advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনাকাল ও আমাদের ঈদ

শামসুজ্জামান খান

২৩ মে ২০২০ ০০:০০
আপডেট: ২২ মে ২০২০ ২৩:৩৯
advertisement

পৃথিবীর ইতিহাসে মহামারীর ঘটনা ঘটেছে বহুবার। তবে ১৯১৮ সালের পর থেকে করোনা ভাইরাসের আগ পর্যন্ত এত বড় আকারে প্যানডেমিক রোগ দেখা দেয়নি বিশ্বজুড়ে। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনাদায়ক। মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আঠারো শতকেও স্প্যানিশ ফ্লু থেকে রক্ষা পেতে মুখে মাস্ক পরিধান কার্যকরী ভূমিকা রেখেছে।

কোয়ারেন্টিনও খুব কার্যকরী পদ্ধতি। অবশ্য ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ওষুধ আবিষ্কারের কথা বলছে। ভ্যাকসিন বা টিকা দ্রুত মানবদেহে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে মৃত্যুহার অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করা যায়।

ইতিহাসে খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০ অব্দের কথা জানা যায় যে, প্যানডেমিক রোগ স্মল পক্সে (যা ভেরিওলা ভাইরাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল) গ্রিসের এথেন্স নগরীর ২০ শতাংশ মানুষের মৃত্যু ঘটে। ৫৪১ খ্রিস্টাব্দে ব্যাকটেরিয়াবাহিত রোগ প্লেগের ধাক্কায় আরেকবার কেঁপে ওঠে বিশ্ব। পুরো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ২০০ বছর ধরে চলে এ তা-ব। মারা যায় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ। তখনকার হিসাবে এটি ছিল পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশ। চতুর্দশ শতাব্দীতেও ঘটেছিল এমন প্যানডেমিক রোগ। কুষ্ঠ, কলেরা, ফ্লুয়ের মতো মহামারী রোগের ঘটনা ঘটেছে বিশ্বজুড়ে। ১৯১৮ সালে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা যায় পাঁচ কোটি মানুষ। কারও কারও মতে ১০ কোটি। এর পর আর বিশ্বজুড়ে এমন প্যানডেমিক রোগ ছড়িয়ে পড়েনি। ফলে ঈদ উৎসবও এভাবে পালিত হয়নি কোথাও।

আমাদের এই ভূখ-ে কবে, কখন, কীভাবে ঈদ উৎসবের উদ্ভব হয়েছে, তার কালক্রমিক ঘটনাপঞ্জি কোনো ইতিহাসবেত্তা বা ইসলামের ইতিহাস গবেষক এখনো রচনা করেননি। তবে নানা ইতিহাস গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে বাংলাদেশে রোজা পালন ও ঈদুল ফিতর বা ঈদুল আজহা উদযাপনের যে খবর পাওয়া যায় তাতে দেখা যায়, ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গদেশ মুসলিম অধিকারে এলেও এ দেশে নামাজ, রোজা ও ঈদ উৎসবের প্রচলন হয়েছে তার বেশ কিছু আগে থেকেই। এতে অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ বঙ্গদেশ যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে মুসলিম অধিকারে আসার বহু আগে থেকেই মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ ও সাধকরা ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে উত্তর ভারত হয়ে পূর্ব বাংলায় আসেন। অন্যদিকে আরবীয় ও অন্যান্য মুসলিম দেশের বণিকরা চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমেও বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এভাবেই একটা মুসলিম সাংস্কৃতিক, তথা ধর্মীয় প্রভাব যে পূর্ব বাংলায় পড়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ঈদ উৎসবের সূচনাও ওই প্রক্রিয়ায়ই হয়েছে।

ঈদ উৎসব শাস্ত্রীয় ইসলামের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তবে দ্বাদশ শতকে বাংলায় ইসলাম এলেও ৪০০-৫০০ বছর ধরে শাস্ত্রীয় ইসলামের অনুপুঙ্খ অনুসরণ যে হয়েছিল, তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেকালের বাংলায় ঈদ উৎসবেও তেমন কোনো ঘটনা লক্ষ করা যায় না। এর কারণ হয়তো দুটিÑ এক. গ্রামবাংলার মুসলমানরা ছিলেন দরিদ্র এবং দুই. মুসলমানের মধ্যে স্বতন্ত্র কমিউনিটির বোধ তখনো তেমন প্রবল হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটা সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও তখনো সৃষ্টি হয়নি। আর এটা তো জানা কথাই যে, সংহত সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও তখনো সৃষ্টি হয়নি। আর এটা তো জানা কথাই যে, সংহত সামাজিক ভিত্তি ছাড়া কোনো উৎসবই প্রতিষ্ঠা লাভ করে না। বৃহৎ বাংলায় ঈদ উৎসব তাই সপ্তদশ, অষ্টাদশ এমনকি ঊনবিংশ শতকেও তেমন দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়। নবাব-বাদশাহরা ঈদ উৎসব করতেন, তবে তা সীমিত ছিল অভিজাত ও উচ্চবিত্তের মধ্যে, সাধারণ মানুষের কাছে সামাজিক উৎসব হিসেবে ঈদের তেমন কোনো তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল না। তবে গোটা উনিশ শতক ধরে বাংলাদেশে যে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন চলে, তার প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পড়েছে নগরজীবন ও গ্রামীণ অর্থবিত্তশালী বা শিক্ষিত সমাজের ওপর। মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাও এই চেতনাকে শক্তিশালী করেছে। আর তাই এই অনুকূল পরিবেশেই ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এক শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাকে কেন্দ্রে রেখে পরিচালিত বাংলাদেশ আন্দোলন এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ার যে নবরূপায়ণ ঘটেছে, তাতে ঈদ উৎসব রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে এবং সেকাল থেকে একালে উত্তীর্ণ ঈদ উৎসব এখন অনুজ্জ্বল থেকে ক্রমে ক্রমে অত্যুজ্জ্বল মহিমায় অভিষিক্ত।

কিন্তু করোনাকালীন এই ঈদ কারও জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। সরকারি নির্দেশে সবাইকে ঘরে থাকার কথা থাকলেও কেউ তা মানছে না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, অতিরিক্ত অর্থ খরচ করে, দলবেঁধে মানুষ বাইরে চলাফেরা করছে; শহর থেকে গ্রামে যাচ্ছে। এতে ঝুঁকিটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। কারণ কোভিড-১৯ মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। দ্রুত একজন থেকে অন্যজনে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের ভেতরে সেই বোধই জাগ্রত হয়নি যে, এই রোগে নিজের ক্ষতি তো হবেই, পাশাপাশি অন্যের ক্ষতিরও কারণ হয়ে দাঁড়াব।

আমাদের শিক্ষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের বিবেচনা বোধ এমনভাবে গড়ে ওঠেনি যে, একজন আরেকজনকে কীভাবে বিবেচনা করবে। শিক্ষাব্যবস্থায় তো মানুষ দুর্বল। তবে মৌলভি সাহেবরা যা করছেনÑ একজন মৌলভি বলেছেন মুসলমানরা কখনো করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হবে না। আরেকজন মৌলভি সাহেব বলেছেন ১২ মে এটা শেষ হয়ে যাবে। আর কখনো হতে পারবে না। আরেকজন বলেছেন, রোজা আসার সঙ্গে সঙ্গে করোনাও দূর হয়ে যাবে, ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা কখনো এসবে আক্রান্ত হতে পারে না।

প্রকৃতপক্ষে এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ইসলামকে হাস্যকর করে তোলা হচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এই যে মাহে রমজানের মধ্যে অসংখ্য মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, সাধারণ মানুষ মৌলভি সাহেবের বক্তব্যকে মিথ্যা বলে ধরে নেবে। ভাববে, এরা না জানে কোরআন, না জানে ধর্মাধর্মের বিষয়-আশয়। মোট কথা, এরা কিছুই জানে না, অজ্ঞ। এমন লাখ লাখ অজ্ঞ দেশে জন্ম হচ্ছে। বলে ভালো কিছু আশা করা খুব কঠিন।

তবে ভালো লাগে, সৌদি আরবের মতো মুসলিম দেশ মহামারী করোনা ভাইরাসমুক্ত থাকতে কার্ফু দিয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ অনেক সচেতন। নামাজ সংক্ষিপ্ত করে পড়ে, ফরজটুকু পড়ে। কারণ বৃদ্ধ থাকতে পারে, বাড়িতে রোগী থাকতে পারে, যাতে তারা সমস্যায় না পড়ে। বাকি নামাজ বাড়িতে গিয়ে পড়ে থাকে। আর অনেককে আটকিয়ে রাখা হয়, যাতে সমস্যা বিশাল আকার ধারণ করতে না পারে। মোনাজাত তো নামাজের অংশ নয়। গুরুত্বপূর্ণও নয়। বরং নামাজই আসল।

হজরত মুহম্মদ (সা.) সবচেয়ে বড় ধার্মিক। তার মহিমা সারাবিশ্বে প্রশংসিত। তার গুণের কথা কে না জানে। তিনি ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। তিনি শান্তির দলিল মদিনা সনদ করেছিলেন, যার মাধ্যমে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মানবিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমাদের দেশে সেই অর্থে বড় কোনো ধার্মিক নেই, যিনি মানুষের মধ্যে শান্তির বার্তা দিতে পারেন, যার কথা সবাই ভালোভাবে গ্রহণ করবে, কেউ বিভ্রান্ত হবে না। মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীরা ছিলেন বড় ইসলামি প-িত ও ধার্মিক। এখন এমন কোনো ইসলামি চিন্তাবিদ, প-িত নেই, যার একটা বই বিভিন্ন মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে পাঠ করে, জানে।

আমরা চাই ধর্মের চর্চা গভীরভাবে হোক; ভালো করে পড়াশোনা করে, জেনে-শুনে-বুঝে। ধর্ম নিয়ে বিশ্বের অন্য কোনো মুসলিম দেশের মানুষের মধ্যে বাড়াবাড়ি নেই। বাহুল্য কথাবার্তা নেই, যেভাবে আমাদের এখানে হচ্ছে, হয়ে আসছে। এসব বন্ধ করা প্রয়োজন।

করোনাকালীন ঈদ ঘরে বসেই হোক। সবাই নিরাপদ থাকুক। চাই সবাই ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক। সচেতন থাকুক।

advertisement