advertisement
advertisement

করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে জাতীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায়
৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২০ ০০:৩৬
advertisement

করোনা ভাইরাস-১৯ পুরো পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারী আকারে। ইতোমধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ লাখেরও বেশি মানুষ। করুণ মৃত্যুবরণ করেছেন ৬৭ হাজার ২৬৫ জন। ২০৮টি দেশে করোনা তার থাবা বিস্তার করেছে। ভয়াবহ আতঙ্ক বিরাজ করছে পুরো মানবসমাজে। সত্যিই মানবজাতি আজ এক মহাসংকটে।

সর্বস্তরের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে করোনা ভাইরাসে। ধনী-নির্ধন, রাজা-প্রজা সবাই। খুবই লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিচ্ছিন্নভাবে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। সর্বস্তরের মানুষ, সারাবিশ্বের মানুষকে একযোগে লড়াই করতে হচ্ছে এর বিরুদ্ধে। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট প্রমাণ যে, মানবজাতি অবিভাজ্য। জেনেটিক্যালি তারা বিভাজিত নন। কিন্তু পৃথিবীতে শোষকশ্রেণি ধর্ম ও উৎপাদন ব্যবস্থা দিয়ে মানুষকে বিভাজিত করেছে। তাই করোনা প্রতিরোধের সংগ্রামে কোনো ধর্মাধর্ম, জাতি-গোত্র, নিম্নবর্ণ-উচ্চবর্ণ ভেদাভেদ থাকছে না।

করোনা প্রতিরোধের কৌশল একেবারেই অভিনব। এ ক্ষেত্রে ওষুধপথ্য, চিকিৎসক ও নার্সÑ এসব কিছু গৌণ। মুখ্য হচ্ছে, পারস্পরিক সমন্বিত কর্মসূচি। বিশ্বব্যাপী একই ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন করা পারস্পরিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী এই প্রতিরোধ কর্মসূচির দরুন বিশ্বব্যাপী ক্ষতির পরিমাণও হবে আকাশচুম্বী। সব থেকে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যারা সব সময়ই অধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তারা হলো শ্রমজীবী মানুষ। কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্ত, ছোট দোকানদার, রিকশা-ভ্যান-বাস-ট্রাকচালক, হকার, হোটেল শ্রমিক, ভবঘুরে, পথশিশু প্রমুখ। আর যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেনÑ তাদের কথা আমরা বুঝি না, ভাবিও না। তারা হলো পশুপাখি প্রভৃতি। প্রতিটি শহরের রাস্তায় রাস্তায় অসংখ্য কুকুর ঘুরে বেড়াচ্ছে খাবারের সন্ধানেÑ যেখানে এর আগে প্রতিদিন তাদের খাদ্য মিলত। হোটেল, দোকানপাট বন্ধ, লোকসমাগম বন্ধ। তাই রাস্তায় তাদের খাদ্যও বন্ধ। কাক, শালিক, পায়রা প্রভৃতি পাখি শহরে তাদের খাদ্যের সন্ধান পাচ্ছে না।

কেন এই করোনা ভাইরাস? কেন এই দুর্যোগ? কেন এই মহামারী? গভীরভাবে ভাবতে হবে, অনুসন্ধান করতে হবে এর কারণ! বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতে হবে এর কারণ আবিষ্কারের। বহুদিন ধরে পরিবেশবিদরা বলে আসছেন, পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকা- যেভাবে বাড়ছে বিশ্বে, এতে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবে। পুঁজিবাদী, ভোগবাদী, সমাজের কর্ণধারদের অপরিণামদর্শী প্রতিবেশ-পরিবেশবিরোধী কর্মকা-ের হয়তো প্রতিশোধ এই করোনা ভাইরাস প্রকৃতির। কিছুদিন আগেও নানাভাবে বলা হয়েছে এসব ব্যাপারে। নানাভাবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন।

সম্প্রতি এই দৈনিক ‘আমাদের সময়’ পত্রিকাতেই একটি প্রবন্ধ ছিল ‘পরিবেশ বিপর্যয় ও সভ্যতার সংকট’ শিরোনামে। এতে বলা হয়েছিল, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে আজ অবধি জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, সংস্কৃতি প্রভৃতির ক্ষেত্রে মানবজাতি যে মহামূল্য অবদান রেখেছেÑ তা অল্পকিছু অতিলোভী, অপরিণামদর্শী মানুষের ক্রিয়াকর্মের ফলে নস্যাৎ হতে চলেছে। এই বিকল্পিত সভ্যতা গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। ওই প্রবন্ধে সতর্কবাণী ছিল, ‘... তাই প্রকৃতির ওপর মানুষের হস্তক্ষেপ অবশ্যই সীমাহীন হতে পারে না। যদি তা হয়, তা হলে অবধারিতভাবে প্রকৃতি তার চরম প্রতিশোধ নিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করবে।’ প্রাকৃতিক নানাবিধ বিপর্যয়, মহামারী আকারে প্রকৃতি এর আগেও অনেক প্রতিশোধ নিয়েছে। এখন ক্রমাগত পরিস্থিতি এত বেশি ভয়াবহ হয়ে পড়েছে যে, মানবজাতি আজ হুমকির মুখে পড়েছে। হয়তো করোনা ভাইরাস প্রকৃতির সেই নির্মম প্রতিশোধ প্রক্রিয়ার অংশবিশেষ বলে মনে হয়।

এখন আমাদের করণীয় কী? কীভাবে এই মহামারী করোনাকে আমরা মোকাবিলা করব?

প্রথমত হলো, সমবেতভাবে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। দল-মত নির্বিশেষ সবাইকে সংগঠিত, সংঘবদ্ধ করে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, শ্রমজীবীদের জন্য প্রণোদনা অর্থাৎ খাদ্য, পথ্য, ওষুধ প্রভৃতি সরবরাহ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি তহবিলের সঙ্গে বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে সংযুক্ত করতে। প্রয়োজনে বিত্তবানদের বাধ্য করতে হবে।

তৃতীয়ত, গ্রামীণ উৎপাদন সচল রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষকসহ অন্যান্য খামারি উৎপাদক প্রত্যেককে সার, বীজ, বালাইনাশক, বিদ্যুৎ, পশুখাদ্য প্রভৃতি বিনামূল্যে জোগান দিতে হবে।

চতুর্থত, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোয় উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম, ওষুধপথ্য প্রভৃতি সরবরাহ করতে হবে। করোনা শনাক্তে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে।

পঞ্চমত, শহর-গ্রামের শ্রমজীবীদের জন্য স্বল্পমূল্যে চাল, ডাল, তেল, নুন, আদা, চিনি ও শিশুখাদ্য স্বল্পমূল্যে রেশনিং দিতে হবে।

স্থায়ীভাবে এসব সংকট মোকাবিলার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহবাসযোগ্য কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিবেশের ক্ষতি হয়, পরিবেশ বিঘিœত হয়Ñ এমন সব উৎপাদন কর্ম বন্ধ করতে হবে। মাটি দূষণ, জলদূষণ, বায়ুদূষণ সম্পূর্ণ রোধ করতে হবে। কার্বন নিঃসরণ সীমিতমাত্রায় নিয়ে আসতে হবে। এভাবে হয়তো আমরা আগামী দিনে পৃথিবীকে আগামী প্রজন্মের বাসযোগ্য করে যেতে পারব।

রণজিৎ চট্টোপাধ্যায় : লেখক ও গবেষক

advertisement