advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনার কালে নারীর প্রতি সহিংসতায় উদ্বেগ

নাছিমা আক্তার জলি
১৫ এপ্রিল ২০২০ ২০:৩৯ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২০ ২০:৩৯
advertisement

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯)! জনস হপকিন্স বিশ্ব বিদ্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত করোনার সংক্রমণে সারা বিশ্বে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮১২ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে, সংক্রমিত হয়েছে ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৮৬ জন। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ১২৩১ জন ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

অতীতের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, যেকোনো মহামারি বা জাতীয় দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের নারী ও শিশুরা। মহামারিই তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনে, তাদের আরও পেছনে ফেলে দেয়। একইসঙ্গে মহামারির সময় বেড়ে যায় নারী নির্যাতন, নারীর প্রতি যৌন নিপীড়ন ও বাল্যবিবাহের ঘটনাও। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ যেন তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আমরা জানি, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সাধারণ ছুটি ঘোষণাসহ সারা দেশের মানুষকে নিজ নিজ গৃহে থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। এই সময় নিজ গৃহে নারী ও কন্যাশিশু বেশি সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, সারা দেশে বেড়েছে নারী নির্যাতন ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা মহানগর এলাকায় ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত ৯টি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। আর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৮টি। এর বাইরে যৌন নিপীড়নের অপরাধে মামলা হয়েছে ৬টি। আর অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫টি।

অর্থাৎ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য গৃহে অবস্থানের এই সময় নারী ও শিশু নির্যাতন অনেক গুণ বেড়ে গেছে। করোনাভাইরাসের এই মহামারির সময় গত ৪ এপ্রিল ২০২০ তিনজন ভুক্তভোগী নারী এবং প্রতিদিনই দুই থেকে চারজন ভুক্তভোগী নারী ও শিশু ওসিসিতে সেবা নিতে আসছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে কেউ ধর্ষণের শিকার, কেউ আবার যৌন নিপীড়নের শিকার। আবার এই অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়েও অনেক ভুক্তভোগী ঘরের বাইরে যেতে না পারায় থানায় অভিযোগও করতে পারছে না।

আমরা উপরোক্ত তথ্যচিত্র কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। আমরা মনে করি, সংকটময় অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সকলের মনযোগ অন্যদিকে থাকায় অপরাধীদের তৎপরতা আরও বেড়ে যায়। তাই নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহ রোধে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো এবং কোথাও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই ভুক্তভোগীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা দরকার বলে আমরা মনে করি।

ভয়াবহ করোনাভাইরাসে সারা বিশ্ব যখন মানুষের জীবন রক্ষা করার জন্য লড়াই করছে, তখন এই পরিস্থিতিতে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংতায় আমরা উদ্বিগ্ন। রাজধানীসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও কন্যাশিশুসহ বিভিন্ন বয়সের নারী ধর্ষণের শিকার, যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তসাপেক্ষে ঘটনার সাথে জড়িতদের আইনি ব্যবস্থাগ্রহণসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানাচ্ছি। সেইসঙ্গে আমরা এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণসহ ধর্ষণের ঘটনা প্রতিরোধে শূন্য সহিষ্ণুতার নীতি গ্রহণ সাপেক্ষে আশু কার্যকর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের নিকট বিশেষ দাবি জানাচ্ছি। একইসঙ্গে ধর্ষণ, নারী ও শিশুর প্রতি সংহিসতার ঘটনা প্রতিরোধে বিশেষভাবে সচেতন ও সতর্ক থাকার জন্য সকল নাগরিককের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

একইসঙ্গে আমরা নারীর স্বাস্থ্যসেবা ও নারীদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিতেরও দাবি জানাই। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, মহামারির আকার যখন ব্যাপক হয়, তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেই রোগটি সামলাতে। তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৌলিক অনেক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রক্রিয়া গুরুত্ব হারায়। তাই করোনাভাইরাস মোকাবিলা করতে গিয়ে যেন আমাদের পুরো স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে না পড়ে এবং আমাদের হাসপাতালগুলো যেন প্রসবকালীন জটিলতাসহ অন্যান্য অসুস্থতা নিয়ে ভর্তি হওয়া নারীকেও সঠিক সেবা দিতে পারে তাও নিশ্চিত করা দরকার। গণমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি যে, করোনা আতঙ্কের কারণে গ্রামাঞ্চলে অনেক গর্ভবতী নারী ও প্রসূতি নারী কমিউনিটি ক্লিনিকে যথাযথ সেবা পাচ্ছেন না। আমরা মনে করি, কমিউনিটি ক্লিনিকে নারীরা যাতে স্বাস্থ্যসেবা পান তার জন্য সরকারি বিশেষ ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনা থাকা দরকার।

আমাদের জানামতে, করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে প্রচুর নারী গৃহকর্মী ও পোশাক শিল্পে কর্মরত কয়েক লাখ নারী সাময়িকভাবে তাদের চাকরি হারিয়েছেন। তাই এই সময় নারী গৃহকর্মী, দিনমজুর ও হতদরিদ্র মানুষদের জন্য বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে খাদ্য-দ্রব্য যোগান ও তাদের জন্য আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা দরকার এবং এই খাদ্য-দ্রব্য ও আর্থিক সহায়তা যাতে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে যথাযথ ব্যক্তিরা পায় তাও নিশ্চিত করা দরকার।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমরা সবাই সচেতন হলে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এবং রাষ্ট্র ও সরকার দায়িত্ব নিলে আমরা করোনাভাইরাসের এই বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হবো। একইসঙ্গে পরিবার প্রধান সচেতন হলে এবং প্রশাসন আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করলে ভালো ও সুরক্ষিত থাকবে আমাদের নারী ও শিশুরা।

নাছিমা আক্তার জলি : পরিচালক, দি হাঙ্গার প্রজেক্ট এবং সম্পাদক, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম।

advertisement
Evaly
advertisement