ত্র’।

কিন্তু গণতন্ত্রের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় করার বদলে তাকে ক্রমাগতভাবে দুর্বল করা হয়েছে। পঁচাত্তরের পর দেশে সরাসরি কিংবা বেসামরিক লেবাসে সামরিক বাহিনীর শাসন-কর্তৃত্ব চালু থেকেছে। বছরের পর বছর ধরে আনুষ্ঠানিকভাবে লালিত হয়েছে স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তি। নব্বইতে রক্ত দিয়ে সামরিক স্বৈরশাসন উচ্ছেদ করে নির্বাচিত বেসামরিক সরকার ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও গণতন্ত্রের পথে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো ক্রমাগত সংকুচিত ও খর্ব করা হচ্ছে। এমনকি জনগণের ‘ভোটাধিকার’ কার্যত সম্পূর্ণভাবে হরণ করে ‘নির্বাচন ব্যবস্থাকে’ তামাশায় পরিণত করা হয়েছে। স্বৈরাচারের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভিত্তির মূল উপাদানগুলো এখনো বহাল রাখা হয়েছে। চলছে লুটপাটের অর্থনীতি, লুটের ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সংঘাত, অপরাধমূলক ও কুৎসিত অপরাজনীতির সব খেলা, রাজনীতিতে নমিনেশন বাণিজ্য-টাকার খেলা-ক্যাডার লালন ইত্যাদির রোগাক্রান্ত দাপট। চলছে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের আধিপত্য।

পাকিস্তানি আমল থেকেই দেশবাসীকে সংগ্রাম করতে হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও ‘ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে। তাই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকারকে বিভাজিত করার কোনো সুযোগ থাকতে পারে না। হিন্দু-মুসলমান, আমির-ফকির, বাঙালি-আদিবাসী নির্বিশেষে এ দেশে বসবাসকারী সব নাগরিকই রাষ্ট্রের সামনে হবে সমান অধিকার ও মর্যাদাসম্পন্ন। ‘ধর্ম যার-যার, কিন্তু রাষ্ট্র সবার’Ñ এই নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ চলবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এটিকেই ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বলা হয়ে থাকে। পাকিস্তানের মতো ধর্মভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক ভেদনীতি ধরে দেশ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়নি। পাকিস্তানি আদর্শে রচিত দ্বিখ-িত এক ‘বাংলাস্থান’রূপী নব্য পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য শহীদরা বুকের রক্ত ঢালেননি। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যয় ছিল স্পষ্ট। স্বাধীন বাংলাদেশ চলবে অসাম্প্রদায়িক ধারায়। সেই অনুসারে সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয় ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে।

কিন্তু সে পথে দেশকে অগ্রসর হতে দেওয়া হয়নি। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা প্রভৃতিকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাজকর্মে প্রবেশ করানো হয়েছে। শুধু সাম্প্রদায়িক অপশক্তিই নয়, উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী কালোশক্তিকেও ভিত রচনার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতাকে ভিত্তি করে বিপজ্জনক অন্ধকারের কালোশক্তির থাবার বিস্তার ঘটেছে। অমুসলিম আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চলছে অত্যাচার, বৈষম্য। সামরিক শাসনামলে সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ মর্মে যে বিধান যুক্ত করা হয়েছিল তা এখনো বহাল রাখা হয়েছে। বুর্জোয়া দলগুলো ‘কে বেশি ইসলাম পছন্দ’ তা নিয়ে পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে থাকছে। সাম্প্রদায়িতার সামাজিকীকরণ ঘটে চলেছে।

পাকিস্তান রাষ্ট্র ছিল সাম্রাজ্যবাদ, একচেটিয়া পুঁজি ও সামন্তবাদের নিয়ন্ত্রিত আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় পরিচালিত। সাধারণ মানুষ জাতিগত শোষণের পাশাপাশি শ্রেণিগত শোষণে নিষ্পেষিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধ তাই জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামের পাশাপাশি হয়ে উঠেছিল বাংলার শোষিত মানুষের শোষণমুক্তিরও লড়াই। শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম এ দেশে পরিচালিত হচ্ছিল বহু বছর ধরে। সমাজতন্ত্র হয়ে উঠেছিল জনপ্রিয় সেøাগান। পাকিস্তানের পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে সমাজতন্ত্রের ধারায় স্বাধীন দেশকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নিয়ে পরিচালিত হয়েছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। তা ছাড়া নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিলেন ও শহীদ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে শ্রমিক-কৃষক মেহনতি মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৮০%)। সংবিধানে তাই অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ‘সমাজতন্ত্র’। ‘সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি’, সকলের জন্য ‘অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা’, ‘পরিকল্পিত অর্থনীতি’, ‘ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজ লাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা’ ইত্যাদি সুস্পষ্ট নির্দেশনা ‘সংবিধানে’ লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল। গত সাড়ে চর দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব নীতি পরিত্যাগ করে অবাধ মুক্তবাজার নীতির ভিত্তিতে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর লুটেরা পুঁজিবাদের পথ অনুসরণ করা হচ্ছে। এখনো সেই ধারাতেই অর্থনীতি চলছে।

রাষ্ট্রীয় চার নীতিকে পরিত্যাগ করে দেশকে এখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ধারার পরিপন্থী পথে পরিচালনা করা হচ্ছে। সেই চার নীতির ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ‘ভিশন-মুক্তিযুদ্ধ’। বর্তমানে এটিই হলো জাতির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কর্তব্য।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

advertisement