advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চীনের পর বাংলাদেশেও সেল্ফ কোয়ারেন্টিন : যেমন আছি

তাহেরা তমা
৭ এপ্রিল ২০২০ ০৯:৩২ | আপডেট: ৭ এপ্রিল ২০২০ ০৯:৩২
তাহেরা তমা, পিএইচডি গবেষক
advertisement

চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে শীতকালীন ছুটি শুরু হয়ে যায়। বরাবরের মতো আমিও পরিকল্পনা করছি ছুটি কাটানোর। বিমানের টিকিট দেখছিলাম, কাছাকাছি কম খরচে কোথায় বেড়াতে যাওয়া যায়! এর মাঝেই সব এলোমেলো হয়ে যায়। প্রফেসর মিস লিওশুয়ে মেইলের একটি সতর্কবার্তায়।

‘উহানে একটি ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে তুমি ফ্যামিলি নিয়ে সাবধানে থেকো প্রয়োজন ছাড়া বাহিরে বের হবে না।’

তখনো ভাইরাস কোভিড-১৯ এর নামকরণ করা হয়নি! ভেবেছি, উহান তো সাংহাই থেকে অনেক দূরে। এতদূর কি আর সংক্রমিত হবে আর অতদিনে সংক্রমণ কেটেও যাবে!  আবার উহানের পরিস্থিতি ভেবে ভীষণ উৎকণ্ঠা তৈরি হলো।

উহান আমার প্রাণের শহর, যাকে সিটি অব ইউনিভারসিটি বলা হয়। প্রায় ৭০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে এই শহর।  বাংলাদেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করেই আমি উহান সিটিতে চলে যাই এবং সেখানকার একটি  বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করি। দীর্ঘ পাঁচ বছর এই শহরে আমার বসবাস ছিলো। এই শহরের অলিগলি, বাস-মেট্রো, পাহাড়-নদী সব আমার নখদর্পণে। উহানে বসবাসরত পরিচিত যত বন্ধু শুভাকাঙ্ক্ষীরা ছিলেন, সবাইকে নক দিচ্ছি। মোটামুটি প্রত্যেকেই থমথমে অবস্থায় আছে।

চাইনিজ নিউ ইয়ারের ছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে। তখনো শুধু উহানেই ভাইরাসটি সংক্রমিত হচ্ছে অন্যান্য সিটিতে একজন দুজন করে ধরা পড়ছে। চীনা সরকার ইতিমধ্যে লকডাউন ঘোষণা করেছে উহানকে। তার আগে প্রেসিডেন্ট শি জিং পিং বিবৃতি দিয়েছেন, ‘নিউ ইয়ারের ছুটি অনির্দিষ্টকালের জন্য বর্ধিত হচ্ছে। এই ভাইরাস মোকাবিলা করাই আমাদের এখন মূল লক্ষ্য, আমরা তোমাদের খাদ্য এবং বিনামূল্যে চিকিৎসা সরবরাহ করবো তোমরা ঘরে থেকে আমাদের সাহায্য করো।’

উহানসহ বেশি সংক্রমিত এলাকাগুলোতে লকডাউন অবস্থায়  ফুড, মেডিসিন, মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি স্বল্পমূল্যে কখনো কখনো বিনামূল্য হোম ডেলিভারি দিয়েছে সরকার।

যেহেতু কোভিড-১৯ এর কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়নি, দিশেহারা চীন তখন সনাতন পদ্ধতি প্রয়োগ করেছে, ১৪ দিন গোটা দেশ কোয়ারেন্টিনে রেখেছে। কারো কোনো প্রকার জ্বর-সর্দিকাশি অনুভব হলে সঙ্গে সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্স কল করলেই মেডিক্যাল টিম বাসায় চলে আসছে। সুনসান শহরজুড়ে শুধুই পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজছিল। উহান তো পুরোপুরি লকডাউন ছিল জানুয়ারির মাঝামাঝির দিকে। গোটা চীনের ট্রেন এবং দূরপাল্লার অল ট্রান্সপোর্টেশন ডিসকানেক্ট করা হয়েছিল। শুধুমাত্র বিমান চলাচল সচল ছিল। কিন্তু এই সার্ভিস ছিল শুধুমাত্র  বিদেশিদের জন্য যারা নিজ দেশে ফিরতে চায়।

সাংহাইয়ের অবস্থা তখন এতটা নাজুক হয়নি। আমার ডিপার্টমেন্ট থেকে জানালো, ‘রিসার্চ ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য যেহেতু তুমি ফেব্রুয়ারিতে দেশে ফেরার ছুটির এপ্লিকেশন করেছ। এইখানে অনিরাপদ বোধ করলে, এখনি  ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যেতে পারো। তখনো ভাবিনি কোভিড-১৯ এর থাবায় শুধু চায়না নয়, গোটা পৃথিবীই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। সাতপাঁচ ভেবে টিকিট কনফার্ম করে দেশের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে বিমানের দরজা অব্দি কয়েক দফায় মেডিক্যাল চেকআপ করে  সিট বেল্ট বেঁধেছি। পুরো বিমানজুড়ে অচেনা আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাশের সিটের যাত্রীকেই যেন মনে হচ্ছে, যমদূত।

বিমানে বেশিরভাগ  যাত্রীই মাস্ক খুলে খাবার, পানি কিছুই খায়নি। দুঃখের বিষয় ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় ল্যান্ড করে নিরাপত্তার তেমন তোড়জোড় দেখিনি। বিমানবন্দরের থার্মাল স্ক্যানার অকেজো ছিল।  ইনফরমেশন ডেস্কে জানানোর পরও কোনো রকম মেডিক্যাল টেস্ট ছাড়াই ইমিগ্রেশন চেক করেছে। নিরাপত্তায় নিয়োজিত কারওই মাস্ক-গ্লাভস ছিল না।

এখানে কোভিড-১৯ এর উৎপত্তিস্থল চীনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পদক্ষেপের প্রশংসা করতেই হয়। অবস্থানরত বিদেশিদের  দেশে ফেরার কোনোরকম তাড়া দেয়নি, বরং বারবার চিকিৎসা এবং থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গোটা চীনে ঘোষণা দিয়েছে, যদি কারও করোনার লক্ষণ থেকে থাকে লুকিয়ে না থেকে যেন প্রশাসনকে জানানো হয়। করোনা পজেটিভ না হলেও পরিচয় গোপন রেখে ১০ হাজার RMB পুরস্কিত করা হবে। যারাই অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে গিয়ে আইন ভঙ্গ করেছে, তাদেরকে শাস্তির আওতায় এনেছে। আমরা যারা চীন থেকে দেশে ফিরেছি কিংবা চীনে অবস্থান করছি, বিশ্ববিদ্যালয়  অথরিটি থেকে শুরু করে লোকাল প্রশাসন সর্বক্ষণিক আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। মানসিক সাহস নির্ভরতা দিচ্ছেন গ্রুপ চ্যাটের মাধ্যমে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে ছোট বাচ্চা নিয়ে চীনে অবস্থানরত সময় এবং দেশে ফিরে দুই দফায় কোয়ারেন্টিনে থাকতে থাকতে মেন্টাল ডিপ্রেশনে ভুগছি। স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, পড়াশোনা, ক্যারিয়ার- সব কিছুতেই কেবল অনিশ্চয়তা লাগছে। মন মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। কাছের মানুষদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতে ইচ্ছে করছে না। নিজের এই মানসিক অবস্থা রুখতে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে গিয়েছি। কিন্তু করোনা আতঙ্কে প্রায় সব হাসপাতালই সাইক্রিয়াটিস্টদের সার্ভিস বন্ধ রাখছে।

এমতাবস্থায় নিজেই নিজের বড় সহায়ক। সবটুকু মানসিক শক্তি নিংড়ে ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করে যাচ্ছি। মহামারির এই দুঃসময় দ্রুত কেটে যাবে আবার সুস্থ একটা জীবন পাবো, সুন্দর একটা পৃথিবী পাবো এই আশাটুকুই এখন মরীচিকার মতো সামনে টানে। বিশ্বব্যাপী এই মহামারিতে হাজার হাজার প্রাণহানি হচ্ছে। পাল্লা দিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যহানি হচ্ছে চরম আকারে। কেউ চাকরি হারাচ্ছে কারও কারও ব্যবসা মন্দা যাচ্ছে। এখন আমাদের নিরাপদ স্বাস্থ্য চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যেরও পরিচর্যা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ছে। প্রয়োজন নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের মানসিক ঐক্য গড়ে তোলা।

বন্ধু-স্বজন, প্রতিবেশী শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভীত না হয়ে একে অপরকে সাহস, সতর্কতা, নির্ভরতা আদান প্রদান করা। আমরা নিরাপদ স্বাস্থ্য স্লোগান দিচ্ছি, ‘স্টে হোম সেইফ লাইফ’ কিন্তু যাদের ঘরে বসে থাকলে আহার জোটেনা। রাষ্ট্রের উচিৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের বিত্তবানদের সহায়তার হাত বাড়ানো উচিৎ। এছাড়া লকডাউন কখনোই কার্যকর ফলাফল বয়ে আনবে না।

তাহেরা তমা : পিএইচডি গবেষক, সাংহাই ইস্ট চায়না নরমাল ইউনিভার্সিটি

advertisement
Evaly
advertisement