advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

উপকূলে আম্পানের তা-ব
খাবার জোটেনি মনিষাদের

মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল আশাশুনি থেকে ফিরে
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০৭:৩৮
মনিষা মণ্ডল
advertisement

অতীতের সংসার এখন নিছক কয়েকটা খুঁটি। বাকি সব উড়ে গেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আম্পানের গ্রাসে। তাসের ঘরের মতোই ভেঙে পড়েছে অনেকের আশ্রয়। আঁধারে আলো জ্বালানোর খড়কুটাও নেই কারও কারও। এ যেন অবর্ণনীয়, অকল্পনীয়, অপূরণীয় ক্ষতি। গত বুধবার সারারাতের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত বেশ কয়েকটি উপকূলীয় এলাকা।

স্থানীয়দের অনেকেই বলেন- ঝড়ের এমন তা-ব আর কখনো দেখিনি। করোনার ধাক্কা তো ছিলই। গোঁদের ওপর বিষফোড়ার মতো আম্পান এসে সব তছনছ করে দিয়েছে। প্রত্যেকেই আমরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। স্তম্ভিত।

চোখে-মুখে হাতাশার ছাপ। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছেন না; আবেগতাড়িত কণ্ঠে অবশেষে জানালেন, গত তিনদিন রান্না-খাওয়া কিছুই হয়নি। সকাল থেকে দাঁড়িয়ে যে এক কলস পানি পাওয়া গেছে, তা আনতে গিয়েও পায়ে বিদ্ধ হয়েছে বাজবরুনের কাঁটা। ওই পানিই তাদের রাতের ‘আহার’। তার মধ্যে আবার নতুন আতঙ্কÑ বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া বাঁধটিও ভেঙে গেছে প্রায়। এটি দ্রুত সংস্কার না হলে বাড়ির অবশিষ্ট জায়গাটুকুও গ্রাস করবে ফুলেফেঁপে ওঠা নদী। তখন আর কিছুই থাকবে না মনিষা মণ্ডলদের।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার দয়ারঘাট এলাকার দুখিরাম ম-লের মেয়ে মনিষা। পড়ালেখা করেন খুলনায় থেকে। আযম খান কমার্স কলেজের ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি হলে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন তিনি। আর এসেই দেখা হলো ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের সঙ্গে। খোলপেটুয়া নদীভাঙনের প্রথম শিকারও তার পরিবার।

মনিষা জানান, আম্পানের তা-বে আশাশুনির খোলপেটুয়া নদীর বেড়িবাঁধটি প্রথম ভাঙে দয়ারঘাট পয়েন্টে। যে স্থানটি ভেঙে যায় ঠিক তার লাগোয়া ঘরটি দুখিরাম ম-লের। তবে ঘূর্ণিঝড়ের খবর শুনে আগেই বাড়ি ছেড়ে গিয়ে ওঠেন দয়ারঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। রাতের মধ্যে ওই স্কুলেও পানি উঠে যায় ২ থেকে ৩ ফুট। ফলে পানিতেই ঠায় দাঁড়িয়ে রাত কাটাতে হয় সবাইকে। আম্পানে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে নদীর জোয়ারের তোড়ে পাশের আরও দিনটি পয়েন্টে ভেঙে যায় উপকূল রক্ষার বাঁধ। পানি ঢুকে পড়ে দয়ারঘাট, জেলেখালী ও দক্ষিণ আশাশুনি বিস্তীর্ণ জনপদে। মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে যায় অন্তত চারশ পরিবারের বসতবাড়ি। পানি উঠে যায় তাদের রান্নাঘর, গোয়ালঘরসহ কয়েকটি মুরগির খামারেও। রান্না-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সব হারানো অনেকের ঘরে তিনদিন কোনো খাবারও জোটেনি। পৌঁছেনি কোনো সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ সহায়তা।

আশাশুনি দক্ষিণ পাড়ার রমেশ ম-লের ছেলে পিযুষ কুমার ম-ল জানান, তার খামারে ৭০০ লেয়ার মুরগি ছিল। কদিন বাদেই ডিম দেওয়ার কথা। ভেবেছিলেন সেই ডিম বিক্রি করেই মহাজনের (যার কাছ থেকে বাকিতে সব নেন) ওষুধ, খাদ্য ও বাচ্চার দাম পরিশোধ করবেন। কিন্তু হঠাৎ সব শেষ হয়ে গেল তার। এখন মহাজনের টাকা কীভাবে শোধ করবেন, সেটা নিয়েই রাজ্যের দুশ্চিন্তা পিযুষের। একই এলাকার বিধানচন্দ্র ম-ল, বিকাশচন্দ্র ম-লেরও দুটি মুরগির খামার ভেসে গেছে জোয়ারের পানিতে। কিছু মুরগি বাঁচতে পারলেও পরদিন পানির দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। মহাজনের টাকা পরিশোধ নিয়ে তাদেরও চিন্তা।

জেলেখালীর চন্দনা সানা, দেবতি ম-ল, অনিতা ম-ল, সুজাতা দাস, পার্বতী দাস, শেফালী রানী ম-লসহ অনেকেই জানান, তাদের জীবন নিয়ে খেলা করেন বড় বাবুরা (সরকারি কর্মকর্তারা)। প্রতিবছর নদীভাঙনের আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের। শুকনো মৌসুমে মেম্বর, চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে ধরনা দেন এলাকার বাঁধগুলো মজবুত করে বাঁধার জন্য। কিন্তু তারা বাঁধে না। কেননা ভেঙে গেলে তাদেরই যে লাভ! যত বিপদ হয় এই অভাগাদের।

এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা দেবী রানী। হাঁটু সমান পানি ভেঙেই ছোট্ট একটি বাটিতে করে কিছু একটা নিয়ে এগোচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করতেই আঁচলে চোখের জল ঢেকে বললেন, ‘তোমার দাদুর জন্য পাশের এক বাড়ি থেকে দুটো ভাত চেয়ে আনলাম।’ নিজে কী খাবেনÑ জিজ্ঞেস করতেই অশ্রুসজল হাসিতেই বললেন, ‘ওপরওয়ালা জানেন।’ এখনো কোনো ত্রাণ বা সাহায্য তাদের বরাতে জোটেনি। খাওয়ার পানির কষ্টও অবর্ণনীয়। কিছুটা দূরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে স্থানীয় পুকুরের পানি পরিশোধনের পর এলাকার মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সেখানে পানি নিতেও সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে আছেন উপকূলের এসব মানুষ।

আশাশুনি সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স ম সেলিম রেজা মিলন বলেন, ‘শুকনো মৌসুমে ওই এলাকার বেড়িবাঁধের জন্য কাজ শুরু হলেও ঠিকাদারের গাফিলতিতে তা শেষ করা সম্ভব হয়নি। দ্রুত আবার কাজ শুরু হবে।’ বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি ও খাদ্য সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকালের মধ্যে তাদের মাঝে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে যাদের বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের মাঝেও টিন বিতরণ করা হবে।’

সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ ২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান খান বলেন, ‘উপকূলের ২০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ স্থায়ী সংস্কারের জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রজেক্ট পাঠানো আছে। তা এখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি বেড়িবাঁধে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু করেছে সেনাবাহিনী।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, ঘূণিঝড় আম্পানের কারণে জেলার উপকূলীয় বেড়িবাঁধের ২৩টি পয়েন্টে ভেঙে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। সেগুলো তাৎক্ষণিকভাবে সংস্কারের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজ করছেন। স্থায়ী সংস্কারের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া হবে। যাদের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করে টিন বিতরণ করা হবে এবং দুর্গত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ত্রাণ সহায়তারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।

 

advertisement
Evall
advertisement