advertisement
advertisement

‘কম’ ত্রাণ বিতরণে সমন্বয় হচ্ছে না

সানাউল হক সানী
৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৯ এপ্রিল ২০২০ ০০:৫০
পুরোনো ছবি
advertisement

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে কার্যত লকডাউন রাজধানীসহ সারাদেশ। কর্মহীন হয়ে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। এ ক্ষেত্রে দিনমজুর, শ্রমিকসহ নিম্নআয়ের মানুষেরা পড়েছেন খুবই বিপাকে। এমন ‘দিন আনি দিন খাই’ মানুষদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি কিছু সংস্থাও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে; ব্যক্তিগত পর্যায়েও কেউ কেউ এগিয়ে এসেছে এসব মানুষের দুঃসময়ে।

অভিযোগ উঠেছে, সরকারের তরফে যে পরিমাণ ত্রাণ দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিছু কিছু এলাকায় এখনো ত্রাণ বিতরণ শুরুই হয়নি। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগও উঠেছে। এদিকে করোনা ভাইরাস মহামারীতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও কর্মহীনদের মধ্যে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করতে ৫৫ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। গতকাল বুধবার এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, প্রাণঘাতী করোনার সংক্রমণ রোধে মানুষে মানুষে দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি। অথচ ত্রাণ বিতরণকালে অধিকাংশ স্থানেই এটি উপেক্ষিত হয়েছে ত্রাণপ্রার্থীদের কাছে; তাদের একসঙ্গে হুড়োহুড়ি করে ত্রাণ নিতে দেখা গেছে। অথচ এতে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে।

অনেকেই অভিযোগ করেছেন, ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিকটজনরাই ত্রাণ পাচ্ছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত দরিদ্র মানুষ, যারা দেশের চলমান অচলাবস্থায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে রাজধানীতে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠছে অনেক। এ ছাড়া অনেক স্থানে নির্বাচিত কাউন্সিলররা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না।

করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে ছুটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে আরোপ করা হয় বেশ কিছু বিধিনিষেধ। এর পরই কার্যত লকডাউন হয়ে যায় পুরো দেশ; কর্মহীন হয়ে পড়েন অসংখ্য মানুষ। বিশেষ করে রোজকার শ্রমে-ঘামে চলে যাদের যাপিত জীবন, তারা আছেন খুবই দুর্দশায়।

জানা গেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক কাউন্সিলরের কাছে তার ওয়ার্ডের ৫শ জন নিম্নআয়ের মানুষের তালিকা চাওয়া হয়েছিল বেশ কিছু দিন আগে। সে অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের কাছে তালিকা পাঠানো হলেও এ পর্যন্ত অনেক ওয়ার্ডেই পৌঁছায়নি ত্রাণ। আর যেসব ওয়ার্ডে পৌঁছেছে, তাও প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফোরকান হোসেন বলেন, আমাদের ওয়ার্ডে শুধু বস্তিবাসী পরিবারই রয়েছে চার সহস্রাধিক। এর বাইরেও বিপুলসংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ আছেন। আমরা আট হাজার মানুষের তালিকা করেছি। এর বাইরে বেশ কয়েকটি এলাকা লকডাউনে থাকায় সেসব এলাকায়ও খাবার পৌঁছে দিতে হচ্ছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ৫শ প্যাকেট ত্রাণসামগ্রী এবং বেসরকারি সংস্থার সহায়তায় আরও হাজারখানেক প্যাকেট ত্রাণ তৈরি করে বিলি করেছি। কিন্তু মানুষের চাহিদার তুলনায় এটি খুবই কম। এ কারণে জেলা পরিষদসহ নানা স্থানে যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি। দরিদ্র মানুষের চাহিদা মেটাতে পারছি না।

অন্যদিকে অনেক কাউন্সিলর এ পর্যন্ত কোনো ত্রাণ বরাদ্দ পাননি নানা চেষ্টা-তদবিরের পরও। ফলে স্থানীয় দরিদ্র মানুষ তাদের ভুল বুঝছেন বলে জানান তারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ড. ওমর বিন আব্দাল আজিজ তামিম বলেন, করপোরেশনের চাওয়া নামের তালিকা জমা দিয়েছি অনেক আগে। প্রতিদিনই যোগাযোগ করছি। কিন্তু ত্রাণ এখনো পাইনি। স্থানীয় নিম্নআয়ের মানুষরা প্রতিদিনই আসেন ত্রাণের জন্য। ব্যক্তিগত উদ্যোগে যতটুকু সম্ভব তাই দিচ্ছি।

এদিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অনেক ওয়ার্ডেই নতুন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেও তারা এখনো দায়িত্ব বুঝে পাননি। তাই খাতা-কলমে পুরনো কাউন্সিলরই দায়িত্বে আছেন। অভিযোগ, তারা নতুন কাউন্সিলরদের সঙ্গে পরামর্শ করছেন না, তাদের মতামত নিচ্ছেন না। নিজেদের মতো দরিদ্র মানুষের তালিকা তৈরি করে সিটি করপোরেশনে পাঠিয়েছেন। এসব ওয়ার্ডে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়হীনতার সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন নির্বাচিত কাউন্সিলর আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, সিটি করপোরেশনের ত্রাণ বিতরণের তালিকার বিষয়ে জানি না। ব্যক্তি উদ্যোগেই আমি প্রতিদিন নিম্নআয়ের মানুষদের ত্রাণ দিচ্ছি। দুবেলা খাবারের পাশাপাশি জীবাণুনাশক ছিটাচ্ছি আমার ওয়ার্ডে। এর বাইরে, ঢাকা সিটি করপোরেশনের ভোটার নন, এমন শ্রমজীবী যারা আছেন, তারাও রয়েছেন বিপাকে। কাউন্সিলর অফিস থেকে বলা হচ্ছে, স্থানীয় ওয়ার্ডের ভোটার না হলে তাদের ত্রাণ দেওয়া সম্ভব নয়। লালবাগ এলাকায় বসবাসরত একটি লিজিং কোম্পানির কর্মচারী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি স্থানীয় কাউন্সিলরের অফিসে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু সেখানে বলা হয়েছে, এলাকার ভোটার না হলে ত্রাণ দেওয়া যাবে না। ত্রাণ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার আমাদের সময়কে বলেন, আমরা সবক’টি ওয়ার্ডে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে কিছু ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও শিগগিরই পৌঁছে দেওয়া হবে।

ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদমর্যাদার এসব কর্মকর্তার কে কোন জেলা ও বিভাগে ত্রাণ কার্যক্রম তদারকি করবেন, তাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। ত্রাণ হিসেবে বিতরণের জন্য সরকারি চাল লোপাট করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে ত্রাণ কার্যক্রম তদারক করবেন। পাশাপাশি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয়কেন্দ্রে (এনডিআরসিসি) প্রতিবেদন পাঠাবেন। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি কর্মহীনদের তাৎক্ষণিক মানবিক সহায়তা দিতে চার দফায় ২২ কোটি ১৫ লাখ ৭২ হাজার ২৬৪ টাকা এবং ৫৬ হাজার ৫৬৭ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এ ছাড়া সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজি দরের চালও দেওয়া হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় গত শনিবার ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৪৫০ টন চাল বরাদ্দ দিয়েছে। এর আগে দুই দফায় ১১ কোটি ২৪ লাখ ৭২ হাজার ২৬৪ টাকা এবং ৩৯ হাজার ৬৬৭ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ত্রাণ বিতরণ সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা প্রশাসনকে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে এ ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এ জন্য অগ্রাধিকার তালিকা করতে বলা হয়েছে কাউন্সিলর, চেয়ারম্যান-মেম্বারদের। স্থানীয় পর্যায়ে বিত্তশালী কোনো ব্যক্তি বা কোনো বেসরকারি সংস্থা ত্রাণ সহায়তা দিতে চাইলে জেলা প্রশাসকের তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করতে বলা হয়েছে যেন দ্বৈততা এড়ানো যায় এবং যথাবণ্টন হয়। নিরাপদ দূরত্ব রেখে, প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ত্রাণ বিরতণের কথা বলা হয় নির্দেশনায়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেসব মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি স্থানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, মেম্বার ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে ত্রাণ তছরুপের। এ ছাড়া ১০ টাকা কেজি দরে বিক্রির চালও গায়েব করে ফেলার অভিযোগ রয়েছে অনেক ডিলারের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন ডিলারকে এবং ত্রাণ বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে এমন অভিযোগের ভিত্তিতে।

advertisement