advertisement
advertisement

এবারের ঈদের চাঁদও অত্যন্ত ম্রিয়মাণ

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ
২৩ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২২ মে ২০২০ ২৩:৪২
advertisement

অতীতের স্মৃতি সব সময় অত্যন্ত মধুর। হাজারো অনিশ্চয়তায় ভরা বর্তমানের জন্য অনেক সময় মনটা ফিরে যেতে চায় অতীতে। অতীতের সবকিছু যেন আনন্দময়, সুখকর, কাক্সিক্ষত হয়ে ভেসে ওঠে স্মৃতিতে। সবটাই যেন নির্মল। সবটাই আকর্ষণীয়। ছেলেবেলার সব কথা স্মৃতিতে আসে না। তখনো দুঃখবোধ ছিল। ছিল চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে অপূর্ণতা। গালমন্দ যে ছিল না তা নয়। কিন্তু দীর্ঘদিন পর অতীতের অন্ধকারও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে এক ঝিলিক উজ্জ্বল আলো হয়ে। সাত-আট বছর বয়স থেকে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো এখনো আমার স্মৃতিতে প্রায় স্পষ্ট। কোনো কোনোটা কিছুটা ঝাপসা হলেও বেশির ভাগই মনে পড়ে, বিশেষ করে ঈদের দিনের ঘটনাবলি। মা-বাবা এবং বেশ কয়েকজন ভাইবোনের সমন্বয়ে ছিল আমাদের বড় পরিবার। দাদি বেঁচে ছিলেন সবার মুরব্বি হয়ে। কথা কম বলতেন; কিন্তু যা বলতেন তা যেন হুকুম, অবশ্য পালনীয়। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হলে তার কাছেই জবাবদিহি করতে হতো। স্কুল থেকে ফিরে কে কী খেল তা-ও তার দৃষ্টিতে থাকত।

তখন জীবন ছিল খুব সহজ-সরল। মানুষের চাহিদা ছিল অত্যন্ত সীমিত। গ্রাম্যজীবনের চাহিদা ছিল সীমিত। গ্রামে জন্মগ্রহণ করি। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়াও গ্রামীণ পরিবেশে সমাপ্ত হয়। উচ্চ মাধ্যমিকের পরবর্তী পর্যায়ে রাজশাহী কলেজের ছাত্র হই। রাজশাহী কলেজের পরে সোজাসুজি ঢাকায়। রাজশাহী শহরেও তখন ছিল গ্রামীণ ছাপ। বিদ্যুৎ ছিল বটে। কিন্তু বিদ্যুৎচালিত কলকব্জা ছিল না বললেও চলে।

গ্রামের বাড়িতে সন্ধ্যায় দু-তিনটি বারান্দায় হারিকেন জ্বলে উঠত। পড়াশোনা, বাড়ির কাজ (যড়সব ড়িৎশ) হারিকেনের আলোয় করতে হতো। কোনো কোনোদিন হারিকেন জ্বালাতে হতো আমাকে, কোনোদিন আমার বড় বোন জ্বালাত। ঈদের রাতে শুধু বারান্দায় নয়, ঘরে ঘরে আলো জ্বলে উঠত। এ ঘটনা ঘটত ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই। ওই কদিন পড়াশোনা না করলেও কেউ খবরদারি করতেন না। ঈদের দিনের জন্য মোটামুটি এক ধরনের রুটিন অনুসরণ করা হতো।

ছেলেদের জন্য নতুন পাজামা, পাঞ্জাবি অথবা শার্ট, এক জোড়া জুতা বাবা কিনে আনতেন মালদহ শহর থেকে। মেয়েদের জন্য শাড়ি ও স্যান্ডেল, কারও কারও দাবি অনুযায়ী একগাছা রঙিন চুড়ি, বিভিন্ন রঙের ফিতা এবং তখনকার দিনে পাওয়া যেত এমন কিছু আবদার করা জিনিসপত্র।

আমার মনে আছে, যেহেতু ঈদগাহ ছিল আমাদের বাড়ি থেকে মাইল দেড়-দুই দূরে, তাই গরুর গাড়িতে আমাদের যেতে হতো। আমি তো যেতামই, আমার ছোট ভাইও যেত। আগেভাগে গিয়ে জামাতে শামিল হতাম। নামাজের পর মা-বাবা ও দাদিকে কদমবুচি করে সালাম করতাম। ঈদের দিনে যে বন্ধুবান্ধব আশপাশের তারা ছুটে আসত। মা অতি আদরে তাদের খাবার ব্যবস্থা করতেন।

ঈদের জন্য আব্বা যা কিনে এনেছেন, তা যে যার মতো লুকিয়ে রাখত এজন্য যে অন্যরা দেখে ওগুলোকে যেন পুরনো না করে দেয়। জুতা পায়ে ঠিকমতো লাগছে কিনা তা পরখ করার জন্য বিছানায় এক-দুবার হেঁটে দেখতাম।

আমার ছেলেবেলার ঈদের স্মৃতি অত্যন্ত আনন্দঘন। ঈদের দিনকয়েক আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত ঈদের আনন্দ। সবাই মিলে যে হইচই করতাম, তা স্মরণ করলে আজও অতীতে ফিরে যাই। সব পরিচিত মুখ মনে করে মুগ্ধ হই। সবাইকে ঈদ মোবারক বলা, সমবয়সীদের সঙ্গে কোলাকুলি করা, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ সবকিছু মিলিয়ে ঈদ হয়ে উঠত মহা-আনন্দের উৎসব।

এবারের ঈদ আসছে, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন অথবা বাংলা নববর্ষ বৈশাখীর পর। কিন্তু বড়দিন অথবা নববর্ষের মেজাজ থেকে ঈদের আনন্দ সব সময় স্বতন্ত্র। এবাবের করোনা ভাইরাসের অভিশাপ শুধু আমাদের প্রিয় দেশটিকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে বিপন্ন, অসহায় ও বিপর্যস্ত করে তুলেছে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে অসংখ্য আদম সন্তান। পরিস্থিতির তেমন উন্নতি এখনো দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বাংলাদেশে মাহে রামাদান তার অপূর্ব স্বর্গীয় উপহারসহ প্রায় উপাগত। পবিত্র রামাদান সমাপ্তি ঘোষণার জন্য ঈদের চাঁদও উঠবে। কিন্তু এবারের ঈদের চাঁদও অত্যন্ত ম্রিয়মাণ, বিষণœ, নিষ্প্রাণ। চাঁদের আলোয় নেই প্রত্যাশিত ঔজ্জ্বল্য। ঈদের কাক্সিক্ষত জামায়াতে যাওয়াও এক ধরনের অনিশ্চয়তায় ঘেরা। কী হবে আল্লাহতায়ালা জানেন। তার পরও আমাদের ঐকান্তিক কামনাÑ সবার ঘরে আসুক ঈদের আনন্দ। সবার মুখে ফুটুক হাসি, অন্তত ওইদিনে। সবার ঘরে ঈদ আসুক, আসুক বিনম্র পদভারে, অনাবিল খুশির ডালা সাজিয়ে। এটি আমার প্রত্যাশা।

ড. এমাজউদ্দীন আহমদ : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement