advertisement
advertisement

নারায়ণগঞ্জের অলিগলিতে বাঁশের ব্যারিকেড
মানুষকে ঘরে রাখতে যুবকদের হাতে লাঠি

লুৎফর রহমান কাকন ও এমরান আলী সজীব,নারায়ণগঞ্জ থেকে
৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২০ ০৯:৫৯
করোনা সংক্রমণ রুখতে মানুষের অহেতুক চলাচল ঠেকাতে লাঠি হাতে নেমেছেন যুবকরা
advertisement

করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু আর নতুন করে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় প্রচ- আতঙ্কে দিন কাটছে নারায়ণগঞ্জবাসীর। এখন পর্যন্ত এ জেলায় ২৩ জনের দেহে করোনা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গতকাল একদিনেই শনাক্ত করা হয়েছে ১২ জনকে। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে এক প্রকার লকডাউন চলছে পুরো নগরেই। জায়গায় জায়গায় পুলিশ চেকপোস্ট। মহল্লার অলিগলিতে বাঁশের ব্যারিকেড।

তবে শিল্পনির্ভর এলাকা হওয়ায় এ জেলায় শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। খাদ্য সংকটে রাস্তায় নেমে পড়ছেন অসহায় ও নিম্নআয়ের লোকজন। তাদের বাধ্য করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। পাশাপাশি পাড়া-মহল্লায় স্বেচ্ছাসেবী যুবকরা লাঠি হাতে মানুষকে ঘরে রাখতে বাধ্য করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এর পরও বাইরে বের হতে নানা অজুহাত দাঁড় করাচ্ছেন অনেকেই।

নারায়ণগঞ্জকে করোনা সংক্রমণপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। পরিস্থিতি বিবেচনায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। গত রবিবার রাতেই জরুরি বৈঠক ডেকে তিন উপজেলা লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সে অনুযায়ী গতকাল সোমবার সকাল থেকে মানুষকে ঘরে রাখতে মাঠে নামেন পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকায় কঠোর ছিলেন ম্যাজিস্ট্রেট ও সেনাবাহিনী সদস্যরাও। মূল সড়ক, গলিতেও লোক চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। তবে ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরী ও সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করতে বেশ কয়েকটি কারখানা খোলা রাখা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গতকাল সকাল থেকে পুলিশ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর মানসিকতায় কাজ করলেও র‌্যাব সদস্যরা ছিলেন কঠোর। কাজ ছাড়াই অহেতুক ঘরের বাইরে বের হওয়ায় কয়েকজনকে শাস্তি দিতেও দেখা যায়। এর পরই জনশূন্য হয়ে পড়ে শহরের চাষাঢ়া এলাকা। সে দৃশ্য ছিল কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত। কিন্তু র‌্যাব সদস্যরা চলে গেলে লোকসমাগম বাড়তে থাকে। কারণ জিজ্ঞেস করলে নানা অজুহাত দেখান তারা। বেশিরভাগই জানান, ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছেন কিংবা ওষুধ কিনতে। অথচ পুলিশ বলছে, করোনা আতঙ্কের পর থেকেই শহরের প্রাইভেট চেম্বারগুলো বন্ধ রয়েছে। রোগী দেখছেন না চিকিৎসকরা। আবার ওষুধের দোকানেও নেই তেমন ভিড়।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম তিন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। আক্রান্ত দুজনই ছিলেন নারায়ণগঞ্জের। একে একে সেই সংখ্যাটা বাড়ছেই। এখন পর্যন্ত এ জেলায় করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছেন ২৩ জন। তাদের মধ্যে চারজন মারা গেছেন। আরও কয়েকজন করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন বলে গণামাধ্যমে প্রকাশিত খবর, যাদের নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। গত তিন দিনেই প্রায় অর্ধশতাধিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন ১২ জন। এর পর থেকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ভর করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় করোনা আক্রান্ত হয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে- এমন গুজবও ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।

সব মিলিয়ে করোনায় নারায়ণগঞ্জের পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে অভিমত অনেকের। তাই গত রবিবার সিটি করোপোরেশন এলাকায় লকডাউন কিংবা কারফিউ জারির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ জানান মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এক ভিডিওবার্তায় লকডাউনের দাবি জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ একেএম শামীম ওসমানও।

এ ছাড়া জেলা প্রশাসন ও সিভিল সার্জন অফিসও ধারণা করছে- লকডাউন পুরোপুরি নিশ্চিত করতে না পারলে নারায়ণগঞ্জের অবস্থা খুবই খারাপের দিকে যেতে পারে। সংক্রমণ ঠেকাতে পাড়া-মহল্লায় রাস্তা বন্ধ রাখা হয়েছে। কোথাও কোথাও অতিউৎসাহী যুবকদের দেখা গেছে লাঠি হাতে। জরুরি প্রয়োজনে কেউ বের হলেও তারা হেনস্তা করছে বলে অভিযোগ।

সার্বিক বিষয়ে পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জ এ মুহূর্তে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। শক্তভাবে লকডাউন নিশ্চিত করতে না পারলে বিপদ বাড়বে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি আমাদের সহযোগিতা করছেন। তবে পুরোপুরি রাস্তা বন্ধ রাখলে, জরুরি প্রয়োজনে কোনো গাড়ি বের হতে চাইলে অবশ্যই সেটি খুলে দিতে হবে। লকডাউনের প্রথম দিন আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী মানুষকে ঘরে রাখতে পেরেছি। আশা করছি, সামনের দিনগুলোতেও মানুষকে নিরাপদে রেখে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘অতিউৎসাহী হয়ে লাঠি নিয়ে যদি কেউ সুযোগ সন্ধানে থাকে, অপরাধে জড়ায়; তাদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

advertisement