advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রতি এ কেমন ‘অমানবিকতা’

মাজেদুল হক তানভীর
১৮ মে ২০২০ ১৬:০৯ | আপডেট: ১৮ মে ২০২০ ১৬:০৯
advertisement

দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকের ছাত্র শাহরিয়ার কবির (ছদ্মনাম)। তার বাবা ঢাকার বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। করোনাভাইরাসের কারণে অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের মতো তার বাবার অফিস বন্ধ। চলতি মাসে অফিস থেকে পুরো বেতন পাননি। যেখানে পুরো বেতন পেলেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই সীমিত বেতন দিয়ে কীভাবে চলবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই পরিবারটির।

এদিকে চলতি মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সেমিস্টার ফি জমা দেওয়ার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। এক তো বাবার পুরো মাইনে মেলেনি, আরেকদিকে সামনে ঈদ। বাবাকে সেমিস্টার ফির কথা বলতেও সংকোচ শাহরিয়ারের।

অনেকটা একই গল্প ফারজানার (ছদ্মনাম)। ঢাকার একটি হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া (স্নাতক) করছেন। করোনার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন তিনি। তার বাবা কৃষিকাজ করেন। শস্য বিক্রির অর্থ নিয়ে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালান। করোনার প্রভাবে সব কিছু থমকে থাকার প্রভাব তার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপরও পড়েছে।

আয়ের পথ সংকোচিত হলেও ব্যয়ের খাত রয়ে গেছে আগের মতোই। হোস্টেল ভাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফি-এসব কিছু কীভাবে দেওয়া হবে এই চিন্তায় বাবা-মেয়ে উভয়ই রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।

এদিকে অনলাইনে চলছে ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট-পরীক্ষা। গ্রামে থাকার কারণে বিদ্যুৎ ও নেট সমস্যার কারণে নিয়মিত ক্লাস করতে না পারায় লেখাপড়ারও বিঘ্ন ঘটছে। তাই ভবিষ্যতের কথা ভেবে দিশেহারা ফারজানা।

শাহরিয়ার-ফারজানার মতো এমন গল্প দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর। করোনার এই মহাদুর্যোগে সরকারপ্রধানও যখন মানবিক হওয়া কথা বলেছেন, তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের দ্রুত টিউশন ফি পরিশোধ করার চাপ দিয়ে নির্দয় উদাহরণ স্থাপন করছেন।

অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম নিয়ে আমার আপত্তি নেই। বিকল্প আমাদের ভাবতেই হবে। কারণ এই ‘মহামারি’ সহজে নির্মূল হওয়ার মতো নয়। কিন্তু এখনই কেন? এখন কি শিক্ষা পরিবেশ আছে? এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যা আমাদের সবার জন্যই নতুন অভিজ্ঞতা। বদলে গেছে আমাদের জীবন-যাপনের ধরন। নতুন করে দেখছি নিজের দেশকে, বিশ্বকে। এরকম অবরুদ্ধ পৃথিবী আগে হয়নি কখনো। অনেক শিক্ষার্থী যে মানসিক অস্থিরতার রয়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পশ্চিমা দেশগুলোতে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। এই মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন দরকার, এটা বুঝতে পেরেছে সে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ আমাদের শিক্ষার্থীরা কেমন আছে, তা যেন আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে খুবই গৌণ।

সরকার ঘোষিত ‘সাধারণ ছুটি’ পেয়ে শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই গ্রামের বাড়ি চলে গেছে। আমাদের দেশে ইন্টারনেট যে কী সেবা দেয়, তা কারও অজানা নয়। ঢাকা থেকে দূরে কোথাও গেলে তা আমরা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি। এমন অবস্থায় অনলাইন ক্লাসের যে ব্যাঘাত ঘটবে, তা অবশ্যম্ভাবী। ক্লাসে সমস্যার কারণ শুধু দুর্বল ইন্টারনেট নয়। শিক্ষা সামগ্রী না থাকার কারণেও হচ্ছে। বই, খাতা, কলম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অনেক কিছুই শিক্ষার্থীরা সঙ্গে নেয়নি। নেবেই বা কেন! এ ছুটি যে এভাবে শুধু বেড়েই চলবে, তা কেউই ভাবেনি।

আর্থিক বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রোজ এক ঘণ্টা করে দুটো ক্লাস হলেও, মোট দুই ঘণ্টার ভিডিও কনফারেন্স খরচও কিন্তু কম নয়। ঢাকার বাইরে এখনো ওয়াইফাই সহজলভ্য হয়নি, মেগাবাইট কিনেই ইন্টারনেট ব্যবহার করা হয় বেশি। ইন্টারনেটের এই খরচটা শিক্ষার্থীরা জোগাবে কীভাবে? একজন শিক্ষার্থীরও যদি এই টাকা সংগ্রহ করতে সমস্যা হয়, তাহলে অবশ্যই এটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ‘চাপ না দিয়ে’ আদায় করতে পারবে সেমিস্টার ফি। ইউজিসি’র এই নির্দেশনা ইতিমধ্যেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নানা কৌশলে সেমিস্টার ফি দিতে বাধ্য করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

আমার ছোট ভাই ঢাকার বাইরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। বিকাশে কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে নানাভাবে চাপ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনি নির্দিষ্ট সময়ও বেধে দেওয়া হচ্ছে। কল করে, ম্যাসেজ পাঠিয়ে টাকা চাওয়া হচ্ছে। এভাবেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানসিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা সবাই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান, এমনটা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অনেক শিক্ষার্থী টিউশন, খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজের সেমিস্টার ফি পরিশোধ করে। গেল দুইমাসে এসব কিছু করা সম্ভব হয়নি। অনেকে চাকরিও হারিয়েছেন ইতিমধ্যে। অনেকের পক্ষে সম্ভব না এই মুহূর্তে মা-বাবাকে চাপ দিয়ে টাকা আদায় করা।

এই যে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছে, এই সময়টাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত আপদকালীন শিক্ষা বিমা, আর্থিক প্রণোদনা, সহজ কিস্তি বা যেভাবেই হোক শিক্ষার্থীদের কোনো না কোনোভাবে সাহায্য করা, পাশে থাকা। উল্টো তারা আরও টাকা নেওয়ার জন্য নানা কৌশলী ভূমিকা পালন করছে।

অনেকে সেমিস্টার ফি ছাড় দেওয়ার দাবি তুলেছেন। শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একত্রিত হচ্ছে। সংগঠিত প্রতিবাদ জানাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আসা দাবিটা কোনোভাবেই অযৌক্তিক নয়। হ্যাঁ এটা মানি যে, একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ আছে অনেক। শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়েই প্রতিষ্ঠান চলে। শিক্ষক, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হয়। কিন্তু খরচ বেঁচে যাওয়ার খাতও আছে। প্রায় দুইমাস ধরে ক্যাম্পাসগুলো বন্ধ রয়েছে। এসি বন্ধ, লাইট বন্ধ, লিফট বন্ধ। ফলে প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে না। খাওয়ার পানি, ব্যবহারের পানির খরচও লাগছে না। সুতরাং এখান থেকে টাকা বাঁচিয়ে সেমিস্টার ফি ছাড় দিতে পারে।

আরেকটি পদ্ধতিও আছে, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাদে অন্য খরচ আপাতত বন্ধ রাখা যায়। এই মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজ, নতুন ক্যাম্পাস বা শাখা তৈরির প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া অতি জরুরি নয়, এমন খাতের খরচ বন্ধ করে টাকা বাঁচিয়ে শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ফি ছাড় দেওয়া সম্ভব। এই সদিচ্ছার যথেষ্ট অভাব দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষা কোনো ব্যবসার করার জিনিস নয়। শিক্ষার কাজ মানুষকে মানবিক করা। যাদের কাছে শিক্ষার্থীরা যাচ্ছে এটা অর্জনের জন্য, তারাই বিপদে আরও কঠোর হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছে। তাহলে নতুন প্রজন্ম কি শিখে দেশের হাল ধরবে?

মাজেদুল হক তানভীর : সহসম্পাদক, দৈনিক আমাদের সময়। ইমেইল : [email protected]

advertisement
Evall
advertisement