advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

চতুর্থ স্তরে দেশ # এক এলাকার মানুষ অন্যত্র যেতে পারবেন না
২১ জেলায় ছড়াল করোনা

দুলাল হোসেন
৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ এপ্রিল ২০২০ ০১:২২
advertisement

দেশে দিন দিন বাড়ছে করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা, বাড়ছে মৃত্যু। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫৪ জন শনাক্ত হয়েছেন করোনায় আক্রান্ত হিসেবে। দেশে এক দিনে শনাক্ত মানুষের সংখ্যার হিসাবে এটিই সর্বোচ্চ। এদিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনজন মারা গেছেন। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১৮ এবং মৃতের সংখ্যা ২০। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- গতকাল সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী প্রাণঘাতী এ ভাইরাস ইতোমধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, গাইবান্ধা, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, মৌলভীবাজার, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী, শেরপুর ও রাজবাড়ীসহ দেশের ২৫ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ায় সংক্রমণের দিক থেকে এখন চতুর্থ স্তরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) করোনার সংক্রমণ ও এর ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। প্রথম স্তর- একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়া; দ্বিতীয় স্তর- বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া এবং তাদের মাধ্যমে দু-একজনের সংক্রমণ; তৃতীয় স্তর- নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংক্রমণ সীমিত থাকা এবং চতুর্থ বা সর্বশেষ স্তর- জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, করোনা সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে থাকাকালে দেশে সব ধরনের যাতায়াত বন্ধ থাকবে। এক এলাকার মানুষ অন্য এলাকায় যেতে পারবেন না।

আইইডিসিআরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা শুরু করা হয়। বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার একক ও একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আইইডিসিআর। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে কয়েকটি বিভাগীয় শহরেও পরীক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। বর্তমানে ঢাকার ৯টি ও এর বাইরে ৭টিসহ মোট ১৬টি কেন্দ্রে এ ভাইরাস শনাক্তকরণের পরীক্ষা চলছে।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল দুপুরে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ৯৮৮টি নমুনা সংগ্রহের পর আইইডিসিআরসহ কয়েকটি ল্যাবরেটরিতে ৯৮১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৫৪ জনের দেহে করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এ নিয়ে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হলো ২১৮। গত চব্বিশ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত তিনজন মারা গেছেন। তাদের নিয়ে দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ২০।

গত ৮ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত আইইডিসিআর প্রতিদিন ১০০-১৫০টি নমুনা পরীক্ষা করে। এসব পরীক্ষায় ২ থেকে ৩ জন রোগী পাওয়া যেত। এর মধ্যে কয়েকদিন এমনও দেখা গেছে, কেউই আক্রান্ত হননি। বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব প্রদানের ভিত্তিতে সরকার গত ৩ এপ্রিল থেকে নমুনা পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ায়। সেদিন ৫১৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়, শনাক্ত হয় ৫ জন। ৪ এপ্রিল ৪৩৪টি নমুনা পরীক্ষায় ৯ জন; ৫ এপ্রিল ৩৬৭টির মধ্যে ১৮; ৬ এপ্রিল ৪৬৮টির মধ্যে ৩৫; ৭ এপ্রিল ৭৯২টির মধ্যে ৪১ জন এবং সর্বশেষ গতকাল ৯৮১টি নমুনা সংগ্রহ করে ৫৪ জন করোনায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা হয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, দেশের প্রথম রোগী শনাক্ত হয় মাদারীপুরে। এর পর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় রোগী পাওয়া যায়। প্রাথমিক অবস্থায় এটি বিদেশ ফেরতদের এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরবর্তী সময়ে স্থানীয়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মার্চের শেষ সপ্তাহে সরকার করোনা শনাক্তকরণের পরীক্ষাকেন্দ্র বাড়িয়ে ঢাকায় ৯টি ও ঢাকার বাইরে ৭টি কেন্দ্র স্থাপন করে। পরীক্ষার পরিমাণ বাড়ানোর পর থেকে শনাক্তকৃত রোগী ও সংক্রমিত জেলার সংখ্যাও বাড়ছে। গত ৩ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৯টি জেলায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল বুধবার সকাল পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত জেলার সংখ্যা বেড়ে ২১টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সংক্রমিত ২১ জেলার মধ্যে সর্বাধিক রোগী ঢাকা জেলায় ১২৮ জন। ঢাকার পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জে ৪৬ জন, মাদারীপুরে ১১ জন, গাইবান্ধায় ৫ জন। তিনজন করে শনাক্ত হয়েছে চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ ও জামালপুর জেলায়। দুজন টাঙ্গাইল ও নরসিংদী জেলায়। এ ছাড়া একজন করে রোগী শনাক্ত হয়েছে গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, মৌলভীবাজার, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী, শেরপুর ও রাজবাড়ী জেলায়।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় বিদেশ ফেরতদের মধ্যে। আইইডিসিআরের এ সংক্রান্ত ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছায়। এর কিছুদিন পর রাজধানীর টোলারবাগ এলাকায় সংক্রমণের যে ঘটনা ঘটে ওই ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস নেই। তখন বলা হয় এটি স্থানীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এর পর আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, করোনা ভাইরাসের স্থানীয় সংক্রমণ হচ্ছে মৃদু আকারে। করোনা সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এরপর গত ৫ এপ্রিল অধ্যাপক সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, দেশের যেসব অঞ্চল থেকে করোনার রোগী শনাক্ত হয়েছে তার মধ্যে পাঁচটি ক্লাস্টার অঞ্চল রয়েছে। এ ছাড়া গাজীপুর, শরীয়তপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা ও মৌলভীবাজারেও রোগী রয়েছে। তিনি বলেন, দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়া) হচ্ছে। আমরা অনেক জায়গা থেকেই রোগী পাচ্ছি। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন যেগুলো আছে, সেগুলো ক্লাস্টার ভিত্তিতে আছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে আমাদের অবশ্যই জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে। তা না হলে ক্লাস্টার ভিত্তিতে যে সংক্রমণ রয়েছে, সেটি পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে। তার এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণে চতুর্থ স্তরে প্রবেশ করে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে এখন করোনার সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কত মানুষ আক্রান্ত, তার সঠিক হিসাব সম্পর্কে তাই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। জনসংখ্যার ঘনত্ব অনুপাতে পরীক্ষার আওতায় আনা মানুষের সংখ্যা কম জানিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তারা।

দেশে গত ৮ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ২১৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। তারিখ অনুযায়ী আক্রান্তের সংখ্যা- ৮ মার্চ ৩ জন, ১৫ মার্চ ২, ১৬ মার্চ ৩, ১৭ মার্চ ২, ১৮ মার্চ ৪, ১৯ মার্চ ৩, ২০ মার্চ ৩, ২১ মার্চ ৪, ২২ মার্চ ৩, ২৩ মার্চ ৬, ২৪ মার্চ ৬, ২৬ মার্চ ৫, ২৭ মার্চ ৪, ৩০ মার্চ ১, ৩১ মার্চ ২, ১ এপ্রিল ৩, ২ এপ্রিল ২, ৩ এপ্রিল ৫, ৪ এপ্রিল ৯, ৫ এপ্রিল ১৮, ৬ এপ্রিল ৩৫, ৭ এপ্রিল ৪১ এবং ৮ এপ্রিল ৫৪। এর মধ্যে সর্বশেষ ৮ এপ্রিল যে ৫৪ জন আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩৯ জনই ঢাকায় এবং এর বাইরে ১৫ জন। আর আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন।

advertisement