advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাক্রান্তের ডায়েরি : হাসপাতালে আনন্দ-বেদনা

আর্থ কিশোর
১৫ মে ২০২০ ১২:০২ | আপডেট: ১৫ মে ২০২০ ১৪:৪৬
আর্থ কিশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড
advertisement

আম্মাকে দেখি না প্রায় দুইমাসের অধিক সময় ধরে, বোনের বাসা টাঙ্গাইল গিয়ে আটকে গেছেন লকডাউনের ফাঁদে। আব্বা থাকেন কিশোরগঞ্জ। ব্রেন স্ট্রোকের রোগী হয়েও নিজেকে তিনি অবসর দিতে রাজি নন। ব্যবসার কাজের ফাঁকে বাড়িতে গাছ লাগিয়ে, সবজি বাগান করে, এবং বাড়ির এটা-ওটা করে সময় কাটে তার। আম্মার অবর্তমানে বাবার খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব বড় চাচির।

লকডাউনে আব্বা এখন আর বাজারে যাননা, সারা দিন বাড়িতেই কাটান। খবর পাই, বাইরবাড়িতে বাগানে বেড়া দিতে গিয়ে বাঁশের কঞ্চি লাগে কপালে। রক্তারক্তি ব্যাপার। সেলাই লাগে পাঁচটা। সৌভাগ্যবশত সেদিন আমার যমজ সহোদর ভাইটি বাড়িতেই ছিল, ওষুধের দোকান চালান। ডাক্তারি বিদ্যা তার জানা, ফলে সে নিজেই সেলাই করে বাবার কাটা কপাল।

কথাগুলো লিখছি আর আমার হাত হাটু কাঁপছে। আব্বাকে ভয় পাই ছোট থেকেই কিন্তু তিনি সব মিলিয়ে ক’বার ধমক দিয়েছেন বা গায়ে হাত তুলেছেন তা গুণে গুণে বলা যাবে, যে লোকটাকে এত ভয় পাই সেই লোকটা আঘাত পেয়েছে শুনে ভিতরে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।

বিয়ে করেছি বছর পেরোলো। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী তার বাবার বাড়ি। প্রতি সপ্তাহেই আসা যাওয়া করলেও এই প্রথম দুই সপ্তাহ ধরে যাইনি। করোনাকাল শুরু হয়ে যাওয়ায় নিজেকে নিরাপদ মনে হতো না বলে। সবসময় ভয় হতো যে আমার জন্য আমার পরিবারের, আমার অনাগত সন্তানের যদি কিছু হয়ে যায়-এই ভেবে।

আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জ। আমি থাকি আমার নানু বাড়িতে, কিশোরগঞ্জেরই ভৈরব। ছোট থেকেই বড় হয়েছি এখানে। শৈশব থেকেই নানুবাড়ির মধ্যমণি আমি। এখন বড় হয়েছি, বিয়ে করেছি তবুও এই বাড়িতে যেন আমি সেই ছোট্ট শিশুটাই রয়ে গেছি। আমার কাছে আমার দুনিয়া মানে হলো আমার নানু, নানুকে ঘিরেই আমার এই ২৭ বছরের জীবন। বাসায় অন্য সদস্যের মধ্যে আমার মামা-মামি, মামাতো ভাই-বোন। একজন ১০ বছর ও একজন দেড় বছরের। আমাদের এক খালা ও খালাত ভাই আমাদের সঙ্গেই থাকে। আমার মামা ব্যবসায়ী, তিনি আমাদের সবার ছাতা, শক্ত মজবুত এক ছাতা। যত রোদ ঝর বৃষ্টিই আসুক এই ছাতাটাই আমাদের সবার ভরসা।

নানাবাড়ি ভৈরবে থাকি। ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ফার্মেসি চালাই। গত ১১ এপ্রিল থেমে থেমে কয়েকবার জ্বর আসে। যেহেতু করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে আতঙ্ক সবদিকে, তাই আমি নিজেও একটু আশঙ্কায় পড়ে যাই। সেই আশঙ্কা থেকে নিজেকে হোম আইশোলেশনে নিয়ে যাই। আমি থাকি দোতলার রুমে। মামা তিনবেলা দোতলায় এসে খাবার দিয়ে যান। খাবার শেষে থালা-বাসন নিয়ে যান।

উপজেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমার শারীরিক অবস্থার বিবরণ দেই। তারা আমাকে স্থানীয় ট্রমা সেন্টারে গিয়ে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিতে বলে। ১২ তারিখে পরীক্ষার জন্য নমুনা দিই। ১৩ তারিখ আমাকে জানানো হয় রেজাল্ট পজিটিভ।

তখন প্রায় সন্ধ্যা। কিছুক্ষণের জন্য আমি অনুভূতিশূন্য হয়ে যাই। মনকে কিছুতেই শান্ত রাখতে পারছিলাম না। কেননা করোনা নিয়ে আলোচনার শুরু থেকেই আমি বেশ সতর্ক ছিলাম। নিজের সুরক্ষার জন্য হ্যান্ডগ্লাভস, মাস্ক, স্যানিটাইজার ব্যবহার করতাম। ওষুধের দোকানটিকেও নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতাম। কিন্তু এত সতর্কতা, এত পরিচ্ছন্ন থেকেও কী করে আক্রান্ত হয়ে গেলাম, এই ভেবে মনটা খুব বিষন্ন হয়ে উঠলো।

বিষণ্নতা কাটিয়ে মনে সাহস অর্জন করলাম। তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং স্থানীয় ওসি সাহেবের সহযোগিতায় ঢাকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই একাই। আমার বাসায় আইসোলেশনের পর্যাপ্ত সুব্যবস্থ্যা থাকা সত্ত্বেও আমি ঢাকাতেই চিকিৎসার নেওয়ার সিদ্ধান্ত পোক্ত করে ফেলি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি, আমার পরিবার আমার শহরকে নিরাপদ রাখতেই হবে। আমাকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করাই হবে। ভয় পেলে চলবেনা, বাঁচতে হবে।

ভৈরব উপজেজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও ডা. কিশোর কুমার ধর দাদার জোগানো সাহস নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে চড়ে বসি। অ্যাম্বুলেন্সে বাসার সঙ্গে স্টার্ট নেয়। আমার শহর ছেড়ে দূর্জয় মোড় পার করার সময় বুকের ভেতর একটা বাজ পড়ল মনে হয়েছে। এর আগে কখনো এই শহরের প্রতি এত মায়া অনুভব করিনি। আমার মনে হচ্ছে, এই যে যাচ্ছি আর বোধহয় ফিরে আসবো না, এই শহরের মানুষের সঙ্গে কী আবার দেখা হবে আমার? আবার কি হাসতে পারব এই শহরে দাঁড়িয়ে? আবার কী কথা বলতে পারব এই শহরের মানুষদের সঙ্গে? মৃত্যুর আগে অন্তত একবার এসে দাঁড়াতে পারব এই শহরের মাটিতে! অ্যাম্বুলেন্স চলছে সাই সাই গতিতে। কিন্তু আমার চোখে আমার মায়ের ছবি স্থির হিয়ে আছে, বাসা থেকে বের হয়ে আসার সময় নানুর বাকরুদ্ধ মুখ, চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর ফোটাটি এখনো স্থির হিয়ে আছে গালে। নানাভাইয়ের হৃদয়বিদারক হাহাকার, একবার না ছুতে পারার আক্ষেপ নিয়ে খালার কালো চোখ- সবকিছু আমার চোখে স্থির হয়ে আছে। আমার ভাইয়ের কণ্ঠস্বর আমার কান থেকে সরতে চাইছে না। এই বুঝি আমি দেবে যাচ্ছি মাটিতে।

রাত তিনটায় পৌঁছালাম কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে। সেখানে নামার আগেই গেট থেকে বলে দিল যে ভর্তি নিবে না। অ্যাম্বুলেন্স চলল কুর্মিটোলার দিকে। কুর্মিটোলা নেমে অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া পরিশোধ করলাম। রাত তখন সাড়ে তিনটার মতো। করোনা ওয়ার্ডে ঢুকে কাউকে পেলাম না, কিছুক্ষণ গলদঘর্ম সময় পার হলো। ভর্তি নিল। কী করতে হবে বুঝতে পারছি না। বলার মতো কাউকে পাচ্ছিও না। তখন পিপিই পড়া একজনকে দেখতে পেলাম। বললাম যে নতুন ভর্তি হয়েছি, তিনি একটা বিছানার চাদর দিয়ে বললেন, একটা ফাঁকা বেড দেখে শুয়ে পড়ুন। সকালে ডাক্তার এলে চিকিৎসা শুরু হবে।

হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যাবস্থা সম্পর্কে কম বেশি সবাই অবগত হয়েছেন ইতিমধ্যে। ডাক্তারদের সীমাবদ্ধতা, রোগীদের বিভিন্ন রকমের বিশৃঙ্খলা, মিস-ম্যানেজম্যান্ট সব মিলিয়ে কোনো রকম টিকে থাকার পরিবেশ তৈরি হলো তিন দিন পর। চেষ্টা-তদ্বির করে তিনদিন পর বেড চেঞ্জ করে পাশের ওয়ার্ডে চলে এলাম। এখানে কিছুটা স্বস্তিদায়ক মনে হল। এই ওয়ার্ডে সুস্থ্য রুগীর সংখ্যা আগের ওয়ার্ডের চাইতে বেশি। মানসিক ভাবে কিছুটা শক্ত হতে শুরু করলাম। ভৈরবের পরিচিত অপরিচিত অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী অনবরত ফোনে শক্তি ও সাহস দিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে সুমন মোল্লা ভাই, শাহাদাত কবির ভাই, রেফায়েত মামা, হাসান ভাই, আসিফ ভাইয়া, মনিরুজ্জামান ভাই, শরিফ ভাই, আখতারুজ্জামান আজাদ ভাই, শ্যামল ভাই, মুমিত স্যার, নন্দন ভাই, সজীব ভাই ওনাদের কথা আজীবন মনে থাকবে আমার। করোনাক্রান্তকালের বিষণ্ন দিনগুলোতে এতোটা আন্তরিক, এতোটা উদার আচরণ তাদের কাছে পেয়েছি। তখন নিজেকে সত্যিই ভাগ্যবান মনে হয়েছে।

এভাবেই কেটে গেছে সতেরটা দিন। আপনাদের দোয়া ও ভালবাসায় আল্লাহর রহমতে আমি এখন সুস্থ আছি। আলহামদুলিল্লাহ। তবে কী উদ্বেগ, কী বিষণ্নতা, কতটা দুঃখকষ্টের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে কুর্মিটোলার সতেরটা দিন, সে কথা কী আর বলবো! এই করোনাকালে যারা যাবেন না তারা কোনভাবেই বুঝবেন না। আল্লার কাছে প্রার্থনা করি কারও যেন এই অভিজ্ঞতা নিতে না হয়। হাসপাতালে যত ঘটনা, আনন্দ-বেদনা দেখেছি, তা বিশাল। অনেক ঘটনার ভিড়ে দুয়েকটি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।

কুর্মিটোলা জেনারের হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড

 

১.

হাসপাতালে আমার ওয়ার্ডের ৭০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধকে তিন চারদিন দেখাশুনা করেছিলাম। লোকটি আগে থেকেই স্ট্রোকের রোগী ছিলেন। এক পাশ প্যারালাইজড ছিল অনেকটা। লাঠি দিয়ে হাঁটতে হতো। ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিনও নিতে হতো রোজ দুইবার। যখন দেখলাম তিনি একা একা হাসপাতালে বাঁচার জন্য লড়ছে এবং চেষ্টা করছে সব প্রতিবন্ধকতা ঠেলে সুস্থ্য হয়ে ওঠার, তখন উনার প্রতি একটা আগ্রহ জন্মাল আমার। ওই বৃদ্ধকে নিয়ে আসলাম আমার পাশের বেডে। তার পাশের বেডের একজন তখন অলরেডি নেগেটিভ রেজাল্ট চলে এসেছে, তিনি আনসার বাহিনীর সদস্য। সেই আনসার ভাইটিও বিভিন্ন ভাবে হেল্প করলেন। তো আমার কাজ ছিল বৃদ্ধ লোকটিকে তিনবেলা ওষুধ বুঝিয়ে খাওয়ানো, ইনসুলিনটা দিয়ে দেওয়া, পানি গরম করে দেওয়া, খাবার সময় হলে তার থালাবাটি ধুয়ে খাবারটা রেখে দেওয়া, সময় করে বলে কয়ে খাবারটা খাওয়ানো, মশারি টানিয়ে দেওয়া। আমার জায়গা থেকে যতটুকু সম্ভব করার ছিল ততটুকু আরকি।

আমার অন্য পাশের সিটের আনসার সদস্য আজিজ ভাইয়ের সহযোগিতায় লোকটির বাড়িতে তার পরিবারের সঙ্গে আলাপ করি এবং তাদের অনেকভাবে বুঝাই যে অন্তত তার সেবাযত্নের জন্য একজন মানুষকে যেভাবেই হোক এখানে থাকতে হবে এবং নিরাপত্তা নিয়ে থাকলে কোনো সমস্যা হবে না। শুধুমাত্র সেবাযত্নের জন্য যদি তিনি মারা যান তাহলে এটা মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড হবে।

কয়েক দফায় যোগাযোগ করে বোঝানোর পর তার পরিবার থেকে একজনকে পাঠানো হলো দেখাশুনার জন্য। ততদিনে উনি যথেস্ট সুস্থও হয়ে উঠেছেন। আমি যখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাই, চলে আসার পর খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছিল সেই বৃদ্ধ মুরুব্বির জন্য। পরে আজিজ ভাই মারফত জানতে পারলাম যে, তিনি সুস্থ হয়ে কয়েকদিন আগেই বাড়ি ফিরেছেন। মনটা খুশিতে ভরে উঠলো। আলহামদুলিল্লাহ।

২.

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি ১৩ বছরের ছেলে। করোনা ওয়ার্ডে প্রায় ১২-১৩ দিন ধরে আছে। সঙ্গে কেউ নেই। তার এলাকা থেকে কেউ তার পরিবারকে বের হতে দিচ্ছে না, সুতরাং তার সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করতে পারছে না। এদিকে আইইডিসিআর থেকে তার নমুনাও নিতে আসছে না কেউ। এক প্রকার অসহায় হয়েই এখানে অবস্থান করছে ছেলেটি। হাসপাতাল কর্তৃক দেওয়া তিনবেলা খাবার ব্যতীত তেমন কিছুই অতিরিক্ত নেই তার কাছে। কিন্তু ছেলেটির আত্মসম্মানবোধ প্রচুর। সে কারোও দেওয়া কোনো জিনিস নিতে রাজি নয়। আমি তার জন্য আমার সাধ্যমতো কিছু করতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু ছেলেটির আত্মসম্মানবোধের কারণে পারছিলাম না। অবশেষে বাধ্য হয়ে আমাকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল।

ছেলেটির জন্য কিছু বিস্কিট, কিছু ফলমূল, চানাচুরের প্যাকেট, গুড়াদুধ, খেজুর ও অল্পকিছু টাকা দিয়ে একটা প্যাকেট তৈরি করলাম। ওখানকার একজন আয়াকে রিকোয়েস্ট করে বললাম, যে প্যাকেটটি যেন ছেলেটির বেডে পৌঁছে দেয় এবং ছেলেটিকে তিনি যেন বলেন, যে তার বাড়ি থেকে এটি পাঠিয়েছে।

যেদিন চলে আসবো, সেদিন নারায়ণগঞ্জের একজনের সঙ্গে কথা হয় আমার। ভালো পরিচিতি হয়ে যাই আমরা। সেদিন সেই ভাইয়ের কাছে অনুরোধ করে বলে এসেছিলাম, ছেলেটিকে যেন তিনি একটু দেখেন। লাগলে কিছুটা সহায়তা করেন। শুনেছি তিনি তা করেছেন। ছেলেটির ব্যাপারে নিয়মিতই খোঁজ নিতাম। এক দুরন্ত কিশোরের এমন এক করোনা হাসপাতালে পড়ে থাকাকে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলাম না। যাই হোক, পরে সেই ভাই মারফত জানতে পারলাম ছেলেটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ, বুকের ভেতরটা খুশিতে ভরে উঠলো।

৩.

নারায়ণগঞ্জের একজন মধ্যবয়স্ক লোক নিয়ে তার স্ত্রী মাঝরাতে এসে ভর্তি হয়েছেন। আমার দুই বেড পরেই তার বেড। তারা সঙ্গে কিছুই আনেননি, একদম কিছুই না। রোগীর অবস্থা খুব খারাপ। শ্বাসকষ্টে কথা বলতে পারছে না। হা-হুতাশ করছে শুধু। ডাক্তার নেই মাঝরাতে, নার্সরা বলছে ডাক্তার না এলে ট্রিটমেন্ট শুরু করা সম্ভব না। এদিকে অক্সিজেন দিতে হবে রোগীকে। পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে, এক নারী কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে পাশের বেডের একজন উত্তেজিত হয়ে নার্সকে বললেন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন! ইমার্জেন্সি অক্সিজেন দেন। নার্স অক্সিজেন নিয়ে এল, ১০ মিনিটে সিলিন্ডার শেষ। পাশের বেডের একজন তার সিলিন্ডার দিয়ে দিল, অক্সিজেন চলছে।

ভোর বেলা রোগীর অবস্থা কিছুটা ভালো। নাস্তা খাওয়ার পর আবার শ্বাসকষ্ট উঠল। এর মধ্যে আমি গরম পানি করে দিলাম, মধু দিয়ে আদা দিয়ে চা বানিয়ে দিলাম। রোগী সেটা খেয়ে অক্সিজেন লাগিয়ে শুয়ে থাকল। সেদিন মাঝরাতে হঠাৎ চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখলাম, সে রোগীটি মারা গেছে।

ভয় ও আতঙ্কে মাথা কাজ করছিল না, ঘণ্টা দুয়েক হয়ে গেছে লাশ নেওয়ার কোনো নাম নেই। এর মধ্যে জানতে পারলাম ওই নারী বাড়ির ও এলাকার কেউ নাকি এই লাশ নিতে দেবে না। ওই নারী তার স্বামীর লাশ নিয়ে কোথায় যাবে সেটা ভেবে পাচ্ছে না। একবার বলছে জানালা দিয়ে লাফিয়ে মরবে,আবার বলছে কেউ যেন তাকে মেরে ফেলে। হৃদয়বিদারক এক দৃশ্য। এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখার পর সবাই চুপ করে যার যার বেডে বসে আছে। আমি একটু এগিয়ে গেলাম। গিয়ে মহিলার সাথে কথা বললাম, তাকে পরিস্থিতি সামলে নেবার জন্য বিভিন্নভাবে বোঝাতে লাগলাম। এক পর্যায়ে বললাম যে স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য নিতে। কিন্তু তিনি এলাকায় লোকজনের সাথে আলাপ করে কোন সুরাহা করতে পারলেন না।

অবশেষে ওয়ার্ডে একজন ডাক্তার রোগী ছিলেন, তিনি দাফনের কাজ করেন এমন একটি স্বেচ্ছাসেবক গ্রুপের সঙ্গে মহিলার যোগাযোগ করিয়ে দিলেন। পরে আর জানিনা তাদের কি হলো। হাসপাতাল থেকে বের হয়ে মহিলা কোথায় কিভাবে গেছেন।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড

 

৪.

দ্বিতীয় রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর আমাদের নিয়ে আসা হয় নেগেটিভ আইশোলেশন ওয়ার্ডে। সেখানে বেডগুলোর দূরুত্ব কিছুটা কম। একদম কাছাকাছি। এক বিছানায় বসে অন্য বিছানার রোগীর সঙ্গে সহজেই কথাবার্তা বলা যায়। এখান থেকে তৃতীয় নমুনা সংগ্রহের পর রেজাল্ট নেগেটিভ আসলে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে। আর পজেটিভ আসলে পুনরায় পজেটিভ আইশোলেশনে পাঠানো হবে। এই ওয়ার্ডে অনেকগুলো বেড খালি আছে। আমি মনে মনে খুঁজছি জানালার পাশে হয় এবং সুইচবোর্ড আছে এমন একটি বেড, খালি একটি বেড পেয়েও গেলাম। আমার ব্যাগপত্র রেখে, বেডশিট চেয়ে নিলাম ওয়ার্ডবয়ের কাছ থেকে।

দুদিন ধরে আছি সে বেডে। কিন্তু দুদিন ধরে খেয়াল করছি, আমার পাশের বেডে পঞ্চাশোর্ধ একজন লোক সারাদিন শুয়ে থাকে, কোনো ওষুধপত্র খান না, শুধু খাবার বেলায় খাবার নেন। ডাক্তাররাও তার কাছে আসে না। মাঝেমধ্যে এসে বলে আপনি যাননি কেন এখনো?

দুদিন পর লোককে আমি জিজ্ঞেস করলাম যে চাচা আপনি ওষুধ খান না কেন? আমাকে অবাক করে দিয়ে সে জানাল, তার কোন সমস্যা নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে বাড়ি যান না কেন। তখন লোকটি অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে বলতে লাগল যে তার কোনো বাড়িঘর নেই, চিটাগংয়ের একটি গ্রামে তার বাড়ি ছিল। বিশ বছর আগে সব ভেঙে নিয়ে গেছে। তার স্ত্রী সন্তান কেউ নেই। মতিঝিলের ফুটপাতে পুরোনো কাপড় বেচতেন। যে বস্তিতে থাকতেন করোনা আক্রান্ত্রের পর সেখান থেকে বের করে দিয়েছে। সেখানে গেলে এখন আর তাকে ঢুকতে দেবে না। ঢাকায় তার আর কেউ নেই, যাওয়ারও কোন জায়গা নেই এবং তার কাছে কোনো টাকাও নেই।

তখন আমি কী করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই হাসপাতাল থেকে বেরোনোর জন্য মানুষ হাসফাঁস করছে আর এই ব্যক্তি যাওয়ার জায়গা নেই বিধায় সুস্থ হওয়ার পরও করোনা আইশোলেশনে পড়ে আছেন শুধু দুইবেলা খাবার আর ঘুমানোর জায়গার জন্য! আমি লোককে বললাম, আপনাকে যদি চিটাগং আপনার গ্রামে পাঠানোর ব্যাবস্থা করা হয় তাহলে আপবি যাবেন? সে প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলনা কিন্তু পরে রাজি হলেন। আমি তার হাতে পাঁচশো টাকা দিয়ে বললাম যে এটা রাখেন। আমি চেষ্টা করবো আপনাকে অন্য কোনোভাবে সাহায্য করার।

ব্যাপারটি পাশের একজনের সাথে শেয়ার করলাম, তিনি নিজ উদ্যোগে ওয়ার্ডের কয়েকজনের কাছ থেকে কিছু অর্থ সংগ্রহ করলেন। ২ হাজার ৭০০ টাকা টাকা তার হাতে দিলেন। একজন পুলিশ সদস্য তার নাম্বার দিয়ে বললেন রাস্তায় কোনো সমস্যা হলে পুলিশের কাছে গিয়ে যেন তাকে ফোন দেয়।

আর্থ কিশোর

 

সেদিন লোকটির মুখে যে হাসি দেখেছিলাম,সেটাই বোধ হয় মুক্তির হাসি। হাসপাতাল ছেড়ে যেদিন চলে আসি, সেদিন চোখেমুখে আমারও ছিল মুক্তির হাসি, কিন্তু ভেতরে কিছুটা চিনচিন ব্যথা হচ্ছিল। চিন্তা হচ্ছিল এই যে আমি এখানে যাদের রেখে যাচ্ছি তারা কবে বাড়ি ফিরবে? তাদের সবাই সুস্থ্য হবে তো? সবাইকে নিয়ে যদি একসঙ্গে বাড়ি ফিরতে পারতাম আরও অনেক ভাল লাগতো। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন পৃথিবীর সকলকে আরোগ্য দান করেন।

বিশ্বাস করেন, হাসপাতালের বিষণ্ন দিনগুলোর কথা আর মনে করতে ইচ্ছে করে না। তারপরও বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠে। কথাগুলোও বলতে চাইনি, এসব কথা বলতে ভালো লাগেনা মোটেও। তবুও আবেগতাড়িত হয়ে বললাম। ওখানে গেলে মানুষের আনন্দ-বেদনার আবেগ এমনিতেই বেড়ে যাবে। ওখানে জীবন ও মৃত্যুর আশংকা সবার মনে সবসময় উঁকিঝুঁকি মারে। এত বড় একটা হাসপাতাল, এত ওয়ার্ড, এতো রোগী, কেউ কারো পরিচিত না। সেখানে একজনের কষ্ট দেখে আরেকজন আফসোস করে, সাহায্য করার চেষ্টা করে। এক মানুষ আরেক মানুষের তরে এগিয়ে আসে।

সুস্থ্য হয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরার পর তাই মাঝে মাঝে মনে হয়-পুরো পৃথিবীটাই একটা হাসপাতাল হয়ে যাক, হাসপাতালের মতো সবাই সবার দুঃখ-কষ্ট বুঝুক, সবাই সবার জন্য কথা বলুক, সহযোগিতার মানসিকতায় এগিয়ে আসুক।

লেখক : করোনাজয়ী 

advertisement
Evall
advertisement