advertisement
advertisement

লিবিয়ায় হতাহত বাংলাদেশিদের পরিচয় মিলেছে

অনলাইন ডেস্ক
২৯ মে ২০২০ ২০:৩৭ | আপডেট: ৩০ মে ২০২০ ০৮:৫৫
প্রতীকী ছবি
advertisement

লিবিয়ায় মানব পাচারকারীদের গুলিতে নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ২৪ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে। এ ঘটনায় ১১ জন বাংলাদেশি গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে গেছেন, তাদের পরিচয়ও পাওয়া গেছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার লিবিয়ায় ৩০ জন অভিবাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জনই বাংলাদেশি বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। অন্য চারজন আফ্রিকান অভিবাসী।

‘নিখোঁজ বা মৃত’ ২৪ জন হলেন, গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল, মাদারীপুরের জাকির হোসেন, সৈয়দুল, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা (মৃত) ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম, ঢাকার আরফান (মৃত), টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের লাল চান্দ, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও মো. আলী, হোসেনপুরের রহিম (মৃত) এবং যশোরের রাকিবুল।

আহত ১১ জন হলেন, মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী (হাঁটুতে গুলিবিদ্ধ), ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের মো. সাজিদ (পেটে গুলিবিদ্ধ), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের মো. জানু মিয়া (পেটে গুলিবিদ্ধ), ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের মো. সজল মিয়া (দুই হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন), গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ (হাতে মারাত্মকভাবে জখম ও আঙ্গুলে কামড়ের দাগ, দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ), টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের মো. তরিকুল ইসলাম (২২), চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার মো. বকুল হোসাইন (৩০), মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়ির মো. আলী (২২), কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ (২০), মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের মো. সম্রাট খালাসী (২৯) এবং চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী (মস্তিষ্কে গুলিবিদ্ধ, গুরুতর অবস্থা)। তারা সবাই ত্রিপোলি মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে খুন হওয়া ২৬ বাংলাদেশি মানবপাচারকারী চক্রের হাত থেকে অপহরণকারী চক্রের হাতে পড়েছিলেন বলে লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে।

অপহরণকারীদের চালানো গুলিতে আহত এক বাংলাদেশির বরাত দিয়ে লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম বিষয়ক কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, মারা যাওয়া ২৬ জন বাংলাদেশিসহ মোট ৩৮ বাংলাদেশি ও কয়েকজন সুদানি নাগরিক প্রায় ১৫ দিন ধরে ওই অপহরণকারী চক্রের হাতে আটক ছিলেন। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদায় তাদের আটক করে রাখা হয়েছিল। সেখানেই ২৮ মে সকালে বন্দীদের ওপর গুলি চালায় অপহরণকারীরা।

নিহতরা যেভাবে অপহরণকারীদের কবলে পড়লেন

আশরাফুল ইসলাম জানান, নিহত ২৬ বাংলাদেশিসহ মোট ৩৮ বাংলাদেশি ইতালিতে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘করোনাভাইরাস সংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে তারা ভারত ও দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছান।’ এরপর প্রায় দুই মাস মানব পাচারকারীরা তাদেরকে লিবিয়ায় গোপন করে রেখেছিল। উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের।

আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘বছরের এই সময়টায় সাগর অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকায় এটিকেই সাগর পাড়ি দেওয়ার আদর্শ সময় বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রচলিত ও ব্যবহৃত পথে না গিয়ে মরুভূমির মধ্যে দিয়ে বেশ বিপদসংকুল একটি পথে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।’

লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যুদ্ধকবলিত লিবিয়ায় একাধিক সরকার থাকায় ত্রিপলি হয়ে যুওয়ারা যাওয়ার প্রচলিত পথে নানা রকম তল্লাশি হয়। সেই পথ এড়িয়ে কম ব্যবহৃত মরুভূমির মধ্যকার রাস্তা দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে যুওয়ারা যাচ্ছিলেন পাচারকারীরা।কিন্তু ওই মরুভূমির পথ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণাধীন, যারা সরকারহীনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে অনেকদিন ধরে। সন্ত্রাসী ও অপহরণকারীদের একাধিক গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বের ঘটনাও ঘটে থাকে।’

বেনগাজি থেকে মরুভূমির রাস্তায় যুওয়ারা যাওয়ার পথে তারা অপহরণকারীদের কবলে পড়েন বলেও জানান তিনি।

যে কারণে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হলো

ইতালিতে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশি ও সুদানি নাগরিকরা অপহরণের পর মিজদাতেই প্রায় ১৫ দিন অপহরণকারীদের জিম্মায় ছিলেন।

আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘অপহরণকারীদের সঙ্গে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কাঙ্ক্ষিত মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয় তারা।’

দূতাবাসের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আাটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা। এক পর্যায়ে বাংলাদেশিদের সাঙ্গে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এরপর অপহরণকারীরা ক্ষুদ্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে ৩৮ জন বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হয়। মারা যায় ২৬ জন।’

বাংলাদেশ সরকারের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত অবস্থায় কয়েকজন ভেতরেই পড়েছিল। দুই-একজন আহত অবস্থায় বের হয়ে আসে। তাদের দেখে স্থানীয় লোকজন সেনাবাহিনীকে খবর দেয় এবং সেনাবাহিনী তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে।’ আহত বাংলাদেশিদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানান তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে লিবিয়ার সংবাদমাধ্যম আল-ওয়াসাত খবর প্রকাশ করেছে যে, মোহাম্মদ আব্দুল রহমান নামের এক মানব পাচারকারী অজানা কারণে শুরু হওয়া এক ‘বিদ্রোহে’ মারা যান। এরপর তার পরিবারের সদস্যরা ওই ভবনটি ঘেরাও করে এবং মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য আলোচনা শুরু করে। এক পর্যায়ে ওই ভবনে উপস্থিত ১০০ জন অভিবাসী আত্মসমর্পণ করেন, কিন্তু ৪০ জন ভবন ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এরপর ওই ভবনে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও রকেট দিয়ে হামলা করলে ভবনের ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা নিহত হন।

লিবিয়ায় টানা ৪২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ২০১১ সালে তাকে অপসারণ ও হত্যা করা হয়। এরপর থেকেই লিবিয়ায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

advertisement