advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

একাত্তরের পর এমন ঈদ আসেনি

গওহার নঈম ওয়ারা
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০৮:০২
advertisement

একাত্তরে ঈদ এসেছিল ১৯ নভেম্বর প্রায় ৫০ বছর পর ২০২০-এর মে মাসের ঈদের সঙ্গে যেন সেই ঈদের কোনো তফাৎ নেই। ১৯৭০ সালের ঈদটাও অনেক কষ্টের ঈদ ছিল। সেবার ঈদ হয়েছিল নভেম্বরের ৩০ তারিখে। ভোলার সাইক্লোনের প্রেক্ষাপটে। রোজার মধ্যে ৩ নভেম্বরের সেহরির ওয়াক্তে দক্ষিণের জনপদ ল-ভ- হয়ে যায়, হারিয়ে যায় পাঁচ লাখ প্রাণ। তার পরও সেবার ঈদ হয়েছিল। সামনে নির্বাচন ছিল। তবে ঈদের মোনাজতে ভোলা নিয়ে কান্নাকাটিই ছিল বেশি।

অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ তার ‘যখন পলাতক : মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি’তে লিখেছেন : ‘সেবার ঈদ হয়েছিল ২০ নভেম্বর। ঈদ উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে অথবা অন্য যাদের জানতাম, তাদের বাড়িতে কোনো সমারোহ অথবা সাধারণ উৎসবও হয়নি। তবে তারই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন। তাতে তিনি বলেছিলেন, স্বদেশে গিয়ে আপনজনদের সঙ্গে আনন্দ করার দিন আর বেশি দূরে নয়।’

শহীদ জননী জাহানারা ইমাম সেই ঈদের কথা লিখেছেন এভাবেÑ ‘আজ ঈদ। ঈদের কোনো আয়োজন নেই আমাদের বাসায়। কারও জামাকাপড় কেনা হয়নি। দরজা-জানালার পর্দা কাচা হয়নি, ঘরের ঝুল ঝাড়া হয়নি। বসার ঘরের টেবিলে রাখা হয়নি আতরদান। শরীফ, জামি ঈদের নামাজও পড়তে যায়নি।

কাজী আনোয়ারুল ইসলাম তার একাত্তরের স্মৃতিতে বলেছেন, ‘আমি, মিন্টু, হাসান কেউই ঈদের নামাজ পড়তে গেলাম না। বুদ্ধি হওয়ার পর এই প্রথম ঈদের জামাতে নামাজ পড়লাম না। আনন্দহীন ঈদ। বাঙালিরা কেউ কারও বাড়ি গেল না। ইয়াহিয়া সরকার বাঙালিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, তারা আজ ঈদের মাঠেও যেতে সাহস পাচ্ছে না। ইসলামি রাষ্ট্রে আমরা ঈদের নামাজ পড়তে পারলাম না।’

একাত্তরে ঢাকয় ছিলেন সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দীন। তিনি তার ‘আত্মস্মৃতি’ বইয়ে শ্রীহীন মন খারাপ করা ঈদের কথা লিখেছেন। জুমা ও ঈদের নামাজ পড়া এখন এ দেশে জায়েজও নয়। কী অদ্ভুত মিল করোনাকালেও জামাতে নামাজ এড়ানোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

ষাট বছর পার করা রিকশা শ্রমিক ঢাকা শহরে খুবই কম চোখে পড়ে। পশ্চিম আদাবরের রংপুর বস্তির দাঁতভাঙা হামিদ তাদের একজন। আল্লায় দিলে আবদুল হামিদের সব কটা দাঁত অটুট ঝকঝকে সাদা। তবুও তার নাম দাঁতভাঙা হামিদ। তার বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙায়। সেই সূত্রেই তার নাম দাঁতভাঙা হামিদ। অন্য দশটা হামিদের থেকে পার্থক্য করার জন্য দুই দশক আগে মেসিয়াররা তার এ রকম নামকরণ করেছিল। এখন অবশ্য বেশিরভাগ মেসিয়ার তাকে মুরব্বি বলেই ডাকে। মুরব্বি এবার ঈদে বাড়ি যেতে পারছেন না। হাতে টাকা নেই, যাওয়ার পথ নেই।

শেরপুরের শ্রীবরদি থেকে আসা সবজির ফিরতি ট্রাকে সে ইচ্ছা করলেই ফিরতে পারে। সেখান থেকে রাজিবপুর হয়ে বাড়ি সে যেতেই পারে। কিন্তু খালি হাতে কেমনে যায়। একাত্তরের পর এমন একা একা সেমাই ছাড়া ঈদ সে জীবনেও করেনি। আবার যে কখনো এমন ঈদ তার জীবনে আসতে পারে সেটাও মুরব্বি ভাবেনি কখনো। সন্ন্যাসীর চরে দূরসম্পর্কের এক মামার বাড়িতে মা-বাপ ছাড়া একাত্তরের ঈদের স্মৃতি মনে করে গামছায় চোখ মুছলেন মুরব্বি।

মরব্বির মনে পড়ে- সেই ঈদে প্রবাসী প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ একাত্তরে ঈদ উপলক্ষে বলেছিলেন : ‘আমাদের দেশে এবার ঈদ এসেছে অত্যন্ত মর্মান্তিক পরিবেশে।... লাখ লাখ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে বিচ্যুত... এবার ঈদে আনন্দ মুছে গেছে আমাদের জীবন থেকে, আছে শুধু স্বজন-হারানোর শোক, (সূত্র জয়বাঙলা ১ম বর্ষ ২৮ সংখ্যায় ১৯৭১)। যে বাণী দিয়েছিলেন সেটার দু-একটা শব্দ আর তারিখ বাদ দিলে এবারের ঈদেও ব্যবহার করা যায়।

মুরব্বি বলতে থাকেন, ‘এবার আমার ছেলেমেয়েকেও বাপ ছাড়া ঈদ করা লাগবে। তার মাথায় আসে না স্বাধীন দেশে চলাফেরায় এত বাধা কেন? একেকদিন একেক লোকের জন্য একেক নিয়ম কেন? সুবিধা বাদের নিয়ম। সেটাই তো অনিয়ম। মানুষ ঈদ উপলক্ষে বাড়ি যেতে চাইবেই। প্রশাসন কেন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিয়ে যাতায়াত পারাপারের ব্যবস্থা করল না? কতদিন, কত মাস এভাবে ভীতিকর পরিবেশে বাঁচতে পারব আমরা? মানুষকে তো ঘর থেকে বেরোতে হবেই। বাড়ি ফিরতে হবে।

ঢাকার কাছেই সোনারগাঁ উপজেলার সাদিপুর ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী সুমনা বেগম এবার বড় আশা করেছিল সে ঈদের আগে জীবনের প্রথম প্রতিবন্ধী ভাতা পাবে। নতুন সমাজসেবা অফিসার মানুষটা অনেক ভালো। প্রতিবন্ধী হিসেবে তার নিবন্ধন হবে হবে করেও হয়নি গত পাঁচ বছরে। এবার তার নাম নিবন্ধ হয়েছে। চিঠিতে নামও উঠেছিল। কিন্তু লকডাউন। ব্যাংকের রাস্তা বন্ধ তার আর অ্যাকাউন্ট খোলা হয় না। অ্যাকাউন্ট না খুললে ভাতার টাকার কাগজপত্র না আটকে থাকে। অন্যদিকে প্রতিবন্ধীর তালিকায় নাম ওঠায় নিবন্ধন হয়ে যাওয়ায় ইউনিয়ন পরিষদের বিপন্ন মানুষের তালিকা থেকে তার নাম খারিজ হয়ে গেছে। একই ব্যক্তি একাধিক তালিকায় থেকে যাতে অতিরিক্ত সুবিধা নিতে না পারে তার জন্যই এই ব্যবস্থা। কিন্তু করোনার চক্রে পড়ে সুমনা না পেল করোনা ত্রাণ না পাচ্ছে প্রতিবন্ধী ভাতা। তার ঈদ শিকেয় উঠেছে।

টাকা পেলেও কি কিছু কিনতে পারত সুমনা বেগম। লকডাউন শিথিল করে মার্কেট খুলে মানুষ ডাকে আবার মার্কেটে গেলে দাবড়ানি দেয়। বছরে একবার সন্তানদের জন্য পোশাক কেনে এ দেশের একটা বড় অংশ মানুষ। এই করোনাকালের ঈদে মার্কেটিং করতে গিয়ে পুলিশের দাবড়ানি খাওয়া যেসব মানুষের ভিডিও বা ছবি ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই সেই শ্রেণিভুক্ত। আবার যারা এই মানুষদের জানোয়ার শ্রেণিভুক্ত করছেন তাদের অধিকাংশই অনলাইনে ঈদের মার্কেটিং করে ফেলেছে। এই দাবড়ানি খাওয়া মানুষদের কাছে অনলাইনে মার্কেটিং করার সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে তারা কি মার্কেটে এসে এমন দৌড় দিত? ড্রইংরুমে টিভি ফিল্মে করোনাকাল উদযাপনে মগ্ন ব্যক্তিরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়; ‘এদের কি মৃত্যুভয় নেই?’ তাদের বুঝতে অসুবিধা হয়Ñ যাদের প্রতিনিয়ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়, তাদের আর কিসের মৃত্যুভয়।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র একাত্তরের ঈদে প্রচার করেছিল অবরুদ্ধ দেশবাসীর মনের কথা নিয়ে বাঁধা এক গান। ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও ফিরে যাও,/দেখো, মানুষের খুনে খুনে রক্তিম বাংলা,/ রূপসী আঁচল কোথায় রাখবো বলো?’ গীতিকার শহীদুল ইসলামের লেখা এই গান প্রাণ পায় প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী সুরকার অজিত রায়ের সুরে। ৭১-এ স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে কামাল লোহানী এই গান সৃষ্টি আর প্রচারের কথা নিয়ে বহুবার পত্র-পত্রিকায় তার স্মৃতিচারণ করেছেন।

১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পশ্চিমাকাশে ঈদের চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতারে বেজে ওঠে ‘ও চাঁদ তুমি ফিরে যাও’ শীর্ষক গান ও কথিকা। এই গানে কেঁদে বুক ভাসিয়েছিল একাত্তরের মুক্তিকামী বীর জনতা। করোনা আর ক্ষুধার যুদ্ধে নিবেদিত মানুষ ২০২০ সালে আবার যেন গাইছে ‘চাঁদ তুমি ফিরে যাও ফিরে যাও,/করোনা যুদ্ধে ব্যস্ত জাতি কোথায় রাখবে তোমায় বলো?

 

গওহার নঈম ওয়ারা : লেখক গবেষক

advertisement