advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

বেরিবানডা যেন মুই দেইখা মরতে পারি

মুজাহিদ প্রিন্স পটুয়াখালী
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০৮:৪৯
শাহানারা বেগম
advertisement

বেড়িবাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে প্রচণ্ড স্রোতে পানি নামছে রাবনাবাদ চ্যানেলে। ঠিক সেখানে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে আসছেন ষাটোর্ধ্ব এক নারী। নাম শাহানারা বেগম। স্রোতের সঙ্গে এক রকম লড়াই করে সড়কের ওপরে উঠলেন। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন সামনের দিকে। হাতে ছোট্ট একটি পলিথিনে সামান্য কিছু মুড়ি। জানালেন মেয়ের বাড়ি নদীর পারে। তাদের খোঁজ নেওয়ার জন্যই এসেছেন।

হাঁটতে হাঁটতে একটি উপড়ে পড়া খেজুরগাছের সামনে দাঁড়ালেন। তার খোঁজখবর জানতে চাইলে কাপড় থেকে পানি ঝাড়তে ঝাড়তে প্রথমেই বললেন, ‘মোগো ত্রাণ দেতে অবে না, বেরিবানডা যেন মুই দেইখা মরতে পারি। শেখ হাসিনার ধারে মোগো এই এটাই দাবি- এই কতাডাই ইটটু লেইহা দেন।’

শাহানারা বেগমের স্বামী আলাউদ্দীন হাওলাদার (৭৫) শয্যাশায়ী। এক সময় উত্তাল রাবনাবাদ চ্যানেলে ইলিশ শিকার করতেন। শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর নিয়ে ছিল একান্নবর্তী পরিবার। জমাজমি ছিল, চাষবাস করতেন সবাই মিলে। নিজের এক ছেলে দুই মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন পাঁচ ক্লাস পর্যন্ত। ভালোই ছিল তাদের সে সময়ের দিনগুলো। সবার বিয়েও দিয়েছেন। ছেলে বানাতি বাজারে ঘর ভাড়া করে থাকেন বউ আর সন্তানদের নিয়ে। মাঝে মাঝে এসে মা-বাবাকে দেখে যান। বুড়ো-বুড়ি এই ঝড়ের মধ্যে কেন আলাদা থাকেন? এমন প্রশ্নের জবাবে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন শাহানারা বেগম। চোখের নোনাজল টপ টপ করে মিশে যায় নদীর জলে। জানালেন- সবই তার কপাল। রাবনাবাদের করালগ্রাসে তাদের এলাকার বেশিরভাগ জমি বিলীন হয়ে যান। এর পর পায়রা বন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণ করায় তারা ভূমিহীন হয়ে পড়েন। এখনো ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। গত চারদিন ঘরে রান্না হয়নি। শুকনা খাবার, মুড়ি খেয়ে দিন পার করেছেন। আজ ঝড় কমার পর তাই মেয়ের বাড়িতে এসেছেন কিছু খাবারের জন্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, পায়রা বন্দর সংলগ্ন লালুয়া ইউনিয়নের চোরীপাড়া, বানাতি বাজার, নয়াকাটাসহ ১৭টি গ্রাম কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। দুদিন আগে যে মাঠে সোনালি ফসল ছিল, এখন সেই মাঠে থৈ থৈ নোনাজল। ২০ তারিখ রাতে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তা-বে ঘরবাড়ি দুমড়েমুচড়ে দিয়ে যায়। এর পর রাতের জোয়ারে তলিয়ে যায় পুরো এলাকা। শাহানারা বেগমের মতো শত শত পরিবার খালি পানি খেয়ে রোজা পালন করছেন। পুরো এলাকা পানিতে ডুবে থাকায় ত্রাণ কার্যক্রমও চলছে না সেখানে।

পটুয়াখালীতে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, জেলায় তাদের ১৩৫০ কিলোমিটার বেরিবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে ৪০০ কিলোমিটার বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে মির্জাগঞ্জের চরখালী, গলাচিপার চালিতাবুনিয়া, রাঙ্গাবালীর চারআন্ডা ও কলাপাড়ার লালুয়াসহ প্রায় ৫০টি পয়েন্টে বাঁধ ভেঙে গেছে। এর ফলে পানির নিচে তলিয়ে গৃহবন্দি রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।

কলাপাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তপন কুমার ঘোষ জানান, লালুয়া ইউনিয়নের পুরো এলাকাটি পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ অধিগ্রহণ করেছে। অধিগ্রহণ করা জমিতে অন্য কোনো বিভাগ কাজ করতে পারছে না। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্প গ্রহণ করেও তা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি আরও জানান, শুধু একটি বাঁধ না থাকায় চোরীপাড়া, বানাতি বাজারসহ পুরো এলাকায় মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এখন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া এখানে কোনো কিছু করা সম্ভব না।

স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মহিব্বুর রহমান ২১ মে বৃহস্পতিবার দুর্গত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, ১৭টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। তার পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারের মাঝে ত্রাণ সহয়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পায়রা বন্দর যেহেতু এলাকাটি অধিগ্রহণ করেছে তাই বাঁধ নির্মাণের বিষয়ে তাদেরই দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি আরও জানান, মানবিক বির্পযয়ের এই বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন এবং যাতে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ হয়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন।

advertisement
Evall
advertisement