advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার ধকল : সঠিক উপলব্ধি প্রধানমন্ত্রীর

মোস্তফা কামাল
৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৮ এপ্রিল ২০২০ ২০:১৪
advertisement

রাস্তার ক্ষুধার্ত কুকুর চিড়িয়াখানায় ঢুকে হরিণ খেয়ে ফেলতে পারলে অভাবে বা স্বভাবে মানুষও কারও বাড়ি ঢুকে কী না, কী শুরু করবে বলা যায় না। করোনার ভয়ে দোকানপাট-হোটেলসহ সবকিছু বন্ধ থাকায় খাবার না পেয়ে রাজশাহী শহরের কিছু কুকুর সেদিন নগরের শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় ঢুকে চারটি হরিণ ছিঁড়ে খেয়েছে। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সহকারী প্রধান কারারক্ষী তরিকুল ইসলাম শাহীনকে ৫২২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেটসহ আটক, চট্টগ্রামে সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত ছুটে চলা লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স থেকে ইয়াবা ট্যাবলেটের চালান উদ্ধারও তরতাজা খবর।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লকডাউনের কারণে বেকায়দায় পড়েছে ছিঁচকে চাঁদাবাজরা। তারা কারও না কারও আশ্রিত, মদদপ্রাপ্ত। কিন্তু মদদদাতারা তাদের বাড়িতে খাওয়ায় না। এর বদলে এলাকা ভাগ করে দেয়। লকডাউনের কারণে পাড়া-মহল্লার হকার, চা দোকানি, ফুটপাথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই আছেন দৌড়ের ওপর। খাদ্য ও হাত খরচের জন্য এই পাতিশ্রেণিটা ছিঁচকে চুরিতে ঢুকেছে। বাড়ছে ছিনতাই। করোনার বিপদের মধ্যে এই আপদগুলোর উৎপাত শেষতক কোনদিকে যায়, ভাবনার বিষয়। করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি কী হবে বা হতে পারে? মোটা দাগের এ ছোট প্রশ্নটির সরল জবাব মিলছে না। সবই ধারণা, আলামতনির্ভর। করোনায় বেঁচে গেলেও সামনের দিনগুলোয় জীবন কতটা নিরাপদ হবে, তা ভেবে অস্থির অর্থনীতি নিয়ে কাজ করা চিন্তকরা। এরই মধ্যে করোনার কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের অবস্থার মতো ব্যাপক খাদ্য ঘাটতির শঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে। এটি মোটেই মেঠোরাজনৈতিক বক্তব্য নয়। দায়িত্বের জায়গা থেকে দায় নিয়েই এ শঙ্কা তার।

কারও বোঝার বাকি নেই, দেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক গতিশীলতা বরবাদ করে দিয়েছে। তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিক ৭ শতাংশের বেশি হয়েছে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা হয়েছে ৮ দশমিক ১৫ শতাংশÑ এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রবৃদ্ধি অর্জনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং সহায়ক রাজস্ব ও মুদ্রানীতি। সামষ্টিক চলকগুলোর নেতিবাচক প্রভাবের ফলে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার কমতে পারে। ইউরোপের মতো পরিস্থিতি এশিয়া বা বাংলাদেশে হয়নি বা হবে নাÑ এমনটি যারা ভেবেছিলেন গত কয়েকদিনে, তারা আজ খামোশ হয়ে গেছেন। বর্তমান প্রজন্ম এ রকম সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক দুর্যোগ আর দেখেনি। বিশ্ববাসীর বহু শতাব্দীর চিন্তা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে ধসিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে করোনা নামের ক্ষুদ্র ভাইরাসটি গোটাবিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে। কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য মানুষের জীবন। জনজীবন অনিশ্চিতের পাশাপাশি অচল হয়ে পড়েছে সভ্যতা, ধ্বংসের মুখে বিশ্ব অর্থনীতি। অগুণতি প্রাণহানির পাশাপাশি এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিশ্বকে নানাভাবে ওলট-পালট করে দিচ্ছে।

মহামারী কেবল রাজনীতিতে নয়, নাটকীয় পরিবর্তন আনে অর্থনীতিতেও। ডলার-পাউন্ড পকেটে নিয়ে পণ্য না পাওয়ার অভিজ্ঞতা উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের অনেক নাগরিকের জন্য জীবনে এই প্রথম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সীমান্ত বন্ধ এবং জরুরি অবস্থার মতো ঘটনা। বিশ্বজুড়ে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়েছে। অর্থনৈতিক গোলকায়নের জন্য এ রকম অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে বিপর্যয়কর। বড় ধরনের মন্দার মুখে পড়েছে গোটাবিশ্ব। বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশকে অগ্রাহ্য করে কেবল পুঁজির স্বার্থ দেখার দীর্ঘ ঐতিহ্য এবার কেবল নৈতিকভাবেই নয়, কার্যকারিতার দিক থেকেও চ্যালেঞ্জে পড়েছে। মানুষের শরীর-স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিবেচনাকে বাদ দিয়ে যে কারখানা চালু রাখা যায় না, চীনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ ঘোষিত শত শত কারখানা এর সাক্ষ্য হলো। করোনা ভাইরাস কেবল বিশ্বব্যবস্থার ধরনই নয়, হয়তো অনেক সামাজিক মূল্যবোধই আমূল পাল্টে দিতে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ বিশ্বের মুরুব্বি দেশগুলোর নেতারা করোনাকালে বিশ্বকে মোটেই নেতৃত্ব দিতে পারেননি। এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদলের তাগিদ দিচ্ছে ভবিষ্যৎকে। অতীত মহামারীর ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত আছেÑ অভিভাবকসুলভ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়ে বহু রাজত্ব নুয়ে পড়েছিল।

করোনার ক্ষয়ক্ষতির এই বীভৎস্য চমকের শেষ কোথায়, তা কেউই বলতে পারছেন না। প্রথম দিকে কারও মনে হয়নি চীন এত দ্রুত ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। এও মনে হয়নি, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় বিপর্যয় এত ব্যাপক হবে। তুলনামূলকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল ওইসব অঞ্চল। অথচ সেখানেই অস্তিত্বের সংকট তীব্র রূপ নিয়েছে। আপাতত যা দেখা গেলÑ যুক্তরাষ্ট্র সময়মতো নিজের অনেক নাগরিকের ‘ভাইরাস টেস্ট’ করাতে পারেনি, পাশাপাশি নিজেও বৈশ্বিক ‘গভর্ন্যান্স টেস্ট’-এ এতদিনকার অবস্থান হারিয়েছে। এ ঘাতক ভাইরাসটি নিয়ে মনমর্জির কথামালা শুধু বাংলাদেশে নয়, উন্নত দেশেও। একেবারে শুরুতে মনে করা হয়েছিল, এ ভাইরাসটি সামুদ্রিক খাবার থেকে ছড়াচ্ছে। বিশেষ করে সামুদ্রিক প্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়াচ্ছে এই ভাইরাস। চীনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন বলছে, একজন মানুষের শরীর থেকেও এই ভাইরাস অন্য মানুষের শরীর ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি মারাত্মক এই ভাইরাস সম্পর্কে প্রথম রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এর আগে এমন কোনো শ্বাসযন্ত্রের রোগ সংক্রামক জীবাণু দেখেননি চিকিৎসকরা।

তথ্য পরিষ্কার করতে না পেরে গবেষকরা বলছেন, এটি একেবারে অন্যরকম বৈশিষ্ট্যের আলাদা ভাইরাস। উপযুক্ত পদক্ষেপ নিলে বিস্তার ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু কী সেই উপযুক্ত ব্যবস্থাটি? এ জিজ্ঞাসার জবাব একেক রকম। হাত ও মুখ ধোয়া থেকে শুরু করে গোমূত্র পান, কালিজিরা চিবিয়ে খাওয়া পর্যন্ত কত ‘উপযুক্ত’ পদ্ধতি চলছে দেশ-বিদেশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কিংবা বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত নতুন এ ভাইরাসটি সম্পর্কে অভিন্ন তথ্যও আসেনি। তবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত, আধুনিক-অনাধুনিক সব মহল থেকে যে অভিন্ন কথাটি আসছে, সেটি হলো করোনা নতুন রোগ। আবার এমনও নয়, এটা কোনো মৌসুমি রোগ, দিনকতক পরই চলে যাবে। একবার যখন এসেছে, হয়তো থেকেই যাবে। হয়তো এটিকে নিয়ন্ত্রণের উপায়ও খুঁজে পাবে। তবে শিগগিরই চলে যাবে, সেটি মনে করছে না। অনেকেরই ভাবনার দৌড় হচ্ছে, করোনা থেকে বাঁচা নিয়ে। অন্যদিকে কয়েক ব্যক্তি শুধু দুমুঠো ভাতের সন্ধান করছেন। চিন্তা করছেন, পরের দিনও খাবার জুটবে তো? মাঝামাঝি আরেকটা শ্রেণি মনে করে, এ মুহূর্তে আমাদের শুধুই করোনার মোকাবিলা করতে হবে। অর্থনীতি নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এসব ভাবনা নেহাত ঠুনকা।

আসল বিষয়টা প্রকাশ পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যে। রাখডাকে না গিয়ে সোজাসাপ্টা তিনি জানিয়েছেন আসল শঙ্কাটার কথা। করোনার তেজে গোটাবিশ্বের মতো আমাদেরও সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকা-ও স্থবির হয়ে গেছে। আমদানি-রপ্তানি আয় কমে গেছে। করোনার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ছুঁয়ে যাবে বলে ধারণা করছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর আয় কমে যাওয়ার কারণে করপোরেট কর আদায় কমবে বলেও শঙ্কা তাদের। মানুষের জীবনরক্ষায় এ ধরনের সাময়িক স্থবিরতা যেমন যৌক্তিক, তেমনই এর পরবর্তী ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগাম ব্যবস্থা নেওয়াও অপরিহার্য।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের কারণে হওয়া ক্ষতি মেটাতে সব মিলিয়ে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি আপৎকালীন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে অর্থনীতিতে যেসব খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এর একটি সম্ভাব্য তালিকাও প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন প্যাকেজ ঘোষণার সময়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ৩২০ কোটি মার্কিন ডলার (১ ডলার ৮৫ টাকা হিসাবে ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা) হবে মর্মে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যে প্রাক্কলন করেছে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কাছে মনে হচ্ছে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

advertisement