advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

খাতাকলমে ব্যয় কোটি কোটি টাকা, বাস্তবে শুধুই দুর্ভোগ
বছর বছর বাঁধ ব্যবসা

আমাদের সময় ডেস্ক
২৯ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২৯ মে ২০২০ ০০:১১
advertisement

দিন রাত পানিতে ভাসতে আর পারি না, ত্রাণ লাগবে না, বেড়িবাঁধ ঠিক করি দেন, বছর বছর এই বাঁধ ঠিক করার নামে নাটক ভালো লাগে না-এই আকুতি শুধু খুলনার হাশেমের না, সুপার সাইক্লোন আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত সকল উপকূলবাসীর। আইলা, সিডর এরপর আম্পান বারবার ভেঙে গেছে বাঁধ। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ না করে দুর্যোগ এলে যেনতেনভাবে বাঁধ ঠিক করা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। তারা এখন বুঝে গেছে, বছর বছর কষ্ট করার চেয়ে তাদের এখন স্থায়ী একটি সমাধান দরকার।

২০১৭ সালে আইলা পরবর্তী সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) উপকূলীয় এই তিন জেলায় বাঁধ সংস্কারের ওপর সমীক্ষা চালায়। সেখানে বলা হয়Ñ খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে রয়েছে দুই হাজার ১৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। যার মধ্যে  ২০০ কিলোমিটারের ওপর অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এরপরের হিসাবটা শুধু কাগজে কলমে প্রকল্প প্রণয়ন, কিন্তু তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে, কিভাবে প্রয়োজনীয় সংস্কারের

স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে তা নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এসব এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ সংস্কার, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সবকিছুতেই স্থানীয় জনগণের মতামত উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে প্রতিবছর সরকারি কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও মেলেনা টেকসই বেড়িবাঁধ। বেড়িবাঁধ সংস্কার যেন হয়ে উঠেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ঠিকাদারদের অর্থ লুটের স্থায়ী খাত। তারা মনে করছেন- পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিলুপ্ত হলেই কেবল স্থায়ী বেড়িবাঁধ সম্ভব। লাঘব হবে তাদের দীর্ঘ বছরের দুর্ভোগ। স্থানীয় বাসিন্দারের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ দেয় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালি, ঝালকাঠির ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ আর মানুষের জলাবদ্ধ হয়ে পড়া।

পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক অবশ্য জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করে বাঁধ নির্মাণে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে বলে বলছেন। খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুরের ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সরকার উপকূলীয় ৫ হাজার ৫ শত ৬৫ কিলোমিটার এলাকায় নদী ভাঙ্গন রোধে বাঁধ তৈরি করে যাচ্ছে। যে সকল এলাকায় বাজার, শহর, স্কুল  আছে সেই সকল এলাকায় স্থায়ী বাঁধ তৈরি করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাঁধ তৈরির ডিজাইনেও পরিবর্তন করা হচ্ছে। আগে বাঁধের উচ্চতা ছিল ৫ ফুট এখন সেই বাঁধের উচ্চতা হবে ১৩ ফুট এবং চওড়া হবে ১২ ফুট।  এ ছাড়া যে সকল এলাকায় নদী ভাঙ্গন বেশি হচ্ছে সেই সকল এলাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাঁধ তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

খুলনা : আম্পানের আঘাতে খুলনার প্রত্যন্ত উপকূলীয় উপজেলা কয়রার ১৮টি স্থানে ভেঙে গেছে বেড়িবাঁধ। জোয়ারের লোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে চার ইউনিয়নের ৪২ গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট। দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না সরকারি-বেসরকারি ত্রাণ। ভেঙে পড়েছে এলাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও। স্থানীয়রা মনে করছেন এই অবস্থা থেকে উত্তরণে একমাত্র উপায় স্থায়ী বেড়িবাঁধ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশের দক্ষিণের জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের উপকূলীয় মানুষকে রক্ষা করে বেড়িবাঁধ। কিন্তু এই তিন জেলার অধিকাংশ বেড়িবাঁধের অবস্থায় বরাবরই জরাজীর্ণ। বর্ষা মৌসুম কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সবসময়ই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের দুর্ভোগের আতঙ্কে থাকতে হয় স্থানীয়দের। প্রতিবারই জলাবদ্ধতা আর ফলসলহানির শিকার হন তারা। ক্ষতি আর ভোগান্তির পরিমাণ বাড়তে থাকলেও প্রতিফলিত হয় না কোনো সরকারি হিসাবে।

আম্পানের আঘাতের ৮ দিন পর হলেও সরকারিভাবে বেড়িবাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়রা নিজ উদ্যোগে ভিটে মাটি রক্ষায় নিজেরাই মাটি, খড় ও বাঁশ দিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে তৈরি করছেন রিং বাঁধ, যা পরিকল্পিত ও স্থায়ীও নয়। আর এখন পানি উন্নয়ন বোর্ড করছে আম্পানের ক্ষয়ক্ষতির সমীক্ষা।

সাতক্ষীরা : ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, আশাশুনি ও সদর উপজেলায় ২৩টি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বাঁধ ভেঙে ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু শ্যামনগরে প্লাবিত হয়েছে ২৫টি গ্রাম। অসংখ্য মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’ আঘাত হানার পর সাত দিন কেটে গেলেও সাতক্ষীরা জেলার দুই উপজেলার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ লবণপানিতে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। শ্যামনগর বুড়িগোয়ানী ও কাশিমাড়ী এলাকায় জোয়ারে লবণপানি প্রবল বেগে প্রবেশ করছে। বাঁধের যেসব জায়গা ভেঙে গেছে সেখানে পানি ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার ভেতর পর্যন্ত লোকালয়ে চলে গেছে।

শ্যামনগর উপজেলা দেশের একেবারে দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এর দক্ষিণে সুন্দরবন। পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা। শ্যামনগর উপজেলার একটি ইউনিয়ন কাশিমারি। এই ইউনিয়নের গ্রামগুলো হচ্ছে কাশিমারি, ঝাপালি, জয়নগর, ঘোলা, গোবিন্দপুর, শঙ্করকাঠি, খাজুরাটি, খুটিকাটা ও গাঙমারি। এই গ্রামগুলোতে এখনো জোয়ারের পানি থৈথৈ করছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের দাপটে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এখানকার নয়টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। স্থানীয়দের দাবি, আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা স্থায়ী বাঁধ চাই। স্থায়ীভাবে বাঁধ দিতে হবে। তা না হলে এই জনপদ থাকবে না।

পিরোজপুর : ঘূর্ণিঝড় আম্পানে পিরোজপুরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছে নদী পাড়ের গ্রামগুলোর কয়েক লাখ মানুষ। শুধু মাটি দিয়ে তৈরি করায় ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের অধিকাংশই ধসে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। আর এসব বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে আতঙ্কে দিন কাটছে নদীপাড়ের মানুষের। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলেশ্বর নদীর পাড়ে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বড় মাছুয়া ইউনিয়ন এবং কঁচা নদীর পাড়ে ইন্দুরকানী উপজেলা। এরই মাঝে বুধবার ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বলেশ^র নদীর বড় মাছুয়া লঞ্চঘাট নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক। তিনি পরিদর্শনকালে বলেন, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ দ্রুত মেরামত করা হবে। এ ছাড়া নদীপাড়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার স্থানে মজবুত এবং স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে। অন্যান্য এলাকায় মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হবে।

ঝালকাঠি : ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলায় বিষখালী নদীর পশ্চিম তীরের ৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় এখনো তলিয়ে রয়েছে  উপজেলার ২০ গ্রামর মানুষ। পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে ফসলের ক্ষেত, মাছের ঘের। কয়েকশত বসতঘরে প্রবেশ করেছে পানি। উপড়ে পড়েছে অসংখ্য গাছপালা, ভেঙে গেছে প্রায় ৩০টি বসতঘর। এ উপজেলায় এখনো অনেক স্থানে বিদ্যুতসংযোগ চালু হয়নি। নদী তীরের বাসিন্দারা এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়রা জানায়, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ বর্ষার আগে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বিষখালি ও সুগন্ধ্যা নদীর ৪৮ কিমি বেড়িবাঁধের মধ্যে কাঁঠালিয়া উপজেলার ২৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পুরোটাই নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে বেড়িবাঁধ ভেঙে কাঁঠালিয়া উপজেলার ১২০০ হেক্টর কৃষি জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। টাকার অঙ্কে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি টাকা। ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক  মো. জোহর আলী জানিয়েছেন, বেড়িবাঁধের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। ঝালকাঠি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রকল্প তৈরি করে আগামী বর্ষার আগে ঢাকায় পাঠানোর জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, খুব শিগরিই এ বেড়িবাঁধের কাজ শুরু হবে বলে জানালেন জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী।

বরগুনা : দেশের উপকূলীয় সমুদ্র তীরবর্তী প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ জেলা বরগুনা। এ জেলার বয়েছে খরস্রোতা পায়রা ও বিষখালী নদী, যা জেলার বরগুনা ও বেতাগীকে, আমতলী ও তালতলীকে এবং বামনা ও পাথরঘাটা, এ ছয়টি উপজেলাকে বিচ্ছিন্ন করে এই তিন ভাগে ভাগ করে রেখেছে। এ ছাড়াও এ জেলা থেকে সুন্দরবনকে পৃথক করেছে বলেশ্বর নদী। প্রায় প্রতিবছরই বরগুনায় আঘাত হানে দক্ষিণাঞ্চলের সকল  ঘূর্ণিঝড়। নড়বড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় সহস্র একর ফসলি জমি। জলোচ্ছ্বাসের স্রোতে ভেসে যায় শত শত মাছের ঘের। মুখ থুবরে পড়ে জেলার কৃষি ও মৎস্য খাত। নিঃস্ব হয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ। যুগ যুগ ধরে চলা প্রকৃতির এমন নিষ্ঠুরতার পরও জেলায় মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এ জেলার মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে সাড়ে ১১ ফিট উচ্চতার জোয়ারের তীব্রতায় জেলার ২১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ আংশিক ভেঙে গেছে। পুরোপুরি ভেঙে গেছে প্রায় ২০০ মিটার বেড়িবাঁধ। এতে জেলার ৬টি উপজেলার ৮২টি স্থানে বেড়িবাঁধের ক্ষতি হয়েছে যা মেরামত করতে ২০ কোটি টাকার প্রাক্কলন ব্যয় ধরেছে বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

মোংলা : সুপার সাইক্লোন আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত মোংলার বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করেছেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদুজ্জামান খাঁন। গত মঙ্গলবার দুপুরে মোংলার কানাইনগর, দক্ষিণ কাইনমারী এলাকার বিধ্বস্ত বাঁধ পরিদর্শন শেষে জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, কানাইনগরসহ এখানকার ভাঙ্গনপ্রবণ বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে দেখলাম, এখন জরুরি ভিত্তিতে এবং দীর্ঘমেয়াদে কি করা দরকার সেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা দুই ধরনেরই কার্যক্রম হাতে নিব। আর পানি উন্নয়ন বোর্ডে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাহিদুজ্জামান খাঁন বলেন, যদিও মোংলার ক্ষতিগ্রস্ত এ বেড়িবাঁধ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নয়। এটি স্থানীয়ভাবে কাবিখাসহ বিভিন্ন প্রকল্প দিয়ে করা হয়েছে। তারপরও বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

Ñপ্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন খুলনা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক এস এম কামাল, সাতক্ষীরা থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জল, পিরোজপুর প্রতিনিধি খালিদ আবু, ঝালকাঠি প্রতিনিধি রতন আচার্য্য, বরগুনা প্রতিনিধি মাহবুবুল আলম মান্নু, মোংলা প্রতিনিধি কামরুজ্জামান জসিম।

advertisement