advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাকালে নারী ও শিশু

নাছিমা আক্তার জলি
৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ এপ্রিল ২০২০ ০০:৫২
advertisement

করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯! ভয়াবহ এক সংক্রমণ ব্যাধি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যাকে ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী মহামারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। ৪ এপ্রিল পর্যন্ত করোনার সংক্রমণে সারাবিশ্বে ৬০ হাজার ১১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, সংক্রমিত হয়েছে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ জন। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও আজ নিরাপদ নয়। রাজধানী শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামÑ সব এলাকাতেই রয়েছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি (একটি জাতীয় দৈনিক, ৪ এপ্রিল ২০২০)। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৮৮ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৯ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

আমরা মনে করি, এটি ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে দেশে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের নারী ও শিশুরা। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা মনে করি, যে কোনো মহামারীই নারী ও শিশুদের জন্য বিপদ ডেকে আনে, তাদের আরও পেছনে ফেলে দেয়।

আমরা মনে করি, তাৎক্ষণিকভাবে এবং শুধু সরকারের একার পক্ষে এত বড় দুর্যোগ মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। তাই এই বিপর্যয় এড়াতে সম্মিলিতভাবে সমাজের সব সচেতন নাগরিকের এগিয়ে আসতে হবে। দায়িত্ব নিতে হবে নিজের গ্রামের, নিজের এলাকার, নিজের দেশের। তবে সামর্থ্যরে বিবেচনায় করোনা ভাইরাস মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব সরকারের। তাই সরকারের কাছে আমরা আহ্বান জানাই, করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করুন এবং কর্মপরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করুন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়াসহ আরও নানা নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রভাব পড়ছে আমাদের শিশুদের দৈনন্দিন জীবনে। তাই হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সেবামূলক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার এবং করোনা ভাইরাস কীভাবে শিশুদের জীবনকে প্রভাবিত করে, সেটি সঠিকভাবে বোঝানোর জন্য তাদের সম্পৃক্ত করে কাউন্সেলিং কর্মসূচি শুরু করা দরকার। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুরা যাতে করোনা ভাইরাসের কারণে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং সুরক্ষা পায়, তা নিশ্চিত করা দরকার।

আমাদের জানামতে, করোনা ভাইরাস আতঙ্কের কারণে প্রচুর নারী গৃহকর্মী ও পোশাক শিল্পে কর্মরত কয়েক লাখ নারী সাময়িকভাবে তাদের চাকরি হারিয়েছেন। তাই এই সময় নারী গৃহকর্মী, দিনমজুর ও হতদরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে খাদ্যদ্রব্য জোগান ও তাদের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা দরকার এবং এই খাদ্যদ্রব্য ও আর্থিক সহায়তা যাতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যথাযথ ভুক্তভোগীরা পায়, তাও নিশ্চিত করা দরকার।

আমরা জানি, এখন আমাদের নারীদের একটি বড় সংখ্যা একই সঙ্গে ঘর সামলান এবং শিশুদের দেখাশোনা করেন। আমাদের আশঙ্কা যে, করোনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বিপুলসংখ্যক নারী তাদের চাকরি হারাবেন। কারণ যেসব পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন, তাদের একজনকে ঘরে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে পারিবারিক স্বার্থে নারীদেরই চাকরি ছাড়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সার্স, সোয়াইন ফ্লু, বার্ড ফ্লু ও ইবোলার মতো মহামারীগুলোর গবেষণার ফল বলছে, মহামারী-পরবর্তী প্রভাব নারীদের ওপরই বেশি পড়ে। পশ্চিম আফ্রিকায় দেখা গেছে, মহামারীর পর পুরুষরা আগের আয় দ্রুত বজায় রাখতে পেরেছেন, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে মহামারী-পূর্ববর্তী আয়ে ফিরতে অনেক সময় লেগেছে (একটি জাতীয় দৈনিক, ২৯ মার্চ ২০২০)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটুক, তা আমরা চাই না।

আমরা মনে করি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে নারীদের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা ও তাদেরকে তাদের পুরনো ভূমিকায় ফেরানোর দায়িত্ব নিতে হবে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে। পারিবারিক পর্যায়ে করোনাকালে এবং করোনা-পরবর্তী সময়ে পুরুষেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে নারীর পাশে থাকা, কাজ শেয়ার করা এবং সংকট নিরসনের পর নারীদের মনস্তাত্ত্বিক সহযোগিতা করার।

আমরা বিশ^াস করতে চাই, আমরা সবাই সচেতন হলে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে, বিত্তবানরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে এবং রাষ্ট্র ও সরকার দায়িত্ব নিলে আমরা করোনা ভাইরাসের এই বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হব। আর তা সম্ভব হলে ভালো থাকব আমরা সবাই, ভালো থাকবে, সুরক্ষিত থাকবে আমাদের নারী ও শিশুরা।

নাছিমা আক্তার জলি : পরিচালক, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট ও সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম

advertisement
Evaly
advertisement