advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

রমজানের শেষ দশকের তাৎপর্য 

হাফেজ মাওলানা ইউসুফ নূর
১৪ মে ২০২০ ২২:১৩ | আপডেট: ১৪ মে ২০২০ ২২:৫৪
প্রতীকী ছবি
advertisement

পবিত্র রমজানের দিবা-নিশি ও প্রতিটা মুহূর্ত ফজিলতপূণর্ণ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে শেষ দশকের মর্যাদা ও গুরুত্ব অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ইবাদাতের বসন্তকাল মাহে রমজানের উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠাংশ হচ্ছে তার শেষ দশক। একে রমজানের সারাংশ ও তার শীর্ষ চূড়া বলেও অভিহিত করা যায়।

এ দিনগুলোতে দয়াময়ের পক্ষ থেকে করুণার বারিধারা ও মার্জনার প্রতিশ্রুতি এবং মুক্তির কাঙ্ক্ষিত ঘোষণা মুমিন হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে। এ জন্যই মহানবী (সা.) সাহাবায়ে কেরাম ও বুযুর্গানেদ্বীন এই দশকে ইবাদাতের ব্যাপারে সর্বোচ্চ যত্নবান থাকতেন।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) মাহে রমজানের শেষ দশ দিন ইবাদাতে এত বেশি সাধনা করতেন, যা অন্য কোনো সময়ে করতেন না। (তিরমিজি, ৭৪৪)

আয়েশা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূলুল্লাহ (সা.) সারা রাত জাগতেন, নিজের পরিবারবর্গকেও জাগিয়ে দিতেন। আর ইবাদাতে প্রচুর সাধনা ও অধিক পরিশ্রম করতেন। (মুসলিম, ২৬৬৩)

রমজানের শেষ দশকে রয়েছে শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুল ক্বদর। শুধু এ রাতটির কারণেই এ দশককে অনায়াসে রমজানের রাজমুকুট বলা যায়। কুরআনে মহিমান্বিত এ রজনীর মর্যাদা ও মহাত্ম বর্ণনা করে স্বতন্ত্র একটি সূরাহ অবতীর্ণ হয়েছে।

আল্লাহ বলেন, শবে ক্বদর হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (অর্থাৎ জিবরাঈল আ.) প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে অবতীর্ণ হন। সে রাত আদ্যোপান্ত শান্তি- ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরাহ আল ক্বাদর)

মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ক্বদর রজনিতে ঈমান ও ইখলাস সহকারে ইবাদাত করবে, তার পূর্ব পাপসমূহ মিটিয়ে দেওয়া হবে। (বুখারি, ২/৭০)

এ রাতে নূরের ফেরেশতারা মাটির পৃথিবীতে নেমে আসেন। মুমিনদের ইবাদাত প্রত্যক্ষ করেন। তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। এমনিভাবে সারা বছরের ভাগ্যলিপি এ রাতে আল্লাহ ফেরেশতাদের ওপর ন্যস্ত করেন। তারা যথাসময়ে তা কার্যকর করেন।

লাইলাতুল ক্বদর কোনটি?

কুদরতের অপার রহস্যে এ রাতটি অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। ক্বদরের রাত নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। সাহাবা কিরামের মাঝে এ ব্যাপারে বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। কারও মতে, ২১ রমজান, কারও মতে ২৩, আর কেউ বলেন, ২৭ রমজান।

লাইলাতুল ক্বদরের ব্যাপারে পরস্পর বিরোধী কিন্তু বলিষ্ঠ প্রমাণ সমৃদ্ধ মতামত সমূহের সমাধান পাওয়া যায় সাহাবী আবু কিলাবা (রা.) এর বক্তব্যে। তিনি বলেন, শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর আবর্তিত হতে থাকে। (মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক,৭৬৯৯)

মহানবী (সা.) এর নির্দেশনা আমাদের জন্য শিরোধার্য। তিনি বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল ক্বদর তালাশ করো। (বুখারি, ১৮৭৬)

ক্বদরের রাত কেন অনির্দিষ্ট থেকে গেল?

হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম মহিমান্বিত লায়লাতুল ক্বদর অস্পষ্ট ও অনির্দিষ্ট থেকে যাওয়ার পেছনে রয়েছে দুই মুসলমানের কলহ-বিবাদ।

উবাদা ইবনু সামেত (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) আমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে জানাতে বেরিয়ে আসলেন। এমন সময় দুজন মুসলমান কলহে লিপ্ত হলো। তা দেখে রাসূল (সা.) বললেন, আমি বেরিয়েছিলাম তোমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে খবর দেওয়ার জন্য। কিন্তু অমুক অমুক ব্যক্তির ঝগড়ার কারণে আমাকে তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। (বুখারি, ১৮৮২)

লাইলাতুল ক্বদরের দোয়া

লাইলাতুল ক্বদর দোয়া কবুল হওয়ার সর্বাধিক আশাপ্রদ রাত। মনের সব আশা আকাংখা প্রভুর সমীপে পেশ করার সর্বোত্তম রজনী। প্রাণ খুলে এরাতে দোয়া করুন। তবে নবী করিম (সা.) এর শেখানো ভাষায় দোয়া করলে তা কতই না উত্তম!

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, আমি বললাম ইয়া রাসুলাল্লাহ, বলুন তো যদি আমি লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে যাই তাহলে কী দোয়া করব? তিনি বললেন, তুমি বলবে, হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা আপনার পছন্দ, অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (তিরমিযী, ৩৫১৩)

লাইলাতুল ক্বদরের গুরুত্ব না দেয়া

কল্যাণ ও বরকতময় রজনি লায়লাতুল ক্বদরের যথাযথ সম্মান না করা এবং তার ব্যাপারে উদাসীন থাকা চরম দুর্ভাগ্যের পরিচায়ক। হযরত আনাস ইবনু মালিক বর্ণিত, রমজানের প্রাক্কালে রাসূল সা. বলেছেন, তোমাদের কাছে এ মাস এসেছে। এতে রয়েছে এমন এক রাত যা হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ থেকে যে ব্যক্তি বঞ্চিত সে সমস্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত। কেবল হতভাগা ব্যক্তিরাই তা থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনু মাজাহ, ১৬৪৪)

লাইলাতুল ক্বদরকে অবহেলা করা কতই না দুর্ভাগ্যের ব্যাপার! আফসোস, আমাদের দেশে মতবিরোধপূর্ণ শবেবরাত নিয়ে কত ধুমধাম আয়োজন, আর সে তুলনায় কোরান সুন্নাহ দ্বারা অকাট্য প্রমাণিত লাইলাতুল ক্বদরের যথাযথ গুরুত্ব দেয়ার বড়ই অভাব।

মক্কা মদিনা ও  আরব দেশগুলোতে লাইলাতুল ক্বদরের সন্ধানে শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই তাহাজ্জুদ ও ইবাদতের আয়োজন দেখা যায়। আমাদের এখানে শুধু ২৭ তারিখের রাতে কিছুটা ওয়াজ নছিহত মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা হয়ে থাকে, যা মোটেও কাম্য নয়। অন্তত শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদতের চেষ্টা করা উচিৎ।

ওলামা মাশায়েখ উদ্যোগ নিলে ফলপ্রসূ হবে ইনশাআল্লাহ। এমনিভাবে বিভিন্ন বইয়ে শবেক্বদরের নামাজ শিরোনামে যা আলোচনা করা হয়েছে, তা মনগড়া ও ভিত্তিহীন। এর স্বপক্ষে কোরান সুন্নাহর কোনো বিশুদ্ধ ও বলিষ্ঠ প্রমাণ নেই। শবে ক্বদরের নামাজ বলতে কিছু নেই। এ রাতে অধিক হারে সাধারণ নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা যায়। জিকির তাসবীহ দোয়া করার নির্দেশনাও এসেছে হাদিস ও বুজর্গদের জীবনাচারে। এটাই আমাদের শিরোধার্য।

ইতিকাফ

বছরের যেকোনো সময় ইতিকাফ করা যায়। তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফের ফজিলত ভিন্ন। এটা মহানবী সা, এর প্রিয় সুন্নাত।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশকে নবী করীম (সা.) ইতিকাফ করতেন। (বুখারী, হাদীস নং ২৪৯)

হুসাইন ইবনু আলী (রা.) তার বাবার কাছ থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজানের দশ দিন ইতিকাফ করল সে যেন দুটো হজ্জ ও দুটো ওমরা করল। (বাইহাকী, আত তারগীব ওয়াত তারহীব, ৬১৪)

হাফেজ মাওলানা ইউসুফ নূর : ইমাম-খতিব ও মুবাল্লিগ, কাতার ধর্মমন্ত্রণালয়, নির্বাহী পরিচালক, আল নূরু কালচারাল সেন্টার

advertisement
Evall
advertisement