advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

গণপরিবহন চালু হলে কী হতে পারে, জানালেন সংশ্লিষ্টরা

জনি রায়হান
২৯ মে ২০২০ ২০:৩৩ | আপডেট: ৩০ মে ২০২০ ১০:২৬
ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহন। পুরোনো ছবি
advertisement

দেশে আগামী ৩১ মে থেকে অফিস খোলার পাশাপাশি ‘সীমিত পরিসরে স্বল্প সংখ্যক’ যাত্রী নিয়ে সব ধরনের গণপরিবহন চলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। তবে সীমিত পরিসরে স্বল্প সংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্বাস্থ্যসম্মত বিধি নিশ্চিত করে গণপরিবহন চালু করা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা সম্ভব তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তারা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালু করলেও তা যাত্রীদের আরও বেশি দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দিবে। একই সাথে বাড়াবে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও। কেননা বাংলাদেশে স্বাভাবিক সময়েই গণপরিবহনে যাত্রীর এত চাপ থাকে যে বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে, গেটে ঝুলেও যাতায়াত করেন অনেক মানুষ। অপর দিকে বৃদ্ধি পেতে পারে গাড়ির ভাড়া। আর এটা রুখতে হলে সরকার ও পরিবহনের মালিক-শ্রমিকসহ সবাইকে সহোযোগিতা করতে হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

পরিবহনের যাত্রী অধিকার ও সেবা, সুরক্ষা নিশ্চিতে কাজ করা একাধিক ব্যক্তি দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে এসব কথা বলেছেন।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘করোনাভাইরাসের সংক্রমণকালীন সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালু করাটা আমাদের আরও বেশি দুর্ভোগের মধ্যে ফেলে দিবে। কেননা স্বাভাবিক সময়েই আমরা গণপরিবহনের বড় সংকট অনুভব করি। সেখানে সীমিত আকারের স্বাস্থবিধি মেনে যাত্রী পরিবহন করলে অর্ধেক যাত্রী যাতায়াত করতে পারবে। আর বাকিরা পড়বেন চরম দুর্ভোগে।’

‘স্বাভাবিক সময়ে ৪০ সিটের একটি বাসে ৪০ সিটের যাত্রী ছাড়াও দাঁড়িয়ে আরও ২০ জন যাত্রী চলাচল করে। সেখানে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চালাতে হলে ওই বাসে ৪০ সিটের মধ্যে মাত্র ২০ জন যাত্রী উঠতে পারবেন। তাহলে বাকি ৪০ জন যাত্রীর কী হবে। চরম বিপাকে পড়ে যাবেন অনেক যাত্রীরা’, বলেন তিনি।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী আরও বলেন, ‘সে কারণে আমি সরকারের সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ করতে চাই, গণপরিবহন চালু করলে সীমিত আকারে না করে একসাথে সবগুলো চালু করে দিতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা শহরে যতগুলো বাস আছে তার সবগুলো যদি চালু করা হয় তবেই কেবল স্বাস্থ্য বিধি মেনে যাত্রী চলাচলা করানো যাবে বলে আমরা মনে করি।’

অতীতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতায় বলে আমাদের দেশের গণপরিবহনকে আইন মানানো এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কেননা সরকারের পক্ষ থেকেও যাত্রীবান্ধব কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা বাস্তবায়ন করা যায় না। যাত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থেও কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটাও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। কোনোভাবেই মানানো যায় না। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকেই বলা যায়—এবারের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচলের যে পরিকল্পনা, তা কোনোভাবেই মানানো যাবে না।’

পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকদেরও সমস্যার কথা উল্লেখ করে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘দীর্ঘদিন বন্ধের কারণে আয় বঞ্চিত থাকায় পরিবহনের মালিক ও শ্রমিক ভাইয়েরা নিদারুণ আর্থিক সংকটে পতিত। ফলে তাদের কাছে বেঁচে থাকাই এখন মুখ্য বিষয়। সুতরাং তাদের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করে পরিবহন পরিচালনা করা কতটুকু সম্ভব তা প্রশ্নবোধক। অন্যদিকে সড়কে যারা বৈধ-অবৈধ চাঁদাবাজি করেন তারা সক্রিয় হয়ে উঠবে। এমতাবস্থায় সরকারের পক্ষে পরিবহনের মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সাধারনের জন্য আরোপিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন পরিচালনা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

বাস ভাড়া বৃদ্ধি পেতে পারে জানিয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘দেশে গণপরিবহনগুলো দৈনিক ইজারাভিত্তিক চালানোর কারণে মালিক সমিতি, বাস শ্রমিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে স্ব স্ব গণপরিবহনের শ্রমিকের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এতে দেশের যাত্রী সাধারণ শঙ্কিত যে, বাসে বেশি যাত্রী তোলা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের একটি অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। কোনোভাবেই ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না। ভাড়া বৃদ্ধি না করে কীভাবে গণপরিবহনগুলো স্বাস্থ্য বিধি মেনে চালানো যায় সেটাই ভাবতে হবে।’

সরকারের কাছে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরতে চান বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব। তিনি বলেন, ‘গণপরিবহন চালুর আগেই তেলের দাম কমিয়ে দিতে হবে। করোনা সংক্রমণ বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন পরিচালনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে দিলেই কেবল সড়কে শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করা সম্ভব। তাই করোনা সংকটকালীন সময়ে গণপরিবহন পরিচালনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে দিলে সড়কে কোনো চাঁদাবাজি থাকবে না। সড়কে যদি চাঁদা দিতে না হয় প্রতিদিন একটি গাড়ির এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেঁচে যাবে। তেলের দাম যদি কমানো যায়, তাহলে সেখানে থেকেও কিছু টাকা বেঁচে যাবে ফলে গাড়ির খরচও কমে যাবে৷ যাত্রীর ওপরে বাড়তি ভাড়া চাপাতে পারবে না।’

ভাড়া বৃদ্ধি না করার বিষয়ে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা মহানগর যে সকল বাস চলে সেগুলো আসলে ৩৬ সিটের বাস। কিন্তু বানানো হয়েছে ৪৬ সিটের এবং চট্টগ্রাম মহানগরের ভেতরে যে সকল বাস চলে ৩২ সিটের সেগুলো বানানো হয়েছে ৪২ সিটের। কাজেই ১০টি আসন এমনিতেই বাড়তি রাখা হয়েছে। এর ওপরে ভাড়া নির্ধারনের সময় ১০ টি আসন খালি ধরেই ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। এই মোট ২০ টি আসন অতিরিক্ত আছে, সেটা হচ্ছে “শুভঙ্করের ফাঁকি”। কাজেই ভাড়া বৃদ্ধি করার কোনো প্রশ্নই আসে না। এসব বিষয়ে সরকারকে নজর দিতে হবে তাহলে যাত্রীদের ভাড়া বৃদ্ধি হবে না।’

যানবাহনগুলো পরিষ্কার রাখতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি গাড়ির সিট কাভার এবং গাড়ি নিয়মিত ধৌত করতে হবে। ৩১ তারিখে গাড়িগুলো চালু করার আগেই প্রতিটি টার্মিনালে ওয়াশ ফিটের (গাড়ি ধোয়া) ব্যবস্থা করতে পারে।’

প্রায় একই ধরনের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক কেফায়েত শাকিল। তিনি বলেন, ‘গণপরিবহন চালু আসলে একটি শঙ্কার বিষয়। যে শহরে এত কিছু করেও মালিক শ্রমিকদেরকে গাড়িতে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, যাত্রী ঝুলিয়ে নেওয়া, যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা পুলিশ ঠেকাতে পারেনি। সেই শহরে কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী পরিবহন করা হবে সেটাই আসলে শঙ্কার এবং সন্দেহের বিষয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি এটা সত্যি বাস্তবায়ন করতে চাই, তাহলে বাস মালিকদের আগের সচেতন এবং মানবিক হতে হবে যাতে ওই বাসের চালকদের ওপরে চাপ কমে। তবে কোনো বাস মালিক যদি শুধুমাত্র ব্যবসার উদ্দেশ্যেই পরিবহন চালু করে তবে স্বাস্থ্যবিধি মানা বা শারীরিক দূরুত্ব নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’

কেফায়েত শাকিল বলেন, ‘বাস মালিকেরা সেবা এবং টিকে থাকার মানসিকতা নিয়ে যদি পরিবহনগুলো চালু করে। এক সিট খালি রেখে অপর সিটে যাত্রী নেওয়া এবং স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করা। একই সাথে প্রতি ট্রিপের পর পর যদি পুরো গাড়ি পরিষ্কার করে। তবে হয়তোবা পরিবহনের যাত্রীদের কিছুটা ভাইরাস মোকাবিলা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।’

সেনাবাহিনীকে পরিবহনগুলো মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হোক জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের পরামর্শ হবে মনিটরিং ব্যবস্থা যাতে কঠোরভাবে করা হয়৷ এর আগে এটা পুলিশকে করতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটা যদি সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয় তাহলে মনে হয় অনেক বেশি ভালো হতে পারে।’

‘একই সঙ্গে গাড়ির মালিকদেরকেও সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কিছু সুবিধা দেওয়া উচিত যেমন—তেলের দাম কমানো, ফিটনেস ফি কমানো ইত্যাদি। কারণ, যদি গাড়ির মালিক পক্ষ সুবিধা পায় তবে তাদের পক্ষে যাত্রীদের সুবিধা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে’, যোগ করেন কেফায়েত শাকিল।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ দৈনিক আমাদের সময় অনলাইনকে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সকল গাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার এবং অন্য জীবানুনাশক জিনিসপত্র সবসময়ই ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।'

এনায়েত উল্লাহ আরও বলেন, ‘দূর পাল্লার বাসে ৫০ ভাগ যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত  করা হবে। এক সিট ফাঁকা রেখে আরেক সিটে যাত্রী বসানো হবে। ঢাকা সিটির মধ্যে এটা মানানো একটু কস্টসাধ্য হবে। তবে ঢাকাতেও যাতে গাড়িতে এই নিয়মগুলো সঠিকভাবে মানানো যায়, পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের সবার সাথে মিলে সেটাই আমরা চেষ্টা করব।’

advertisement