advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

মানুষ বেঁচে গেলে বেঁচে যাবে আমাদের স্বপ্ন

ডা. পলাশ বসু
২৩ মে ২০২০ ০১:৩০ | আপডেট: ২৩ মে ২০২০ ০১:৩০
ডা. পলাশ বসু
advertisement

৮ মার্চ আমাদের এখানে অফিসিয়ালি করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর প্রায় আড়াই মাস হতে চললো। শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটি দেওয়াটা ছিল খুবই ভালো উদ্যোগ। তারপর ২৬ মার্চ থেকে ছুটি শুরু হলো। এর ফলে করোনার ভয়াল বিস্তার অনেটাই থেমে ছিল। যেভাবে এর আগ্রাসী বিস্তার হওয়ার কথা ছিলো সেটা হয়নি।

কিন্তু এর মাঝেও আমাদের পরিকল্পনাহীন কিছু বিষয়ের কারণে আমরা আরও কঠোরভাবে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি বলে মনে হয়। গার্মেন্টস সেক্টরে কর্মীদের নিয়ে যা হলো, সেটা এর বড় একটা কারণ। কর্মীদের বারবার ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা, আসা-যাওয়ার ফলে এটা ঢাকার বাইরেও ছড়ানোর সুযোগ পেয়ে গেল।

এদিকে দোকানপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দেখা গেলো করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এখন তো প্রতিদিন মোট টেস্টের ১৬% এর মতো আক্রান্ত হচ্ছে। এর সাথে যদি আরটিপিসিআর-এ ফলস নেগেটিভ হওয়া ৩০% এবং উপসর্গহীন রোগী যদি আমরা একত্রে যুক্ত করি তাহলে আক্রান্তের সংখ্যার উদ্বেগজনক চিত্র ভেসে উঠবে।

চট্রগ্রামে এরই মাঝে হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সবগুলো সিট পূর্ণ হয়ে গেছে। আইসিইউ এ কোনো সিট ফাঁকা নেই। ঢাকাতেও এখন রোগী বাড়ছে। আইসিইউগুলো পূর্ণ হয়ে গেছে। এর মাঝে সন্দেহভাজন করোনা রোগী আর নন কোভিড রোগীদের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যে ভোগান্তি হচ্ছিলো তারও কোনো সমাধান হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের আরও বেশি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেয়ার ব্যাপারে ভাবতে হবে।

সম্প্রতি করোনা নিয়ন্ত্রনে তামাক, সিগারেট বিপণনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শিল্প মন্ত্রণালয় মানেনি। এটা হলে হবে না। করোনার বিস্তার আমরা যদি রুখতে না পারি, একসাথে অনেক মানুষ যদি আক্রান্ত হতে শুরু করে তাহলে কিন্তু আমাদের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা সে চাপ সামাল দিতে পারবে না।

করোনা এসে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল- মানুষের মৌলিক চাহিদার একটা অনুসঙ্গ; আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা নাজুক! প্রশ্ন হচ্ছে এর দায়ভার কাদের? নিশ্চয় সে দায় আমাদের নীতি নির্ধারকদের। তারা কি সে দায় নিয়েছেন বা নেবেন? স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে টেকসই করে গড়ে তোলার পরিবর্তে তারা মেতে ছিলেন শুধু স্থাপনা নির্মাণ, অপ্রয়োজনীয় ও নিম্নমানের কেনাকাটা এসব নিয়ে।

যাই হোক, এখন আর সেসব বলে হয়ত লাভ নেই। তবে, অনুরোধ থাকবে এখান থেকে শিক্ষাটা যেন আমরা নিই। সেটা নিতে তো সমস্যা নেই। নাকি করোনা চলে গেলে আমরাও আবার আগের মতোই চলতে থাকব? সামনে যে সময় আসছে- কে বাঁচবে আর কে মরবে তা কেউ জানে না। ভালো কাজ করার চিন্তাটা তাই হৃদয়ে ধারণ করা উচিৎ; কারণ জীবন খুবই ঠুনকো। অসৎ উপায়ে অর্জিত এত এত অর্থবিত্ত জীবনে কোনো কাজেই লাগবে না।

আমাদের ১৭ কোটি মানুষের দেশে আইসিইউ বেড আছে ১১০০ থেকে ১২০০ এর মতো। এর মধ্যে কতগুলো করোনা রোগীদের জন্য বরাদ্দ হবে? আর কতগুলো অন্য রোগের রোগীদের জন্য বরাদ্দ হবে? তার মানে ১ লাখ মানুষের জন্য আইসিইউ বেড আছে ১ টারও কম। এটা নিয়ে মনে হয় না আর কিছু করা যাবে; যদিও শুরুতে শুনেছিলাম এ সংখ্যা বাড়ানো হবে।

এদিকে অনেক হাসপাতালে আবার অক্সিজেনেরও নাকি স্বল্পতা আছে! অথচ অনেক রোগী আছেন যারা পর্যাপ্ত অক্সিজেন পেলেই আবার দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমাদের তাই এদিকেই নজর দেওয়া উচিত এখন। অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর ১০-১২% ভালো হয়ে যাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, রোগীর সংখ্যা বাড়লে অক্সিজেনের যে ডিমান্ড হবে সে সাপ্লাই দিতে আমরা প্রস্ততি নিয়েছি তো পর্যাপ্ত?

বিদ্যমান বাস্তবতায় সব থেকে ভালো হচ্ছে, করোনার যে ঢেউ সেটা বন্ধ করা। আচমকা এটাকে বাড়তে না দিয়ে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। তাহলে সবকিছু মিলে যেটা দাঁড়াবে- হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীরা অন্তত তখন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাবে। প্রয়োজন আর সাপ্লাইয়ের টানাপোড়েনটা আর তাহলে জোরদার হবে না। মানুষ বেঁচে যাবে। আর মানুষ বেঁচে গেলে বেঁচে যাবে আমাদের স্বপ্ন।

 

ডা. পলাশ বসু : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ

advertisement
Evaly
advertisement