advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

ইহজাগতিকতার অনন্য অভিযাত্রী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

গোলাম কবির
২৯ মে ২০২০ ১২:১৭ | আপডেট: ২৯ মে ২০২০ ১২:১৭
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে লেখক গোলাম কবির
advertisement

জনক-জননীর প্রতি অসীম শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষা-সংস্কৃতির অকৃত্রিম সচেতনতা, ইহজাগতিকতার অনমনীয় অভিযাত্রী হিসেবে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নতুন করে পরিচয় দানের অপেক্ষা রাখে না। কেবল সম্মোহিত চিত্তে ফিরে দেখার তাগিদেই এই অকিঞ্চিৎ আয়োজন। বাইরে করোনা আক্রান্ত দুর্যোগের পৃথিবী আর ভেতরে আমাদের মতো স্ববিরোধীদের মাঝে সাংস্কৃতিক ভুবনে অভিভাবকহীনভাবে দেশবাসীকে রেখে চলে গেলেন তিনি। আমরা বিমূঢ় চিত্তে দূর থেকে চেয়ে দেখলাম।

‘সুধাকর’ (১৮৮৯) সাহিত্য পত্রিকার প্রবর্তক শেখ আব্দুর রহিমের পৌত্র আনিসুজ্জামান। ২৪ পরগণার বশিরহাটের শেখ আব্দুর রহিম (১৮৫৯-১৯৩১) এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় অবস্থানকালে ছোট-বড়ো ১১ খানা গ্রন্থ রচনা করেন। উদ্দেশ্য, দিগভ্রান্ত মুসলিম সমাজকে জাগিয়ে তোলা। পিতামহের শোণিতধারা আনিসুজ্জামানের ধমনিতে যে সঞ্চরণশীল ছিল, তা লেখাবাহুল্য। শেখ আব্দুর রহিম বাংলা ভাষার মাধ্যমে সামাজিক জাগৃতির পথে হেঁটেছেন, আনিসুজ্জামানও অনুরূপ। তবে পার্থক্য কালের আর সমাজ ভাবনার ধরনের। একজন স্বাতন্ত্র্যধর্মী অন্যজন সমন্বয়বাদী।

সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণ আনিসুজ্জামান ভাষা আন্দোলনের কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে প্রচারপুস্তিকা রচনা করেছিলেন পিতামহের রক্তসূত্রে। আর বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি মন-প্রাণ উজাড় করে দিয়েছিলেন জননীর ভাষাশহীদের জন্য অকল্পনীয় শ্রদ্ধাবোধ প্রত্যক্ষ করে। তার জননী মৃত কন্যার ব্যবহৃত সোনার মালা অঞ্জলি দিয়েছিলেন প্রথম শহিদ-বেদীতে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলতেন, চিকিৎসক পিতার নিয়মানুবর্তিতা এবং জননীর অকুণ্ঠ সততা তার চলার পথের দিশারী।

বাইশ বছর বয়সে শিক্ষকতায় আসেন আনিসুজ্জামান। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখনকার বিভাগীয় বিরূপ পরিবেশ এড়িয়ে চলার জন্য তিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত, পাহাড়-অরণ্য বেষ্টিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। না, বানপ্রস্থে নয়, সে বয়সও তার হয়নি।

ষাটের দশকে তার অক্ষয় কীর্তি বংলা নববর্ষ ও রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে সক্রিয় অংশগ্রহণ। সেই প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের একখানা অসাধারণ গ্রন্থের সম্পাদনাসহ অন্য গ্রন্থের ফিরিস্তি দেব না। তবে বলে রাখা ভালো, ‘কালনিরবধি’ এবং ‘জেগে উঠিলাম’ আমার এ লেখার তথ্যের অন্যতম আকর।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মনিষার পরিচায়ক ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ গ্রন্থখানির সুবাদে ১৯৬৫-৬৬ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তার আগমন ঘটে। ওই সময়ে ‘জুবেরি হাউসে’ একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে তিনি ছিলেন একক বক্তা। প্রশ্নকর্তাদের মধ্যে ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা’র লেখক ড. কাজী আব্দুল মান্নান তাকে অনেক প্রশ্ন করেন। তিনি সব প্রশ্নের সাবলীল উত্তর দিয়ে সবার কৌতূহল প্রশমিত করেন। তখন থেকেই তার বাচনশৈলী আর বক্তব্যের ঋজুতায় মুগ্ধ ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সে আয়োজনের প্রায় সাতচল্লিশ বছর পর ২০১২ সালে রাজশাহী সাংস্কৃতিক উৎসবে প্রধান আকর্ষণ হিসাবে তিনি আগমন করলে তার সাথে একান্ত পরিচয়ের সুযোগ হয় আমার। এ যোগাযোগের আয়োজন করেছিলেন তখনকার রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, যিনি কবি আসাদ মান্নান নামে খ্যাত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানের কালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণের জন্য আগরতলা হয়ে কলকাতায় চলে যান। সে সময়ে তাহের উদ্দিন ঠাকুর এবং মোস্তাক আহমদ তাকে  যথাযথ সম্মান দেয়নি। তাজউদ্দীন সাহেব তাকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে আমন্ত্রণ জানালে তিনি এ.আর. মল্লিকের নেতৃত্বে প্রথমে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তারপর প্রবাসী সরকারের পরিকল্পনা কমিশনে যুক্ত থাকার সুযোগ পান। এর নেতৃত্বে ছিলেন মোজাফফর আহমদ চৌধুরী। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শিক্ষার দিকটি দেখতেন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে শিক্ষা কমিশন গঠিত হলে তার অন্যতম সদস্য নিয়োজিত হন তিনি। কমিশনে থাকাকালীন শিক্ষাক্ষেত্রেই হজাগতিকতার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেন ড. আনিসুজ্জামান।

বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় তাঁর ভূমিকা কম নয়। সংবিধানের বাংলা ভাষায় রূপান্তরের তিনি অন্যতম কুশীলব। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুতেই অসামান্য অবদান রাখলেও ব্যক্তিগত ত্যাগের দাবি তুলে পদ পদবির জন্য উদবাহু হননি, অথবা রাজনীতির ছত্রছায়ায় বিশেষ সুবিধা ভোগের জন্য নির্লজ্জ উমেদারি থেকে সযত্নে দূরে থেকেছেন। সমাজ-সংস্কৃতি উন্নয়নে মানবিক ইহজাগতিকতার প্রতি তিনি প্রতিশ্রুতিশীল ছিলেন। এ সব ব্যাপারে ছিল তার স্বতঃপ্রবৃত্ত অংশগ্রহণ।

দৈববাদী পশ্চাৎপদরা ছাড়া সকল প্রগতিশীল মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সম্মানের পাত্র। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার মানববাদী ইহজাগতিক কল্যাণচিন্তার পরিবর্তন হয়নি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাংলাদেশকে যখন ‘উদ্ভট উটেরপিঠে’ আসীন করে পাকিস্তানি ঘরানায় নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল কিছু ব্যক্তি এবং যুদ্ধাপরাধী গোলাম আজমকে নাগরিকত্ব দিয়ে মসনদে বসবার ছক এঁকেছিল। তখন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নীরব দর্শক থাকতে পারেননি। জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা যুদ্ধাপরাধীদের জন্য গঠিত বিচারমঞ্চে অন্যতম কুশীলব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ছিয়ানব্বই-এর পূর্ব পর্যন্ত তাই তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার খড়গ মাথায় নিয়ে বসবাস করতে হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, সেই অপবাদ চাপিয়ে দিয়ে কানাডায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। এতে তিনি ভীতবিহ্বল হননি; বরং যা বিশ্বাস করতেন, তা কথায় ও কাজে প্রয়োগ করে দেখিয়ে গেছেন।

একজন আদর্শ শিক্ষকের অনুকরণীয় বৈশিষ্ট্য তিনি ধারণ করতেন। এ ব্যাপারে তিনি সমর্পিত সমঝোতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। যা ভালো বুঝেছেন করেছেন, কর্মসাধনায় সীমা লংঘন করেননি।

আনিসুজ্জামান স্যার ঘরে-বাইরে অনেক পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। আমার বিশ্বাস, সম্মাননা দানকারিগণই গর্বিত হয়েছেন। অথচ সমাজে দেখা যায় কিছু স্বঘোষিত শিক্ষাদিকপাল উলঙ্গ স্তাবকতার মাধ্যমে নিজের বা পরিজনের জন্য পদক প্রাপ্তির পথ খোঁজেন। তিনি সে জাতের মানুষ ছিলেন না। তাকে দেওয়া সম্মানের মর্যাদা রক্ষায় তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন। শোনা যায়, অনেক রাজনীতিক তার প্রকাশ্য সমর্থন পাওয়ার আশা রাখতেন। তবে সে তুলনায় তার পরামর্শ গ্রহণে আগ্রহী ছিলেন না। এ দুঃখবোধ তার ছিল।

শিক্ষা কমিশনে যুক্ত থেকে তিনি মানবমুখী ইহজাগতিক শিক্ষার প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন, সংবিধানে সন্নিবিষ্ট জাতীয় চার মূলনীতির প্রতিফলনের ভেতর দিয়ে ইহবাদী দর্শন প্রতিষ্ঠার কামনা ছিল তার। হয়ে ওঠেনি। তবে বিশ্বাস হারাননি। মনে করতেন, মানবকল্যাণকামী সৎ রাজনীতিকগণই সমাজ জীবনকে মানব মহিমায় অধিষ্ঠিত করতে সমর্থ হবে।

উল্লেখ্য, তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করেননি। যদিও শিক্ষার্থী জীবনে প্রগতিশীল ছাত্র-রাজনীতির সাথে তার সংযোগ ছিল। শিক্ষকতায় এসে তার প্রত্যক্ষ সংযোগ রাখেননি। লেখা বাহুল্য, একজন আদর্শ শিক্ষকতাব্রতীর কর্মকাণ্ডে মতবাদী হওয়া বেমানান। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জীবনাদর্শের সকল ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের পরিচয় দিয়েছিলেন। বিশ্বজোড়া করোনার নিদারুণ অকরুণ দিনে এই ইহজাগতিকতাবাদী অনমনীয় নিষ্ঠকর্মী চলে গেলেন। আমরা কজন তার গুণগ্রাহী হতে পারব, তার জন্য হয়তো  দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষা করতে হবে।

গোলাম কবির : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

advertisement