advertisement
advertisement

করোনাকালেও পারিবারের সঙ্গে ঈদ জোটেনি তাদের ভাগ্যে!

জনি রায়হান
২৫ মে ২০২০ ১৯:৩১ | আপডেট: ২৫ মে ২০২০ ২১:৩০
করোনার সময়ের ঈদেও এইসব বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজ নেয়নি পরিবারের সদস্যরা। ছবি : আমাদের সময়
advertisement

আশরাফুল জামান। বয়স ৬০ বছর। দুই সন্তান উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করছেন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে। স্ত্রী ঢাকার সাভারের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছে। গত দেড় মাস আগে ২ বছর ধরে অসুস্থ, স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত বাবাকে রাস্তা ফেলে গেছেন সেই সন্তানরা।

এরপর ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করাসহ সদর থানার পুলিশ প্রশাসনের আশ্রয়ে ছিলেন দেড় মাস। অবশেষে গত ৬ মে থেকে তার তার ঠাঁই হয়েছে ঢাকার একটি বৃদ্ধাশ্রমে।

৭৫ বছর বয়সী সেলিম চৌধুরী। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি পেশায় ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। স্ত্রী ও দুই মেয়ে সন্তানের জনক এই বৃদ্ধ হার্নিয়া রোগে ভুগছিলেন দীর্ঘ দিন যাবত। ২০১৩ সালে অবসরে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। হাঁটাচলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসার জন্য মাসে প্রয়োজন অনেক টাকা। তার ওপর আবার অসুস্থজনিত সেবা।

দুই মেয়ে থাকলেও কেউ খোঁজ নেয় না তার। সেবা যত্ন নেওয়ার কেউ ছিল না তার পাশে। অবশেষে অসুস্থ এই বৃদ্ধের ঠাঁই হয় মিরপুরের মিলটন সমাদ্দারের চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারে।

শুধু সেলিম চৌধুরী আর আশরাফুল নন, একই অবস্থা আড়াই বছর বয়সী ময়নার। এক বছর আগে তাকে বস্তাবন্দী করে কেউ ফেনী সদরের একটি ডাস্টবিনে ফেলে গিয়েছিল। পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লার মধ্যে তাকে খুঁজে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে শিশুটির জায়গা হয় মিলটন সমাদ্দারের প্রতিষ্ঠানে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের রেজিস্ট্রেশনকৃত প্রতিষ্ঠান চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার। শুধুমাত্র অসহায় ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা এবং তাদের সেবা করতে গড়ে তুলেছেন মিল্টন সমাদ্দার। তাকে সহযোগিতা করছেন স্ত্রী মিঠু হালদার। তারা দুজনই নার্সিং ডিপ্লোমায় পড়ালেখা করেছেন।

মিলটনের এই প্রতিষ্ঠানে অক্ষম বৃদ্ধরা বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসার সুযোগ পান। যেসব বাবা-মাকে তাদের সন্তানেরা অবহেলা করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে, যাদের শেষ ঠিকানা হয়তো রাস্তায়ই হতো। খেয়ে না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় রাস্তায় হয়তো তাদেরকে পড়ে থাকতে হতো।

মিল্টনের এই সংসারে এখন রয়েছে এমন ৬৯ জন বৃদ্ধ বাবা-মা। তাদেরকেই নিয়েই মিল্টন-মিঠু দম্পতির সংসার। যেখানে এক সন্তানের হাড়ির ভাত ৬৯ জন বাবা-মা ও তাদের সন্তানেরা মিলেমিশে খান। এবারের ঈদের দিনটিও সেই সন্তানের সঙ্গেই কাটিয়েছেন বৃদ্ধ অসহায় এসব বাবা-মায়েরা।

২০১৪ সাল থেকে শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত দুই শতাধিক বাবা, মা ও প্রতিবন্ধী শিশুকে সেবা দিয়েছে। চাইল্ড ও ওল্ড কেয়ারে ৬ জন প্রতিবন্ধী শিশুও রয়েছে।

মিল্টন সমাদ্দার আজ বিকেলে দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘আমি অনেক খুশি একসঙ্গে ৬৯ জন বাবা-মা এবং ৬টি সন্তানকে নিয়ে ঈদ পালন করতে পারলাম। চেষ্টা করেছি দিনটি যাতে তারা আনন্দেই কাটাতে পারেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সকালে সেমাই, রুটি নাস্তা এবং দুপুরে খাশির মাংসের সঙ্গে পোলাও এবং মিষ্টান্ন ছিল আজ খাবারের তালিকায়।’

মিলটন সমাদ্দার বলেন, ‘কারও জীবনের শেষ বয়সে এসে এমন করুণ-অসহায় পরিস্থিতি আসুক এটা আমি কখনো চাই না। আমি চাই সন্তানেরা যেন বৃদ্ধ বাবা-মাকে অবহেলা না করে। শেষ বয়সে তারা যেন বাবা-মাকে পরম মমতা দিয়ে আগলে রাখে। কারণ সবার জীবনেই এই সময়টা আসবে। তাই আমরা এমন কিছু করবো না যাতে আমাদের সন্তানেরা আমাদেরকে রাস্তায় রেখে চলে যায়।’

advertisement