advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

এক যুগের সর্বোচ্চ রেণু আহরণ

হাবিবুর রহমান রাউজান ও আজিজুল ইসলাম হাটহাজারী
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২০২০ ২৩:৪০
advertisement

অমাবস্যা তিথির জোর প্রথম দিন গতকাল শুক্রবার। আকাশে ছিল না মেঘের গর্জন। গত কয়েক দিনে দু-এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। তবে ভারী বর্ষণ হয়নি। এর পরও পুরানো ঐতিহ্যকে পেছনে ফেলে সামান্য বৃষ্টিপাতেই চট্টগ্রামের হালদায় ডিম ছাড়ল মা-মাছ। পাহাড়ি ঢলের তীব্রতা বৃদ্ধিতে নদীতে তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় মাছ ডিম ছাড়ে বিশ্বের একমাত্র

জোয়ার-ভাটার মিঠা পানির প্রাকৃতিক এই মৎস্য প্রজননক্ষেত্রে। এবার ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম আহরণ করা হয়েছে, যা গত ১ যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ বলে নিশ্চিত করেছে মৎস্য বিভাগ।

জানা যায়, মে মাসের শুরু থেকেই হালদায় মা-মাছের আগাগোনা বাড়তে থাকে। ডিম সংগ্রহকরীরা ৭ মে থেকে ভারী বর্ষণের অপেক্ষায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মা-মাছ ডিম ছাড়েনি। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে গতকাল শুক্রবার সকাল ৭টায় মা-মাছ ডিম ছাড়তে শুরু করে। ডিম ছাড়ার জন্য নদীর তলদেশ থেকে ভেসে ওঠে ওরা।

প্রতিবছর এপ্রিল-মে মাসে অমাবস্যা, পূর্ণিমার জোতে ডিম ছাড়ে মা-মাছ। ১৯ মে থেকে ভারী বর্ষণে আশায় বুক বাঁধেন হালদাপারের ডিম সংগ্রহকারীরা। ২১ মে নমুনা ডিম ছাড়ে মা-মাছ। শুক্রবার (২২ মে) সকাল ৭টায় মা-মাছ ডিম ছাড়া শুরু করে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, হালদার কাগতিয়ার আজিমের ঘাট, খলিফার ঘোনা, পশ্চিম গহিরা অংকুরী ঘোনা, বিনাজুরী, সোনাইর মুখ, আবুরখীল, খলিফার ঘোনা, সত্তারঘাট, দক্ষিণ গহিরা, মোবারকখীল, মগদাই, মদুনাঘাট, উরকিচর এবং হাটহাজারী গড়দুয়ারা, নাপিতের ঘাট, সিপাহির ঘাট, আমতুয়া, মার্দাশা ইত্যাদি এলাকায় ২৮০টি নৌকায় ৬১৬ জন ডিম সংগ্রহকরী জাল ও নৌকা নিয়ে নদীতে নামে। পুরো হালদাজুড়ে উৎসবের আমেজ আর ডিম সংগ্রহকারীদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক লক্ষ করা গেছে। তবে যে পরিমাণ ডিম পাওয়া গেছে তার জন্য পর্যাপ্ত হ্যাচারি নেই। তাই মাটির কুয়ায় ডিম থেকে রেণু তৈরি, এর পর পোনা উৎপাদন করতে হবে ডিম আহরণকারীদের। যে হারে ডিম মাটির কুয়ায় রাখা হয়, সে হারে রেণু হয় না। অনেক ডিমই তাপমাত্রা, আবহাওয়া, লবণাক্ততাসহ বৈরী পরিবেশে নষ্ট হয়ে যায়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু ফোটানোর জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হাটহাজারী উপজেলার শাহমাদারি, গড়দুয়ারা ও রাউজান অংশের মুবারকখীল ও পশ্চিম গহিরায় মোট ৪টি সরকারি হ্যাচারি ও ১৬৭টি কুয়া প্রস্তুত করা হয়েছে।

উদয়ন বড়–য়া, মো. জামসেদসহ একাধিক ডিম সংগ্রহকারী জানান, সকাল থেকে এ পর্যন্ত ডিম সংগ্রহ সন্তোষজনক। কোনো কোনো নৌকা ১২ বালতি আবার কোনো কোনো নৌকা ৪-৫ বালতি ডিম সংগ্রহ করেছে। অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় ভালো। তবে করোনা পরিস্থিতিতে রেণু ক্রেতারা আসবেন কিনা তা নিয়ে রয়েছে শঙ্কা।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের ১৫ মে ডিম ছাড়ে হালদায় মা-মাছ। আহরণ করা প্রায় ১০ হাজার কেজি ডিম থেকে ২০০ কেজির বেশি রেণু উৎপাদিত হয়েছিল। তবে এবার ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ডিম আহরণের আশা করছেন স্থানীয় ডিম সংগ্রহকারী, প্রশাসন ও হালদা গবেষণা সেন্টার।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী আমাদের সময়কে বলেন, প্রাকৃতি ও পরিবেশ পুরোপুরি উপযুক্ত না হলেও মা-মাছ ডিম ছেড়েছে। পরিবেশদূষণ কমে যাওয়ায় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ডিম আহরণ করা সম্ভব হয়েছে। যে পরিমাণ ডিম পাওয়া গেছে, সে অনুযায়ী হ্যাচারি নেই। মাটির কুয়ায় রেণু ফোটানো হবে।

করোনা পরিস্থিতিতে রেণু ক্রেতার আসা নিয়ে ডিম সংগ্রহকারীদের শঙ্কা নিয়ে কথা বললে তিনি বলেন, রেণু ক্রেতার ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে না। তার পরও সমস্যা হলে আমরা তো আছিই।

রাউজান উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা পীযুষ প্রভাকর আমাদের সময়কে বলেন, এবার ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন আহরণকারীরা, যা গত এক যুগের সর্বোচ্চ।

রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোনায়েদ কবির সোহাগ বলেন, হালদা নদী রাউজান অংশে শতভাগ দূষণমুক্ত। সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর পরামর্শক্রমে হালদার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বছরব্যাপী অভিযান পরিচালনা করেছি। এর ফল হিসেবে এবার গত বছরের তুলনায় বেশি পরিমাণ ডিম ছেড়েছে মা-মাছ।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হালদা গবেষক ড. মো. মঞ্জুরুল কিবরিয়া মুঠোফোনে জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা ছিল হালদা ইতিহাসে বিরল।

হাটহাজারী উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা রনি জানান, মৎস্যজীবীরা হ্যাচারিগুলোয় ডিম সংগ্রহের পর রেণু পরিস্ফুটনের জন্য নিয়ে আসতে শুরু করেছেন। সময় যত বাড়বে, ডিমের পরিমাণ তত বাড়বে।

সরেজমিন ডিম ছাড়ার স্থানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত মধ্যরাত থেকে হালদা নদীর আজিমের ঘাটা থেকে গড়দুয়ারা পর্যন্ত ডিমসংগ্রহকারী মৎস্যজীবীরা নমুনা ডিম সংগ্রহ করেন। এর পর শুক্রবার সকাল থেকে নানা সরঞ্জাম নিয়ে হালদার হাটহাজারী ও রাউজান অংশের রামদাশ মুন্সীর হাট, আমতুয়া ও নাপিতের ঘাট এবং দুপুরের পর থেকে আজিমের ঘাট থেকে গড়দুয়ারা নয়াহাট পর্যন্ত ৬ কিলোমিটার এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে ডিম সংগ্রহকারীরা সবচেয়ে বেশি মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেছে।

এদিকে মা-মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহের পর রেণু পরিস্ফুটনের জন্য উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে হাটহাজারী উপজেলার শাহমাদারি, মাছুনাঘোণা, মদুনাঘাট ৩টি সরকারি হ্যাচারি ও ১৬৭টি কুয়া প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়রা সনাতন পদ্ধতিতে সংগৃহীত ডিম থেকে রেণু পরিস্ফুটনের আরও শতাধিক কুয়া তৈরি করেছে।

advertisement
Evall
advertisement