advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

তথ্য গোপন চিকিৎসক ও রোগীর জন্য হতে পারে ‘ভয়াবহ’

ডা. এস এম সহিদুল ইসলাম
৫ মে ২০২০ ১৮:০০ | আপডেট: ৫ মে ২০২০ ১৯:৪২
advertisement

রহমান সাহেব বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। বয়স ৫০ এর ঘরে। সরকার ঘোষিত লকডাউনের সময় নিয়মিত বিভিন্ন ব্যক্তিগত কাজে বাইরে বের হতেন। একদিন সন্ধ্যার পর হঠাৎ করে জ্বর অনুভব করেন। রাতে জ্বরের সঙ্গে কাশির উপসর্গ দেখা দেয়। পরের দিন জ্বর কিছুতেই না কমায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জ্বর বেশি থাকায় প্যারাসিটামল দুটো খেয়ে শুয়ে পরেন। কিছুক্ষণ পর যখন জ্বর নেমে যাওয়া মাত্র তিনি হাসপাতালে রওনা দেন। হাসপাতালের প্রধান ফটকে রহমান সাহেবের শরীরের তাপমাত্রা মেপে স্বাভাবিক পাওয়া যায়। তিনি চিকিৎসকের কাছে যান এবং কাশির উপসর্গ তুলে ধরেন এবং ঘন ঘন বাইরে যাওয়া এবং জ্বরের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন করেন। চিকিৎসকের কাছ থেকে ব্যবস্থাপত্র নিয়ে ওষধ কিনে বাসায় ফেরেন।

দুই দিন অতিবাহিত হওয়ার পর যখন জ্বর না কমে বাড়তে থাকে এবং শ্বাসকষ্ট শুরু হয় তখন তাকে তড়িঘড়ি করে করোনা ডেডিকেটেড একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অক্সিজেনের স্যাচুরেশন অনেকটা কমে যায়। রহমান সাহেবকে চিকিৎসা প্রদান শুরু করা হয় এবং করোনা টেস্টে তার ফলাফল পজিটিভ আসে।

এতক্ষণ যে ঘটনা লিখেছি তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কিন্তু এই ঘটনা প্রতিনিয়ত হচ্ছে এবং এইসব ঘটনার কারণে কী কী ঘটনার উদ্ভব হচ্ছে তা কি আমরা বুঝতে পারছি?

চিকিৎসক সমাজ আজকে অনেক কথার সম্মুখীন হচ্ছেন। চিকিৎসক চেম্বারে  বসছেন না, রোগী দেখছেন না। হাসপাতালে রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না, যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে না, ইত্যাদি। রহমান সাহেবের ঘটনার দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। তিনি তথ্য গোপন করে হাসপাতালে এসেছেন, চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেছেন। চিকিৎসক তার পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে চিকিৎসা দিয়েছেন। ওই সময় চিকিৎসক তাকে সিম্পটোমেটিক চিকিৎসা দিয়েছেন।

সব তথ্য প্রদান করা হলে চিকিৎসক ডায়াগনোসিসে আসতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলশ্রুতিতে কি হলো, যে চিকিৎসক চিকিৎসা প্রদান করেছেন তিনিসহ তার মাধ্যমে ওই দিন যত রোগী তিনি দেখেছেন সবাই করোনাভাইরাসের সংস্পর্শে এসেছেন। একবার ভেবে দেখুন ওই সমস্ত রোগী, তাদের সংস্পর্শে আসা অন্যান্যরা, হাসপাতাল কী ভয়ঙ্কর একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ভাবছেন চিকিৎসক কেন পিপিই, মাস্ক পড়ে চিকিৎসা দেননি। দেখুন পিপিই এবং এন ৯৫ মাস্ক শুধুমাত্র চিকিৎসক এবং চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যারা আছেন তাদের পরার কথা কিন্তু প্রকৃত ঘটনা কি ঘটছে হয়তো বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।

সুতরাং সর্বসাধারণকে বলছি তথ্য গোপন না করে সত্য কথা বলুন তা আপনার যথাযথ চিকিৎসা এবং দেশ ও দশের স্বার্থে। আজ যদি চিকিৎসক, নার্স আক্রান্ত হতে থাকে একের পর এক, তাহলে হাসপাতাল লকডাউন করে দেওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তখন চিকিৎসা প্রদান করবে কে? সব সরকারি হাসপাতালে ইমার্জেন্সি খোলা রয়েছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে, ফিভার ক্লিনিকও স্থাপন করা হয়েছে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছে জেনে আপনাকে যদি বলা হয় আপনি তার সংস্পর্শে যান, আপনি কি যাবেন? সাধারণত কেউ যেতে চাইবেন না। কিন্তু চিকিৎসক ও নার্স কিন্তু তাদের দায়িত্ব থেকে বের হয়ে আসবেন না। তারা কিন্তু নিরলসভাবে চিকিৎসা প্রদান করে যাচ্ছেন যার প্রমাণ গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত ৫৩৩ জন চিকিৎসক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন।

সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালও ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল ঘোষণা করা হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত মান সম্পন্ন পিপিই, মাস্কসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান না করা হলে চিকিৎসকগণ, নার্সসহ চিকিৎসা কাজে কর্মরত ব্যক্তিবর্গ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে পরলে পরবর্তীতে চিকিৎসা প্রদান করার জন্য চিকিৎসকের ঘাটতি দেখা যেতে পারে। তখন চিকিৎসা প্রদান করার জন্য চিকিৎসক খুজে পাওয়া হয়ে যাবে দুষ্কর। সুতরাং সব সরকারি চিকিৎসকের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসকগণের পিপিই, মাস্ক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য যথাযথ কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।     

ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার কথা চিন্তা করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালু করতে চাইছেন। একবার ভেবে দেখেছেন কি যদি আপনার প্রতিষ্ঠান খোলা থাকে আর আপনি যদি কোনো ক্রেতা না পান তখন কি পরিস্থিতি হতে পারে? আপনার, আমার অসচেতনতাই যথেষ্ট এই ধরনের একটি পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে।

আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রত্যেকে সতর্ক হই, আমাদের আশপাশের মানুষজনকে সতর্ক করে তুলি তাহলে হয়তো খুব তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ করোনা মুক্ত হতে পারবে। প্রয়োজন শুধু সতর্কতার, প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছার। 

সবার সর্বোচ্চ সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

লেখক : ডা. এস এম সহিদুল ইসলাম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

advertisement
Evall
advertisement