advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনায় বাড়ছে মানসিক সমস্যা

দুলাল হোসেন
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২০২০ ২৩:৩৯
advertisement

করোনার প্রাদুর্ভাবে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। সামান্য সর্দি, জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেই করোনা সংক্রমণের শঙ্কা কাজ করছে। এ ধরনের লক্ষণকে করোনা সন্দেহে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবন করছেন। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, করোনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেকে প্যানিক হয়ে যাচ্ছেন। প্যানিক হলে বুক ধরফড়, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা কাঁপা ও শারীরিক দুর্বলতা অনুভূত হয়। তখন এসব লক্ষণকে করোনার লক্ষণ মনে করে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ কোভিড-১৯ মহামারী : চিকিৎসক, নার্স,

স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ‘দুরূহ কাজে নিজেরাই দিও কঠিন পরিচয়’ শীর্ষক এক ভিডিও প্রতিবেদন বলেছেন, করোনা কতগুলো কারণে মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হয়। সংক্রমিত হওয়ার ভয়, সংক্রমণের ভয়, কাছের মানুষের সংক্রমণ ও মৃত্যুর আশঙ্কা, জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকট, কোয়ারেন্টিন বা আইসোলেশেন মানিয়ে নেওয়ার জটিলতা এবং কোভিড নিয়ে নানা কুসংস্কার মনের ওপর চাপ তৈরি করে।

ডা. হেলাল উদ্দিন আরও জানিয়েছেন, কাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপন্ন হতে পারে। হাসপাতালে ভর্তি রোগী, বাসায় আইসোলেশনে থাকা কোভিড সংক্রমিত রোগী, কোয়ারেন্টিনে বা লকডাউনের কারণে বাসায় থাকা আপাতত কোভিড-১৯-মুক্ত রোগী, ফ্রন্টলাইন ফাইটার্স (চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, সাংবাদিক, সেনাবাহিনীসহ অন্য) প্রমুখের এ সমস্যা হতে পারে। মানসিক সমস্যার সাধারণ কিছু লক্ষণ মধ্যে ঘুমের সমস্যা : ঘুম না আসা, মাঝেমধ্যে ঘুম ভেঙে যাওয়া, দিনে ঘুমানো রাত জাগা।

শরীরিক লক্ষণ : বুক ধড়ফড়, বেশি ঘাম হওয়া, মুখ শুকিয়ে আসা, ঘাড়-মাথা-হাত-পা ব্যথা বা জ¦ালাপোড়া, হাত-পায়ে জোর না পাওয়া ও নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা।

মনোযোগে সমস্যা : কোনো কিছুতে মনোযোগ দিতে না পারা, এমনকি পছন্দের বিষয়ও ভুলে যাওয়া।

আবেগের সমস্যা : মন খারাপ, কিছু ভালো না লাগা, অকারণে রেগে যাওয়া ও আবেগ অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাওয়া।

আচরণে পরিবর্তন : খিটখিটে আচরণ, আগ্রাসী হয়ে যাওয়া, অনেক সময় পরিচিত স্থান বা ব্যক্তি চিনতে না পারা ও আত্মহত্যার চিন্তা করা। আগে থেকে মানসিক সমস্যা থাকলে তার লক্ষণ বেড়ে যাওয়া।

ডা. হেলাল উদ্দিন মানসিক চাপ এড়াতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এর মধ্যে রুটিন মেনে চলা, কাজের সময় ছাড়া অন্য সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমানো, রাত জেগে দিনে না ঘুমানো, নিয়ম মেনে বিশ্রাম করা, ধর্মচর্চা, শখের চর্চা, হালকা ব্যয়াম, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিজেকে সময় দেওয়া, অন্যের কাজের প্রশংসা করাসহ আরও কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।

করোনা মহামারীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুম থেকে বারবারই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে করোনা প্রাদুর্ভাবকালীন মানসিকভাবে উজ্জীবিত থাকতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তার পরও মানুষ করোনা সংক্রমিত হলে মারা যাব এমন দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। এতে মানুষের মধ্যে অনিদ্রা, বিরক্তি, বিমলতা, উদ্বিগ্ন অবস্থা, নেতিবাচক চিন্তা ও আতঙ্ক কাজ করছে।

এদিকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবকালীন মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ব্যাপক ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলছে এমন তথ্য উঠেছে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) এবং অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির যৌথভাবে পরিচালিত এক সমীক্ষায়। ‘করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) কালীন মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব’ শীর্ষক ওই সমীক্ষার ফল গত ১৪ মে প্রকাশ করা হয়।

গবেষণা দলের চিফ ইনভেস্টিগেটর ছিলেন বেরোবি ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মেজর নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। সহযোগী ইনভেস্টিগেটর ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ড. তানভীর আবির এবং ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড হেলথের সিনিয়র লেকচারার ড. কিংসলে এগো।

গবেষণা দলের সহকারী গবেষক হিসেবে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ সহকারী অধ্যাপক দেওয়ান মুহাম্মদ নূর-এ ইয়াজদানি, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ত্বহা হুসাইন এবং ড. ওয়াজেদ রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইন্সটিটিউটের রিসার্চ ফেলো মো. হাবিবুর রহমান।

সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, করোনাকালীন মানসিক স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে ব্যাপক ক্ষতিকারক প্রভাব পড়েছে। করোনা মহামারী দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান হারে ছড়িয়ে পড়ায় এটি সাধারণ জনগণ তথা প্রাপ্তবয়স্ক, পেশাদার ও সম্মুখসেবা প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গ এবং দেশে বিদ্যমান অন্য রোগাক্রান্ত মানুষের মধ্যে এক ধরনের আশঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠান দুটির এবারের গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল করোনার সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য এবং মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের বিভিন্ন স্তর অনুসন্ধান করা। দেশের ক্রমবর্ধমান লকডাউনের ফলে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসব বিষয়ের আমাদের কাছে স্পষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। উক্ত বিষয়কে সংখ্যাতাত্ত্বিক উপস্থাপন ও নির্দিষ্টকরণ এ গবেষণায় আলোকপাত করা হয়েছে।

গবেষণাটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার মাধ্যমে একটি ক্রস সেকশনাল সমীক্ষা পরিচালনা করে ২০২০ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে লকডাউন চলাকালীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সংমিশ্রিত এবং স্বপ্রণোদিত অনলাইন জরিপ পরিচালনা করা হয়, যেখানে ১০ হাজার ৯০০ প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার ৬৬০ উত্তরদাতা প্রশ্নপত্র যথাযথভাবে সম্পন্ন করেন।

গবেষণার ফলে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৮০ দশমিক ২ শতাংশ পরিবারের সঙ্গে থাকছেন এবং তাদের মতে সংকটকালে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করার কারণে তারা কিছুটা হলেও স্বস্তিবোধ করছেন। ১ হাজার ১৮৫ জন জানিয়েছেন তারা ইতোমধ্যে করোনার পরীক্ষা করাতে সক্ষম হয়েছেন এবং ২৯ দশমিক ২০ শতাংশ আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। উত্তরদাতাদের ৯১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন। ৭২ দশমিক ৮ শতাংশ অনিদ্রায় ভুগছেন, ৭১ দশমিক ৬ শতাংশ বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ এবং ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও শঙ্কার কথা উল্লেখ করেন। ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ সামগ্রিকভাবে আতঙ্কিত। ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তাদের কাছে জীবন অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

advertisement
Evall
advertisement