advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

আক্রান্তের হারে উদ্বেগ

দুলাল হোসেন
৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২০ ১০:১১
দেশে করোনায় আক্রান্তের হার দেখে চিন্তায় রয়েছেন বিশেষজ্ঞরা
advertisement

দেশে বেড়ে চলেছে করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্তের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনা শনাক্ত হয়েছে দ্বিগুণ। একই সঙ্গে আক্রান্ত অঞ্চলের সংখ্যাও বেড়েছে। গতকাল আক্রান্ত জেলার সংখ্যা ছিল ১২। একদিনের ব্যবধানে সেটি বেড়ে হয়েছে ১৫। নতুন আক্রান্ত জেলা তিনটি হচ্ছে জামালপুর, নরসিংদী ও মৌলভীবাজার। এ ছাড়া রাজধানীসহ নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাইবান্ধা জেলায় ‘ক্লাস্টার’ (একই এলাকায় কম দূরত্বে একাধিক আক্রান্ত) ব্যক্তি পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যেখানে কারোনা রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ ক্লাস্টার এরিয়া পুরোপুরি লকডাউন করে দিতে হবে। একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে অন্য যেসব জেলায় রোগী পাওয়া যায়নি, সেখানে বেশি বেশি করে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে। আমাদের কয়েকটি জেলায় এটি সংক্রমিত হয়ে থাকে তা হলে নতুন কোনো অঞ্চল যেন সংক্রমিত না হয়, সে পদক্ষেপ নিতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় কাজ করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। নতুন নতুন অঞ্চল সংক্রমণ, রোগী শনাক্ত, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কোয়ারেন্টিনসহ সার্বিক বিষয়গুলো মনিটরিং করা হচ্ছে। এটি দেখভালের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. সামিয়া তাহমিনা ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানার নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রয়েছে। কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখার পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টরদের নেতৃত্বে ১৪টি গ্রুপ কাজ করছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা, ফল প্রকাশ ও রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির দায়িত্বে রয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা শুরু হয়। দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে চলতি বছরের ৮ মার্চ। প্রথম শনাক্ত হওয়া রোগী ছিলেন মাদারীপুর জেলার বাসিন্দা। এর পর এ ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় ঢাকা শহর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি বিদেশ ফেরত ও তার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্থানীয়দের মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে। এর পরই সরকার বাংলাদেশে কোথায় করোনার রোগী রয়েছে তা শনাক্ত করতে বেশি মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনতে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে নতুন করে ঢাকায় নয়টি ও ঢাকার বাইরে পাঁচটিসহ ১৪টি কেন্দ্রে এই করোনা ভাইরাস পরীক্ষা শুরু করা করে। পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানোর পর থেকে রোগীর সংখ্যা এবং সংক্রমিত জেলার সংখ্যা বাড়ছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী ফ্লোরা গতকাল সোমবার বলেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৬৮টি নমুনা সংগ্রহ করে আইইডিসিআরসহ কয়েকটি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে ৩৫ জনের দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একই সময়ে আক্রান্ত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মৃত্যুর সংখ্যা ১২ জন।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, ৩ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন দেশে ১০০ থেকে ১৫০ নমুনা পরীক্ষা করা হতো। গত ৩ এপ্রিল থেকে রোগীর নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানো হয়। ওইদিন ৫১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে ৫ রোগী শনাক্ত হয়। ওইদিন পর্যন্ত দেশে শনাক্তকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ৬১ জন। এর পরদিন ৪ এপ্রিল ৪৩৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৯ জনের দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গত ৫ এপ্রিল ৩৬৭টি নমুনা পরীক্ষা করে ১৮ জনের দেহে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছিল। সর্বশেষ গতকাল সোমবার দুপুর পর্যন্ত ৪৬৮ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৩৫ জনের দেহে এ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

আইইডিসিআরের পরিসংখ্যান বলছে, গত ৮ মার্চ থেকে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দেশে তিন দিন ধরে রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গত ৮ মার্চ থেকে ৩ এপ্রিল পর্যন্ত রোগী ছিল মাত্র ৬১ জন, সেখানে গত তিন দিনেই রোগী বেড়ে হয়েছে ১২৩ জন, যা দ্বিগুণের বেশি।

করোনা সংক্রমিত জেলার সংখ্যা বাড়ছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের নয়টি জেলায় করোনায় সংক্রমিত রোগী পাওয়া গেছে। এর পর ৫ এপ্রিল নতুন করে আরও দুই জেলায় রোগী শনাক্ত হয়। সর্বশেষ গতকাল আরও ৩ জেলায় করোনার রোগী শনাক্ত হয়। এ নিয়ে ১৫ জেলায় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ পাওয়া গেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৫ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা ভাইরাসের রোগীর সংখ্যা এখন ১২৩ জন। আমাদের এখন পর্যন্ত ১৫টি জেলায় করোনা ভইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি রোগী ঢাকা শহরে, ৬৪ জন। ঢাকার পার্শ¦বর্তী নারায়ণগঞ্জে ২৩, মাদারীপুরে ১১, গাইবান্ধায় ৫, জামালপুরে ৩, চট্টগ্রামে ২ জন। এ ছাড়া একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, মৌলভীবাজার, নরসিংদী ও সিলেটে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেশের যেসব অঞ্চল থেকে করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে পাঁচটি ক্লাস্টার অঞ্চল রয়েছে। এসব অঞ্চল হচ্ছে রাজধানীর মিরপুর, বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর ও গাইবান্ধা। ক্লাস্টার অঞ্চলে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। আমরা এসব অঞ্চলের দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখছি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেছেন, বাংলাদেশে করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন আছে। যেসব জেলায় করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়েছে, সেসব জেলাকে লকডাউন করে দিতে হবে। এতে এক জেলার সংক্রমিত মানুষ যেন অন্য এলাকায় গিয়ে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে। যেসব রোগী ইতোমধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে, তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে নিতে হবে। এরপর কোয়ারেন্টিনে সন্দেহভাজনদের পরীক্ষা করতে হবে। সেই জেলাগুলোয় পরীক্ষা, স্ক্রিনিং ও পিসিআর টেস্টের ফ্যাসিলিটি থাকতে হবে। পরীক্ষার পর যাদের মধ্যে সংক্রমণ পাওয়া যাবে, তাদের আইসোলেশনে নিতে হবে। সংক্রমণ শনাক্তকরণ বিলম্বিত হলে এবং আইসোলেশনে না নিলে সংক্রমণ ছড়াতেই থাকবে। আর কোন কোন এলাকায় ভাইরাসটি ছড়িয়েছে, সেটি জানতে হলে পরীক্ষার পরিমাণ বাড়াতে হবে।

দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১২ জনে। একই সময়ে দেশে নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আরও ৩৫ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনার রোগীর সংখ্যা এখন ১২৩ জন। গতকাল সোমবার করোনা ভাইরাস নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন ব্রিফিংয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা এ তথ্য জানান। এ সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ ও পরিচালক (এমআইএস) ডা. হাবিবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে মহাখালী বিএসপিএস মিলনায়তনে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকে শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের। একই সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নতুন করে ২৯ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশে করোনা সংক্রমিত ১১৭ জন। তার এই বক্তব্যের পর দুপুর ২টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অলনাইন ব্রিফিংয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ১২ জনে। একই সময়ে দেশে নতুন করে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত আরও ৩৫ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আর আইইডিসিআরের অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার দুই রকম তথ্যের বিষয়টি নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, আইইডিসিআর কি মৃত্যুর তথ্য লুকাচ্ছেন?

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী যখন বিষয়টি বলেছেন তখন পুরো তথ্য আমাদের হাতে আসেনি। যে তথ্য পেয়েছিলাম সেটুকু উনাকে জানানো হয়েছিল। পরে আরও তথ্য এসেছে। যা যাচাই-বাছাই শেষে আমরা উপস্থাপন করেছি।

 

advertisement
Evaly
advertisement