advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

সবাই মিলে ঈদ উদযাপন চিরায়ত ঐতিহ্য। এবার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। করোনা থমকে দিয়েছে বিশ্বকে। থমকে গেছে সামাজিক বন্ধনও। এরপরও মানুষ ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেবে
এবার অন্যরকম ঈদ

হাসান শিপলু
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০৯:২৪
advertisement

ঈদের ঠিক কয়েক দিন আগে কর্মব্যস্ত থাকত সব গণমাধ্যম অফিস, ব্যতিক্রম ছিল না দৈনিক আমাদের সময়ও। শেষমুহূর্তে শপিং, ঈদযাত্রা ও ঈদ রাজনীতির সঙ্গে নানা ঘটন-অঘটনের সংবাদ নিয়ে সরগরম হতো বার্তাকক্ষ। আর শেষ কর্মদিবসে কাজ শেষে বাড়ি যাওয়ার তাড়া। একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলিতে ছড়িয়ে যেত আনন্দবিলাস। পরতে পরতে ঈদের বিশেষ আয়োজন।

কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট শুধু ভিন্ন বললেই এটিকে সঠিক সংজ্ঞায়িত করা হবে না। করোনা ভাইরাসের মহামারীর কারণে মানতে হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে শিফট করে সংবাদকর্মী কমিয়ে এনেছে অফিসগুলো। বাতিল হয়েছে বিশেষ আয়োজনের পরিকল্পনাও। সতর্কতা হিসেবে অনেক পত্রিকা তাদের প্রিন্ট ভার্সনই বন্ধ রেখেছে। এর পরও ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন দেড় শতাধিক, প্রাণ গেছে অন্তত তিন সাংবাদিকের।

কঠিন এ পরিস্থিতিতে সবার মনেই আতঙ্ক আর হতাশা। তাই আগের মতো ঈদে এবার সেই আনন্দ করার সুযোগই বা কোথায়? সারাদেশ লকডাউনে, বাসা থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি; রাস্তায় গেলে মানুষের সংস্পর্শে এসে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়- এমন নানা শঙ্কায় এবারের ঈদুল ফিতরের আনন্দ ম্লান হওয়াটাই যেন স্বাভাবিক।

ঈদ ঘিরে প্রতিবছর চাঙ্গা হয় দেশের অর্থনীতি। বাজারে বাড়ে টাকার প্রবাহ। অর্থের বড় জোগান আসে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস, গতিশীল হয় অভ্যন্তরীণ বাজার, জাকাত ও ফিতরা থেকে। অন্যতম একটি উৎস রেমিট্যান্সও। রাজনৈতিক নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা যান গ্রামে। এ সময় নিম্নআয়ের মানুষের হাতেও টাকা যায়। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ঈদ কেন্দ্র করে পরিকল্পনা সাজায়। প্রতিবছর দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হয়।

তবে করোনা এবার অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি থামিয়ে দেয়নি; বরং উল্টোযাত্রা হয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে বোনাস নয়; বরং বেতন পেতেই হিমশিম খাচ্ছেন কর্মীরা। আবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে এসেছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। এর প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি এখন ত্রাণনির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন বাস্তবতার মাঝেই আজ চাঁদ উঠলে আগামীকাল রবিবার ঈদ। যদিও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের কোথাও গতকাল শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যায়নি। সে হিসাবে এবার দেশেও ৩০ রোজা শেষে আরও একদিন পর অর্থাৎ সোমবার ঈদুল ফিতর উদযাপিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শত প্রতিকূলতার মাঝে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন মুসলমানরা। মানুষে মানুষের ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতা ফুটে উঠবে এ ঈদেও। শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে হয়তো কোলাকুলি কিংবা করমর্দন করবেন না।

তবে শুভেচ্ছা জানিয়ে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে নিশ্চয়ই কার্পণ্য করবেন না কেউ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের ঈদ শুভেচ্ছা তো থাকবেই। চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠবে কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই চিত্ত আকুল করা গান-‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষ এলো খুশির ঈদ...।’

ধর্মীয় বিভিন্ন অনুশাসন থাকলেও অন্তর্বস্তু হিসেবে হাজির থাকে মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন ও স্রষ্টার প্রতি সন্তুষ্টি জ্ঞাপনের বিষয়টি। তাই ঈদ মানেই কোলাকুলি, একের বাড়িতে অন্যের আসা, খাওয়া-দাওয়া, দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। ঈদের এই অর্থ ও অন্তর্বস্তুর কোনো কিছুই এবার না বদলালেও আক্ষরিক অর্থেই আচারিক অনেক কিছু বদলের বাস্তবতা বিরাজ করছে।

তবে দুর্যোগময় মুহূর্তে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন হাজার হাজার মানুষ। কড়াকড়ি শীতিল করে গতকাল থেকে ব্যক্তিগত গাড়িতে বাড়ির ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সীমিত আকারে শপিংমল ও মার্কেটগুলো খোলা থাকায় শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা করছেন মানুষ। যদিও করোনা সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে মার্কেটগুলোতে আগের ঈদের মতো ভিড় নেই। ক্রেতা খুবই কম।

প্রতিবছরই ঈদ ঘিরে চাঙ্গা হওয়া অর্থনীতিতে বাজারে বাড়ে টাকার প্রবাহ। অর্থের বড় জোগান আসে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-বোনাস, জাকাত ও ফিতরা থেকে। রেমিট্যান্সও অন্যতম একটি উৎস। সব মিলিয়ে গতিশীল হয় অভ্যন্তরীণ বাজার। এ সময় দেড় থেকে দুই লাখ কোটি টাকার লেনদেন হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায় নানা পরিকল্পনা থাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীদেরও। তবে করোনা এবার অর্থনীতির চাকা পুরোপুরি থামিয়ে না দিতে পারলেও, যাত্রাটা হয়েছে ঠিক উল্টো।

ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাবে বোনাস তো দূরের কথা, বেতন পেতেই হিমশিম খাচ্ছেন কর্মীরা। প্রবাসীরা নিজেরাই আজ মহাবিপদে। অর্থকষ্টে পোশাকশ্রমিকদেরও চোখে জল। আন্দোলন-সংগ্রাম করেও মন গলাতে পারেননি মালিকদের। এর মধ্যে আবার তিন দিন আগে হামলে পড়া শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আম্পানে লণ্ডভণ্ড হয়েছে সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের অনেক জেলা। ভেঙে যাওয়া বাড়িঘর ঠিক করতেই ব্যস্ত সেখানকার মানুষ। জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে করছেন লড়াই। ফলে ওইসব এলাকার ঈদ আনন্দ নোনা জলেই ভেসে গেছে।

ঈদের দিনের প্রথম আনন্দের মুহূর্তটি শুরু হয় পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব নিয়ে দল বেঁধে ঈদগাহে যাওয়ার মাধ্যমে। তারপর তো সেখানে ঈদের জামাত এবং পরস্পরের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময়। সেই আদি থেকে চলে আসা রেওয়াজ হচ্ছে কোলাকুলি ও করমর্দন। কিন্তু এবার তো একে অপরকে স্পর্শ করাই নিষেধ। তা ছাড়া ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে এবার জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়াসহ কোনো উন্মুক্ত স্থানেই ঈদের নামাজ হবে না। তবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদগুলোতে ঈদের নামাজ আদায়ের অনুমতি দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

ছোঁয়াচে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ও এর কারণে বিশ্বে লাখো মৃত্যু এরই মধ্যে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার বিষয়ে মানুষকে সচেতন করেছে। তাই এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভালোবাসার মানুষটির প্রতি নিজের কর্তব্যবোধ থেকে সবাই নিয়ম মেনে ধর্মীয় উৎসব পালন করবেন বলেই প্রত্যাশা।

 

advertisement