advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

প্রবাসীর ঈদ করোনার বিষে নীল

আরিফুজ্জামান মামুন
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২০২০ ২৩:৩৯
advertisement

বিশ্বের ১৭০টি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন প্রায় এক কোটি বিশ লাখ বাংলাদেশি। উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে কত কত চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তারা ভিনদেশে পাড়ি জমিয়েছেন প্রিয়জনদের নিয়ে আরও ভালো থাকার জন্য, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, সংসার-ব্যয়ের ছুটে চলা ঘোড়ার লাগাম ধরার জন্য। একাকী নিঃসঙ্গ প্রবাস জীবনে কত সব জটিলতা পেরিয়ে চলতে হয়। অথচ সেসব আড়াল করে রাখেন প্রিয়জনদের কাছে, যাদের সুখের জন্য তাদেরই ছেড়ে পড়ে আছেন একাকি প্রবাস জীবনে। তাই

কষ্টার্জিত টাকা দেশে পাঠালেও কষ্টের গল্পগুলো আড়াল করে রাখেন। কিন্তু এবার বোধহয় আড়ালের গল্পগুলো এতটাই তীব্র আঘাত হেনেছে যে, তা আর চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব না। করোনার বিষাক্ত ছোবলে প্রবাসী কর্মীরা অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে ঈদ এগিয়ে আসায় চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা।

করোনা ভাইরাস মহামারীতে বিশ্বজুড়ে লকডাউন ও অচলাবস্থার কারণে বহুমাত্রিক সংকট দেখা দিয়েছে বৈদেশিক শ্রমবাজারে। প্রবাসে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি বেতন পাচ্ছেন না। অনেকে ছাঁটাই এবং মজুরি হ্রাসের কবলে পড়েছেন। এ এক দুর্বিষহ জীবন যাপন।

প্রবাসে কর্মরত এক কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশেরই কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্যে। করোনা সংকটে চাকরি হারানো প্রবাসী ছাড়াও অবৈধভাবে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক কর্মীর দেশে ফেরার আশঙ্কা করছে সরকার। এরই মধ্যে কুয়েত, কাতার, ওমান, বাহরাইন মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশি কর্মী ফেরত আসছে। করোনা মহামারীর পরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি ফিরবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রবাস জীবনের কষ্টটা একটু অন্য ধরনের। সব আছে, তবু যেন কিছুই নেই। ঈদ আসে, ঈদ যায়; কিন্তু প্রবাসীদের ঈদ কাটে নিঃসঙ্গতায়।

এমিনতেই পরিবার আর আত্মীয়স্বজনদের ছেড়ে প্রবাসের একাকিত্বে কেটে যায় ঈদের দিনটি। তার ওপর এবার করোনা মহামারী প্রবাসীদের কষ্টকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এর পরও অনেকে সমস্যা আড়াল করেই মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানের ঈদ উদযাপনে টাকা পাঠিয়েছেন। যারা বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, তাদের নিজেদেরই ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি থেকে যায় উৎসবহীন। কিন্তু এর পরও জীবন থেমে থাকে না। পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি দেখেই সব ভুলে যান এই প্রবাসীরা।

মালয়েশিয়ার পর্যটক নগরী মালাক্কাতে ফানিচার ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন নোয়াখালীর সেনবাগের আবদুস সবুর। তিনি বলেন, টানা লকডাউনের কারণে কোম্পানি থেকে শুধু খাবারের টাকা দিয়েছে নিজে খাবারের জন্য। কষ্ট করে কিছু টাকা পরিবারকে দিয়েছি রমজান উপলক্ষে। কিন্তু ঈদকে সামনে রেখে এক টাকাও দিতে পারছি না। মেয়ে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। যাদের সাথে কাজ করি সবার একই অবস্থা। অনেক আকুতি-মিনতি করেও কারও কাছে এক টাকা মেলে না। একজন প্রবাসী হয়েও বলতে লজ্জা লাগছে, পরিবারের লোকজন কারও কাছে হাত পাততে পারছে না। কেউ আমাদের ত্রাণ দেয় না। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের কারণে এটা যেন প্রবাসীদের নিয়তি হয়ে গেছে। জানি না আল্লাহ পাক কবে আমাদের আগের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে দেবে। পরিবারকে ঠিকমতো টাকা পাঠাতে পারব। কোম্পানি থেকে বলল, নতুন অর্ডার নেই তাই কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। শুনেছি হয়তো অনেককে ছাঁটাই করা হবে; জানি না ভাগ্যে কী আছে। আর আমাদের জীবনে ঈদ বলে কিছু নেই। এবার করোনার কারণে ঈদের নামাজ হবে না। ফলে ঘরেই বন্দি জীবন কাটবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বেকারত্ব ও টানা লকডাউনে ঘরবন্দি সৌদি আরবে থাকা প্রায় ২২ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। বৈশ্বিক মহামারীর ছোবলে এবার প্রবাসীদের মনে কোনো আনন্দ-উদ্দীপনা নেই, নেই উৎসব উদযাপনের প্রস্তুতি। সৌদি আরবে প্রবাসী বাংলাদেশিদের এবারের ঈদটা হবে একেবারেই ভিন্ন রকম। ঈদকে সামনে রেখে করোনা প্রতিরোধে ২৩ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত লকডাউন ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। এদিকে করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে দিন পার করছে ২২ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি। লকডাউন চলাকালে কিছু সময় অনেকের কাজ চললেও বেতন পাননি। বন্ধ রয়েছে দেশটির ছোট-বড় অনেক কোম্পানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। একদিকে চলছে নিজেদের উৎসববিহীন ঈদ প্রস্তুতি; অন্যদিকে বাড়ছে পরিবারের জন্য কিছু টাকা পাঠানোর তাড়না। ফলে এক ধরনের অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন তারা।

মদিনার ব্যবসায়ী যুবায়ের আহম্মেদ বলেন, প্রতিবছর ঈদকে ঘিরে পরিবারের জন্য যে পরিমাণ টাকা পাঠাতাম, এবার তার তিন ভাগের একভাগও দিতে পারছি না। লকডাউনের কারণে বাসায় দুমাস ধরে বন্দি হয়ে আছি। খেয়ে না খেয়ে অনেকে রোজা পালন করছি। এমন পরিস্থিতিতে যে পড়তে হবে, তা আমরা কোনোদিন ভাবিনি।

আবুল কালাম পরিবারের বড় সন্তান অনেক স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে আসেন। অসুস্থ বাবা-মা স্ত্রী। প্রতিমাসে তার পাঠানো অর্থেই সংসার চলে। দীর্ঘদিন কাজ না থাকায় ঈদ উপলক্ষে সেমাই-চিনি কেনার মতো অর্থ পাঠাতে পারে না ছেলে। পাঁচ বছরের কন্যাসন্তানের আবদার ঈদে নতুন জামা। সেটিও এবার পূরণ করতে পারেননি মালয়েশিয়া প্রবাসী আবুল কালাম।

একইভাবে লক্ষ্মীপুরের মোহাম্মদ সালাম ২০১৭ সালে সাগরপথে মালয়েশিয়া আসেন। কাজ করতেন সিঙ্গাপুরের সীমান্তবর্তী শহর জোহর বারুর একটি ফ্যাক্টরিতে। পাঁচ জনের সংসারে একাই উপার্জনকারী। প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে হয়। দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকাতে এবার ঈদে টাকা পাঠাতে পারেননি। বগুড়ার হেলাল মিয়া দেশে দিনমজুরের কাজ করতেন। ২০১৮ সালে কলিং ভিসায় মালয়েশিয়া আসেন। এক বছর পরেই কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। অনেক টাকা ধারদেনা করে আসায় বাধ্য হয়েই অবৈধ হয়ে কাজ করেন মালাক্কা শহরের একটি কনস্ট্রাকশন প্রজেক্টে। করোনার কারণে অবৈধ হওয়ায় তার কাজ চলে গেছে। এই মুহূর্তে বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ শ্রমিকদের আটক করছে মালয়েশিয়া সরকার। ফলে এক দুর্বিষহ জীবন কাটছে। ঈদ কোনো বাড়তি অর্থ বহন করে না তার কাছে।

ওমানের ফ্রি ভিসায় দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করতেন যশোরের মতিন। করোনার কারনে কাজ বন্ধ। ফলে খাদ্য সংকটে পড়েছেন ইতোমধ্যে। বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে ধারদেনা চেয়ে জীবন কাটছে তার। এ সময় বাড়িতে ঈদের জন্য কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। আর এবারের ঈদও ঘরবন্দি থেকে কাটবে তার। বললেন, করোনা আমাদের বড় ক্ষতি করে দিয়ে গেল। দেশে ফিরে যেতে হয় কিনা সেটাই বুঝছি না। করোনার কারণে অনেক প্রবাসীকে দেশে ফিরতে হবে। কারণ কোম্পানিগুলো লোক ছাঁটাই করবে। কাতারের দোহায় থাকেন ময়মনসিংহের রাসেল। করোনার কারণে তার কোম্পানির কাজও বন্ধ। প্রথম মাসে বেতন পেলেও এখন বন্ধ। ঈদে কোনো রকমে কিছু টাকা দেশে পাঠাতে পারলেও নিজে আছেন শঙ্কায়। করোনার পরবর্তীতে কী হবে সেটি চিন্তিত করে তাকে।

বিদেশে এসে চাকরি করে অনেক টাকাপয়সা বাড়িতে পাঠাবে, দুঃখের ছায়ার পরিবর্তে সুখের আলোয় সংসার উজ্জ্বল হবেÑ এ প্রত্যাশা বুকে নিয়ে প্রবাসে আসা মানুষগুলোর স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে করোনা। কিন্তু তার পরও জীবন থেমে থাকে না। এবারও ঈদের দিন সকালে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় হাসিমুখে তারা বলতে চাইবেন, ভালো আছেন, সুখে আছেন। বুকের ভেতর চেপে কষ্ট-যন্ত্রণা। মনে গুমড়ে উঠবে অব্যক্ত আর্তনাদ; চোখের কোনে জল। সযতনে প্রিয়জনদের কাছে আড়াল করা গল্পগুলোর কষ্ট বুকে কেটে যাবে ঈদের পুরোটা দিন। কষ্ট বুকে নিয়েই কাজ খুঁজবেন তারা, পরিবারের সুখের আশায়; যে স্বপ্ন নিয়ে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন তা পূরণের প্রত্যাশায়।

advertisement
Evall
advertisement