advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পরিচয় মিলেছে লিবিয়ায় হতাহত বাংলাদেশিদের

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
৩০ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মে ২০২০ ০০:২৭
advertisement

লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের হাতে নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের পরিচয় মিলেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আহতের বয়ানে এ পরিচয় জানা গেছে। লিবিয়ার মিজদাহ শহরে মানবপাচারকারী ও তার স্বজনদের এলোপাতাড়ি গুলিতে গত বৃহস্পতিবার ২৬ বাংলাদেশি নিহত ও ১১ জন আহত হন। এর মধ্যে ‘নিখোঁজ বা মৃত’ হিসেবে ২৪ জনের এবং আহত ১১ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। ‘নিখোঁজ বা মৃত’ ২৪ জন হলেন গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল; মাদারীপুরের জাকির হোসেন, সৈয়দুল, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা (মৃত) ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম; ঢাকার আরফান (মৃত); টাঙ্গাইলের মহেশপুরের লাল চান্দ; কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও আলী, হোসেনপুরের রহিম (মৃত) এবং যশোরের রাকিবুল।

আহতরা হলেন মাদারীপুর সদরের তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারি, ফরিদপুরের ভাঙ্গার দুলকান্দি গ্রামের সাজিদ, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শম্ভপুর গ্রামের জানু মিয়া, ভৈরবের জগন্নাথপুর গ্রামের সজল মিয়া, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বামনডাঙ্গা বাড়ির ওমর শেখ, টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের তরিকুল ইসলাম, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার বেলগাছির খেজুরতলার বকুল হোসাইন, মাদারীপুরের রাজৈরের কদমবাড়ির আলী, কিশোরগঞ্জের ভৈরবের সখিপুরের মওটুলীর সোহাগ আহমেদ, মাদারীপুরের রাজৈরের ইশবপুরের সম্রাট খালাসী এবং চুয়াডাঙ্গার বাপ্পী। তারা সবাই ত্রিপলি মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

ইতোমধ্যে এ হত্যাকা-ের তদন্ত শুরু করেছে লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, লিবিয়ার মিজদাহ শহরের এক নাগরিক অবৈধ অভিবাসীদের উপকূলীয় শহরে পাচারকালে তাদের হাতে নিহত হন। এতে ওই ব্যক্তির স্বজনরা আইন নিজেদের হাতেতুলে নেন এবং বাংলাদেশের ২৬ জন ও আফ্রিকার চারজনকে হত্যা করেন।

হত্যার বিচার চেয়েছি : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার ঘটনায় দোষীদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার এক ভিডিও বার্তায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এ কথা জানান। তিনি জানান, এ ঘটনায় লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তদন্তসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার, যথাযথ শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

মর্মান্তিক এ ঘটনায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী গভীর শোক প্রকাশ করেন ও আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে দূতাবাসকে নির্দেশনা দিয়েছেন। গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বার্তায় বলা হয়, মরদেহগুলো মিজদাহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আহতদের ত্রিপলির বিভিন্ন হাসপাতালে আনা হয়েছে। গুরুতর আহত তিনজনের শরীর থেকে গুলি বের করার জন্য অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দূতাবাস লিবিয়ার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং আইওএম লিবিয়ার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।

বাংলাদেশিদের গন্তব্য ছিল ইতালি

হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া আহত এক বাংলাদেশির বয়ানের ভিত্তিতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমবিষয়ক কাউন্সেলর আশরাফুল ইসলাম বিবিসিকে জানান, মারা যাওয়া ২৬ জনসহ ৩৮ বাংলাদেশি ও সুদানের কিছু নাগরিক প্রায় ১৫ দিন ধরে মিজদাহতে ওই অপহরণকারী চক্রের হাতে আটক ছিলেন। মূলত ইতালিতে অভিবাসনের উদ্দেশে ওই ৩৮ বাংলাদেশি লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। গত ডিসেম্বরে তারা ভারত ও দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি পৌঁছান। গত কয়েক মাস তাদের লিবিয়ায় বন্দি করে রাখা হয়েছিল।

আশরাফুল ইসলাম আরও জানান, উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের। কিন্তু প্রচলিত পথে না গিয়ে মরুভূমির মধ্য দিয়ে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ওই মরুভূমির পথ সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণাধীন, যারা সরকারহীনতার সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকা- চালিয়ে আসছে অনেকদিন ধরে। সেই পথেই অভিবাসীরা অপহরণকারীদের কবলে পড়েন। অপহরণকারীদের সঙ্গে আটকদের মুক্তিপণ নিয়ে দরকষাকষি চলছিল। আটকদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও মুিক্তপণ দিতে ব্যর্থ হন। এর ফলে তাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। একর্পযায়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে থাকা সুদানিরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে হত্যা করেন। এর জেরেই অপহরণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে একটি ঘরের ভেতরে এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ৩৮ বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে মারা যান ২৬ জন। আহত কয়েকজন কোনোমতে বের হয়ে এলে স্থানীয়রা সেনাবাহিনীকে খবর দেয়।

ব্র্যাক ও আসকের আহ্বান

লিবিয়ায় হত্যাকা-ের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারকে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল আসকের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান।

বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনায় জড়িত মানবপাচারকারী চক্রকে দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। গতকাল ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান এক বিবৃতিতে বলেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিতে হবে। কারণ লিবিয়ার এই পাচারকারী চক্র ইউরোপে পাঠানোর নামে দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের জিম্মি ও নিপীড়ন করছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো পাঁচ বছর ধরে বন্ধ। এর পরও কী করে এত লোক বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া যাচ্ছে, এর তদন্ত করা উচিত। মূলত সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, মাদারীপুর, শরীয়তপুরসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজন এভাবে ইউরোপে যায়। এসব এলাকার স্থানীয় দালাল ও মানবপাচারকারী চক্রকে চিহ্নিত করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশকেই।

advertisement