advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

শ্রমিক বাঁচলে দেশ বাঁচবে

আব্দুল জব্বার
১১ মে ২০২০ ০৯:৩৮ | আপডেট: ১১ মে ২০২০ ১৬:৩৮
advertisement

সকল ভোগান্তি-বেদনা ভুলে কাজে যোগ দিয়েছেন গার্মেন্টস শ্রমিকরা। আর ঠিক ঠিক তখনই তাদের মনে বাসা বাঁধল নতুন শঙ্কা। এপ্রিল মাসের বেতন ৬০ শতাংশ পাবেন তারা। সবশেষে অনেক আলোচনা, সমালোচনার পর ৫ শতাংশ বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। কিন্তু কীভাবে মিলবে হিসাবের অংক? ফুল বেতন পেয়েই যেখানে হিসাব মিলানো দায় সেখানে ৬৫ শতাংশ কতটুকু সহায়ক?

কোনো বাড়িওয়ালা ভাড়া ৬০শতাংশ নেবেন না। চাল একশ কেজির জায়গায় ৬০ কেজি দিয়ে হবে না। ১০ টাকার গাড়িভাড়া ৫ টাকা দিলে নেবে না, চিকিৎসা খরচ দিনের পর দিন বাড়ছেই। অথচ সেই ঘাটতির ভার কেন তাদের ক্ষতবিক্ষত কাঁধেই পরবে?

এমনিতেই ওভারটাইম না থাকায় মূল বেতন দিয়েই সারতে হবে সব। এরপর যদি আবার মরার পর খরার ঘা আসে তখন বিষয়টা কত যন্ত্রণা দায়ক হয় সেটা বলার ভাষা রাখে না। সর্বনিম্ন বেতন এখন ৮০০০ টাকা সেখান থেকে ৬৫ শতাংশে আসে ৫২০০ টাকা। একজন শ্রমিকের এই টাকায় তিনজন (ধরে নিলাম) মানুষের খরচ চালানোর জন্য কতটুকু সহায়ক হবে? আমি যতটুকু জানি একটা রুম ভাড়া বাবদ কমপক্ষে ৩০০০ টাকা খরচ হয়। অন্যান্য খরচের কথা বাদই দিলাম।

সরকারি লাখ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘরে বসে মাসের পর মাস বেতন পাবে, আর অন্যদিকে শ্রমিকরা রাত দিন পরিশ্রম করেও পাওনা বেতন নিয়ে মানসিক চিন্তার মধ্যে থাকবে?

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রেখে সরকারের সিন্দুক ভরবে আর সরকার সেখান থেকে দু-হাত ভরে তার কর্মচারী কর্মকর্তাদের দেবে। সারাজীবন কলুরবলদের মতো খেটে যাবে আর পকেট ভর্তি হবে মালিক, সরকারের এটাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অথচ ওরাও এ দেশের মানুষ, এ দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার অধিকার তাদেরও আছে। বিগত চল্লিশ বছর ধরে খেটে খেটে একটা দেশের রূপ পাল্টে দিল অথচ একটা মাত্র মাস সরকার, মালিক তাদের চালাতে পারে না। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে? সোনার ডিম দেওয়া মুরগির কদর যদি নাই করতে পারেন তাহলে এর বিনিময়ে একদিন পস্তাতে হবে আপনাদের। মনে রাখা দরকার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এসব শ্রমিকেরা একবার যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে কিন্তু আর দাবিয়ে রাখতে পারবেন না । ওদের ক্রোধ, ক্ষোভ অনেক কিছুই করে ফেলবে সেদিন।

জ্বালিয়ে দেবে আপনাদের নৈতিক অবক্ষয়ের সকল উপকরণ। যখন বুঝবেন তখন হয়তো আফসোস ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। মনে রাখা দরকার, আপনাদের টাকার সাম্রাজ্য, পতি পত্তি, ব্যাংক ব্যালেন্স, বিদেশ গিয়ে ফুর্তি করা, নাইটক্লাব, দামি গাড়ি, আলিশান প্রাসাদ, বাহাদুরি এসবই কিন্তু ওই সব সোনার সন্তানদের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের ফল। চল্লিশ লাখ কর্মী যদি এক যোগে কাজ বয়কট করে চাকরি ছেড়ে চলে যায় সেদিন কি হবে ভেবে দেখেছেন কখনো?

মালিক, সরকার, বিজিএমইএ সবার ফুটানিই বন্ধ হয়ে যাবে। একটা কথা বলে রাখা ভালো, সরকার যদি প্রণোদনার ঘোষণা না দিতো তাহলে মালিকের কাছ থেকে একটুও হয়তো পেত না শ্রমিকেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী গার্মেন্টস রপ্তানি এবং রেমিট্যান্স- এ দুটো মিলিয়ে বাংলাদেশের জিডিপিতে এ শিল্পের অবদান প্রায় ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। তাদের শ্রমে বাংলাদেশের ৮০শতাংশ রপ্তানি আয়ের কৃতিত্ব পোশাক খাতের। বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয় এই খাত থেকে। এতো জনবহুল একটা শিল্পের প্রধান হয়েও বিজিএমইএ নিজে থেকে কোনো দাবি সরকার থেকে আদায় করে নিতে পারছে না। সরকার থেকে কোনো সিদ্ধান্ত হলে তখনই কেবল তারা সেটাকে বাস্তবে পরিণত করার চেষ্টা করছে। অথচ এ শিল্পের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে বিজিএমইএ এর নিজ থেকে সরকারের সাথে বিস্তর আলোচনা করার কথা ছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বেশ কিছু গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারীদের গ্রুপে সংযুক্ত আছি আমি। ওসব গ্রুপে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের মন্তব্য দেখতে পাই। বিগত কয়েকদিনের মন্তব্য পর্যালোচনা করে দেখলাম এই মুহূর্তে শ্রমিক-কর্মচারীদের ফ্যাক্টরি মালিকদের ওপর কোনো রাগ-ক্ষোভ নেই। অধিকাংশের যত অভিমান, যত রাগ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এর ওপর। কারণ হিসেবে তাদের মতে- "সময়মত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারা, চাকুরীর নিশ্চয়তা না থাকা, প্রণোদনার টাকা সঠিক বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করার পরিবেশ না থাকা, সর্বোপরি স্বাস্থ্যসেবা যথাযথ ভাবে নিশ্চিত করা এসবের কোনো কিছুরই যেন সঠিক তদারকি করতে পারছে না দেশের গার্মেন্টস খাতের সব চেয়ে বড় সংগঠনগুলো।

অনেকেই বলেছে, তাদের জীবনের কোনো দাম না দিয়ে এ সময়ে ফ্যাক্টরি খুলে তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কেউ বলছে, সরকারি কোন অফিসের ১০০-১৫০ কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ে সরকার এতো উদ্বিগ্ন অথচ মাঝারি মানের একটি ফ্যাক্টরিতেও ৪০০০-৫০০০ লোক কাজ করে তাদের নিয়ে ভাবার কেউ নেই! ৬৫ শতাংশ যদি দিতেই পারে ১০০ ভাগ দিলে কি বা এমন বড় ক্ষতি হয়ে যাবে? কেউ কেউ এ অবস্থার মধ্যেই কর্মক্ষেত্রে যোগদিতে নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হয়েছে, তিন ঘণ্টার রাস্তা দুই দিনে পাড়ি দিয়েছে। ৫০০ টাকার গাড়ি ভাড়া ২০০০ টাকা খরচ করে কর্মক্ষেত্রে এসেছে। অনেকেই বলেছে, বছরের পর পর মালিকেরা যখন লাভ করে তখন কেন বলে না লাভের ভাগ থেকে কিছু শ্রমিকদের দেওয়া হোক। অধিকাংশেরই দাবি তাদের এপ্রিল মাসের ফুল বেতন দিতে হবে।

ইতিমধ্যেই নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও আশুলিয়ার অনেক কারখানার শ্রমিক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। সরকারি কাজের লোকের জন্য করোনা আক্রান্তদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তার ঘোষণা থাকলেও গার্মেন্টস শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নেই? আমরা যা শুনতে পাচ্ছি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও অনেকদিন থাকবে। রাস্তায় পর্যাপ্ত গাড়ি না থাকায় মানুষ বাধ্য হয়ে যে যেভাবে পারে ভেঙ্গে ভেঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছে। এতে করে কি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে না? পুরো বিশ্ব যেখানে লকডাউনে বন্দি সেখানে কাজের জন্য লাখ লাখ মানুষকে ঘর থেকে বেড় করা কতোটুকু যুক্তি সাধ্য হয়েছে? সঠিক পরিকল্পনা, যথাযথ ব্যবস্থা, ও মাঠে তদারকির লোক না পাঠিয়ে ঘরে বসে একটা ঘোষণা বা নোটিশ প্রদান করে লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকিতে ফেলার মত সিদ্ধান্ত সরকার কীভাবে নেয়। সেটা মাথায় খেলে না। নাকি তাদের কাছে জীবনের চেয়ে জিডিপি বড়? তারা জানে যে শ্রমিকদের কাছে জীবনের চেয়ে চাকরি অনেক বড়। তাই যত যাই করা হোক না কেন ঘুরে ফিরে ওদের কে আসতেই হবে। যাবে কোথায় ওরা?

দু-কলম পড়াশোনা আমার সাংবাদিকতায়। গার্মেন্টস কী জিনিস দু'বছর আগেও জানতাম না। দু'বছর হলো চাকরির সুবাদে জানার চেষ্টা করছি অনেক কিছু। বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানিকারক এ শিল্পের শ্রমিকেরা তাদের শরীরকে কীভাবে রোবটে পরিণত করে রাত-দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সেটা খুব কাছ থেকে দেখেছি। চোখের ঘুম, শরীরের আরাম-আয়েস বিসর্জন দিয়ে ঘরে দু'বেলা খাবারের জোগান, ছেলে-মেয়ের মুখে হাসি ফোটাতে কত কত বসন্ত তাদের জীবন থেকে নদীর স্রোতের মতো ভেসে যায় সেটাও প্রতিনিয়ত দেখি।

দিনের পরিক্রমায় আমিও সেই পরিবারের সদস্য হয়ে যেমন গেছি তেমনি ওদের সহজ সরল জীবন আমাকেও ভীষণ টানে। জানি অনেক কিছুর পরেও ওদের কাছে জীবনের চেয়ে চাকরি বড়। কারণ যাওয়ার জায়গা যে নেই কোথাও ওদের। ওদের জন্য না হলেও দেশের ভালোর জন্য ভালো থাকাটা ওদের খুব জরুরি আর দেশের স্বার্থে ওদের ভালো রাখাটাও সরকারের খুব জরুরি। তাই বলি কি, বাংলাদেশের মরণ দেখতে না চাইলে ওদের বাঁচিয়ে রাখুন।

advertisement
Evall
advertisement