advertisement
advertisement

করোনা ‘মাথায়’ নিয়ে ঢাকামুখী ঢল

সর্বোচ্চ সংক্রমণের দিকে রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩০ মে ২০২০ ০০:২৭
advertisement

করোনা ভাইরাসের প্রকোপ রোধে দীর্ঘ ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির পর আগামীকাল রবিবার থেকে খুলে দেওয়া হচ্ছে সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস। আর তাই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি নিয়েই জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী মানুষের ঢল নেমেছে। অনেকে গ্রাম থেকে সংক্রমিত হয়ে কোনো রকম শারীরিক দূরত্ব বজায় না রেখে যানবাহন ও ফেরিতে গাদাগাদি করে রাজধানী ফিরছেন। গত দুদিন ধরে মাওয়া এবং পাটুরিয়া ঘাটে মানুষের ভিড় বেড়েছে। গতকালও ফেরিবোঝাই মানুষের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রোডে ব্যক্তি ও ভাড়া গাড়িতে ঢাকা আসছেন মানুষ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন

করোনা ভাইরাসে সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। চলতি মাসে আক্রান্ত রোগী সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। ঠিক এ মুহূর্তে সাধারণ ছুটি বাতিল করে সবকিছু খুলে দেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

ঢাকামুখী কর্মজীবী মানুষরা বলছেন, জীবিকার তাগিদে তারা ঢাকায় ফিরছেন। অফিস খোলার পর কাজে যোগ না দিলে চাকরি হারানোর ভয় আছে। পাশাপাশি জীবিকা নির্বাহ করতে হলে টাকা প্রয়োজন। তাই ঝুঁকি থাকলেও তারা ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

আমাদের প্রতিনিধিরা ঢাকামুখী মানুষের যে ঢলের চিত্র তুলে ধরেছেন, তাতে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যারা বাড়ি ছিলেন অথবা কর্মহীন ছিলেন কিংবা কাজের খোঁজে ঢাকায় গিয়েছিলেন, তারা আবার রাজধানী যাচ্ছেন এই প্রত্যাশায়। যাত্রীরা বলছেন, দীর্ঘদিন লকডাউন হওয়ায় তাদের অনেকে বেতন পাননি। কেউ কেউ অর্ধেক বেতন পেয়েছেন। এ অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য জীবিকাই মুখ্য হয়ে পড়েছে।

ঈদে গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে উপসর্গ এবং উপসর্গহীন অনেক করোনা রোগী ছিলেন বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এই রোগীরা নিজ এলাকায় গিয়ে সংক্রমণ ছড়িয়েছেন। সংক্রমিতদের অনেকে ঢাকায় আসছেন। যার ফলে ঢাকায় সংক্রমণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে আগামী সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে।

এর আগে গার্মেন্টস খোলা নিয়ে পোশাককর্মীদের কয়েক দফায় ঢাকায় আসা-যাওয়া সংক্রমণ বাড়িয়েছে। মার্কেট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তে কর্মীরা ঢাকায় এসেছিলেন। নানা সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তে এভাবে আসা-যাওয়ার মধ্যে সংক্রমণ বাড়িয়েছে বলে চিকিৎসকরা বলছেন।

সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অফিস-আদালতের পাশাপাশি ব্যাংক, শেয়ারবাজার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোদমে চলবে। এমনকি সীমিত পরিসরে গণপরিবহন, যাত্রীবাহী নৌযান, ট্রেন ও বিমানও চলবে।

সরকার এমন সময় শর্তসাপেক্ষে সবকিছু খুলে দিল যখন বাংলাদেশে সংক্রমণের ঊর্ধ্বধারা চলছে। গতকাল শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বুলেটিনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ২ হাজার ৫২৩ জন করোনায় শনাক্ত হয়েছেন। মারা গেছেন আরও ২৩ জন। এই প্রথম আক্রান্ত সংখ্যা একদিনে আড়াই হাজার পেরোল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আমাদের সময়কে বলেন, অফিস-আদালত খুলে দেওয়া এবং ঢাকামুখী মানুষের স্রোতের কারণে জনগণ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে। সংক্রমণ যে হারে বাড়ছে, সে হারে পরীক্ষা বাড়ছে না। ফলে প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। এখন সব খুলে দেওয়ায় সংক্রমণ খুব ত্বরিতগতিতে বাড়বে। এর চাপ নিতে হবে হাসপাতালগুলোকে। কিন্তু হাসপাতালগুলো সে চাপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সংক্রমণ কমানো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ ধীরে ধীরে ক্রমান্বয়ে লকডাউন কমাতে হবে। পরীক্ষা, কোয়ারেন্টিন ও হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমাদের সংক্রমণ বাড়ালে এই তিন জায়গায় সংকট সৃষ্টি হবে। কারণ টেস্ট বাড়ানো হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিন ও হাসপাতাল একেবারেই পর্যাপ্ত নয়। সরকার সংক্রমণ রোধে প্রাধান্য না দিয়ে উন্মুক্ত করে দিল। দায়টা সরকারকেই নিতে হবে।

অবশ্য অনেকে বলছেন, উন্নত দেশগুলো আর বাংলাদেশের অবস্থা এক নয়। কারণ বাংলাদেশের ৮০ ভাগ জনসাধারণ জীবিকার জন্য দৈনন্দিন কর্মনির্ভর। তাই বাংলাদেশের অর্থনীতির দিকটিও গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে দেশকে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে।

প্রথম রোগী শনাক্তের ১৭ দিন পর গত ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশ লকডাউন চলছে। বারবার লকডাউন বাড়িয়ে দেশকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করা হলেও ভাইরাস রোধ করা যাচ্ছে না। মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা দুটিই বাড়ছে দ্রুতগতিতে।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, ঈদে সংক্রমিতদের অনেকে বাড়ি যাওয়ায় তার দ্বারা অনেকে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন আক্রান্তদের অনেকে এখন ঢাকায় ফিরছেন। এভাবে সারাদেশে সংক্রমণ এমনভাবে ছড়িয়েছে যে আগামী কয়েক সপ্তাহে তা মারাত্মক আকার ধারণা করবে। তিনি বলেন, সারা পৃথিবীতে যখন সংক্রমণ কমতে শুরু করেছে তখন লকডাউনও শিথিল করা হচ্ছে। আর বাংলাদেশে ঘটল উল্টো চিত্র। আমাদের সংক্রমণ যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাচ্ছে তখন সবকিছু খুলে দিয়ে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করে দিলাম।

শিমুলিয়াঘাটে যাত্রীদের ভিড় : মুন্সীগঞ্জ থেকে নাদিম হোসাইন জানিয়েছেন, ঈদের ছুটি শেষে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়াঘাটে শুক্রবার ঢাকাগামী ও দক্ষিণবঙ্গগামী উভয় মুখে যাত্রীদের ভিড় ছিল। ভোর থেকে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলো থেকে হাজার হাজার যাত্রী ফেরিতে পদ্মা পাড়ি দিয়ে শিমুলিয়ায় এসেছেন। গণপরিবহন না থাকায় হেঁটে ছুটতে হচ্ছে ঢাকার দিকে।

বরিশাল থেকে কাঁঠালবাড়িঘাট দিয়ে শিমুলিয়াঘাটে আসা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঈদের ৪ দিন আগে ঢাকার বংশাল থেকে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। এখন আবার ঢাকা যেতে হচ্ছে। চাকরি বাঁচাতে যেতে হচ্ছে।

ঢাকার বঙ্গবাজারের হাশেম মাঝি নামে এক দোকানদার বলেন, ১ তারিখ থেকে সব চালু। মানুষের ঢল পড়ার আগেই ঢাকায় যাচ্ছি। ১ হাজার ২০০ টাকায় মোটরসাইকেল ভাড়া করে ঘাটে এসেছেন।

মাওয়া নৌ-ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবীর জানান, শিমুলিয়াঘাটে উভয় মুখে যাত্রীদের ভিড় রয়েছে। ভোর থেকেই ঢাকা থেকে দক্ষিণবঙ্গগামী ও দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী যাত্রীদের ভিড় লেগে আছে।

বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়াঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মো. ফয়সাল হোসেন জানান, স্পিডবোট ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় শুক্রবার ভোর থেকে দক্ষিণবঙ্গের এ নৌরুটে ফেরিতে যাত্রীদের প্রচ- চাপ দেখা দেয়। ঈদ শেষে দক্ষিণবঙ্গ ও ঢাকাগামী উভয় মুখে যাত্রীদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ৪টি রো-রো ফেরিসহ সর্বমোট ১২টি ফেরি চলাচল করছে এ নৌরুটে। শিমুলিয়াঘাটে দক্ষিবঙ্গগামী ২ শতাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে।

শিবচর প্রতিনিধি সম্পা রায় জানিয়েছেন, কাঁঠালবাড়ি-শিমুলিয়া নৌরুটের ফেরিতে শুক্রবার বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘরমুখো যাত্রীদের ঢল নেমেছে। ঢাকাগামী যানবাহনের চাপও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তবে শারীরিক দূরত্ব মানার কোনো বালাই নেই। নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় যাত্রীরা বিকল্প যানবাহনে ঘাটে পৌঁছাচ্ছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলো থেকে অতিরিক্ত ভাড়া ব্যয় করে মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে ৩-৪ গুণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে বরিশাল, খুলনা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে কাঁঠালবাড়ি ঘাটে আসছেন। অনেকে এসেছে পিকআপ ও পণ্যবাহী ট্রাকেও। ঘাটে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান, সহকারী পুলিশ সুপার আবির হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একাধিক টিম ঘাটগুলোয় অবস্থান নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।

দৌলতদিয়াঘাটে শত শত যানবাহন : রাজবাড়ী প্রতিনিধি মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে শুক্রবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত ২ শতাধিক যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলা থেকে ঢাকাগামী এসব যানবাহন দৌলতদিয়াঘাটে ফেরির অপেক্ষায় রয়েছে। শতাধিক প্রাইভেট ও মাইক্রোবাস এবং আরও শতাধিক মালবোঝাই ট্রাক রয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পারাপার করা হচ্ছে। দৌলতদিয়া পাটুরিয়া নৌরুটে ছোট-বড় ১৩টি ফেরি চলাচল করিলেও যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হলে যানজট বৃদ্ধি পাবে ও দুর্ভোগ বাড়বে বলে ট্রাক ড্রাইভাররা জানান।

কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার পান্টি শেখ পাড়া গ্রামের সাহিদা খাতুন (৩২) জানান, তিনি কুমারখালী থেকে দৌলতদিয়াঘাট পর্যন্ত ৪৫০ টাকা দিয়ে সিএনজিতে পৌঁছান। বাস চালু থাকলে ১০০ টাকা দিয়ে আসা সম্ভব ছিল। মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার টিএমএসএস সংস্থায় তিনি চাকরি করেন। ঈদ শেষে কর্মস্থলে যাচ্ছেন তিনি। মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলার আম্বলশা গ্রামের সোহাগ (৩০) জানান, তিনি অবদামোড় থেকে দৌলতদিয়াঘাট পর্যন্ত ২২০ টাকা দিয়ে গাদাগাদি করে দৌলতদিয়াঘাট পর্যন্ত পৌঁছান। ঢাকার বোম্বে সুইটস কোম্পানিতে তিনি চাকরি করেন। বেলা পৌনে ৩টার দিকে ভাষাসৈনিক গোলাম মওলা ফেরিযোগে দৌলতদিয়া থেকে পাটুরিয়া ঘাটের উদ্দেশে রওনা হন। করোনা আতঙ্ক থাকলেও পেটের দায়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন বলে তারা জানান।

advertisement