advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

‘ছাদ দেয়া ঘর লাগবে না বাড়ি ফিরে আয় বাপজান’

লিবিয়ায় নিহতদের বাড়ি বাড়ি শোকের মাতম

আমাদের সময় ডেস্ক
৩১ মে ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩১ মে ২০২০ ০৮:৫৫
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের তরুণ রাকিবুল ইসলাম রাকিবের মা মাহেরুন নেছা
advertisement

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের তরুণ রাকিবুল ইসলাম রাকিব (২০)। পড়তেন যশোর সরকারি সিটি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষে। কিন্তু দালালদের প্রলোভনে পড়ালেখা ছেড়ে বিদেশ পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। বাবার জমিজমা বিক্রি আর গচ্ছিত টাকায় লিবিয়ায় পৌঁছেন মাস চারেক আগে। যাওয়ার আগে বলে যান, দ্রুতই টাকা কামিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর পাশাপাশি মা-বাবাকে বানিয়ে দেবেন শখের দালানবাড়ি (বিল্ডিং); কিন্তু সেই আশায় গুড়েবালি। লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে

গত বৃহস্পতিবার মানবপাচারকারীদের গুলিতে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসী নির্মমভাবে খুন হন। তাদেরই একজন রাকিবুল। গতকাল শনিবার নিহত রাকিবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় ছেলে হারানো মায়ের বিলাপ। আদরের ছোট ছেলেকে হারিয়ে হতবিহব্বল বাবা ইসরাইল হোসেন। ছেলেকে শেষবারের মতো দেখার আকাক্সক্ষায় তাদের আহাজারি যেন কিছুতেই থামছে না। ছুটে এসেছেন এলাকার শত শত নারী-পুরুষ; কিন্তু এ দৃশ্য দেখে সবাই যেন সান্ত¦না দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলছেন।

মা মাহেরুন নেছা বিলাপ করে বলছেন- ‘আমাগের ছাদ দেয়া বাড়ি লাগবে না, টাকা-পয়সাও লাগবে না, বাজান তুই বাড়ি ফিরে আয়...।’ সাংবাদিকসহ উপস্থিত সবার হাত ধরে মানিকহারা মায়ের আর্তনাদ- ‘আমার সোনার (ছেলে) কিছু হইনি, ওরে আমার কাছে আনি দেন।’

নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, চার ভাইবোনের মধ্যে রাকিবুল সবার ছোট। দালালের মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ টাকায় তিনি লিবিয়ায় পৌঁছেন। এর পরই দালালচক্র গৃহযুদ্ধকবলিত দেশটির একটি শহরে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। গত ১৭ মে ওই চক্রটি পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুঠোফোনে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চায়। জিম্মিকারীরা ওই টাকা দুবাই থেকে নিতে চেয়েছিল। ছেলেকে প্রাণে বাঁচাতে বাধ্য হয়েই টাকা দিতে রাজি হন তারা। এ জন্য ১ জুন পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়। কিন্তু এরই মধ্যে রাকিবুলের লিবিয়া প্রবাসী চাচাতো ভাই ফিরোজ ফোন করে বলেন- ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে রাকিবুলও রয়েছে।

রাকিবুলের বাবা ইসরাইল হোসেন জানান, ফিরোজ লিবিয়া প্রবাসী। চার মাস আগে সে-ই লিবিয়ায় থাকা এক বাংলাদেশি দালাল আব্দুল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে সাড়ে চার লাখ টাকায় রাকিবুলকে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। তবে এ যাত্রাটাও ছিল অনেক কষ্টের। প্রথমে ভারত থেকে দুবাই, তার পর মিসর হয়ে রাকিবুলকে নেওয়া হয় লিবিয়ার ত্রিপুরায়। এর পর দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে নিয়ে রাকিবুলকে জিম্মি করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। একপর্যায়ে টাকা দিতে রাজি হওয়া শর্তেও মানবপাচারকারীদদের গুলিতে নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে রাকিব নিহত হয়। অথচ বিভিন্ন এনজিও এবং ভিটেবাড়ি বিক্রি করে মুক্তিপণের টাকা জোগাড় করা হয়েছিল।

এখন সরকারের কাছে বৃদ্ধ ইসরাইলের একটাই দাবি- আইনি প্রক্রিয়া শেষে দ্রুত সন্তানের মরাদেহ বাড়িতে এনে দেওয়া হোক। জীবিত ছেলেকে তো আর দেখতে পাবেন না! তার কবর দেখেই সান্ত¦না পেতে চান রাকিবের মা মাহেরুন নেছা।

পরিবারে একমাত্র উপার্জনকারী ছেলে ছিলেন লাল চাঁদ : লিবিয়ায় মানবপাচারকারীদের গুলিতে নিহত হতাহতদের মধ্যে মাগুরারও দুই যুবক রয়েছেন। তাদের বাড়ি মহম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুরের নারায়ণপুর গ্রামে বলে আমাদের মাগুরা প্রতিনিধি মোখলেছুর রহমানের পাঠানো প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এদের মধ্যে ইউসুফ মিয়ার ছেলে লাল চাঁদ (৩০) ছিলেন পরিবারের একমাত্রা উপার্জনক্ষম। মানবপাচারকারীদের গুলিতে তিনি গত বৃহস্পতিবার নিহত হয়েছেন। অপরজন একই গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে তারিকুল ইসলাম (২২)। ওই যুবক গুলিবিদ্ধ হলেও প্রাণে বেঁচে আছেন।

নিহত লাল চাঁদের বাবা ইউসুফ মিয়া জানান, আট মাস আগে ঢাকার হাজি কামাল নামে এক দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় যান লাল। এ জন্য স্থানীয় দালাল জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে সাড়ে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ঢাকার গুলশানে হাজি কামালের অফিস রয়েছে। তবে লিবিয়ায় নেওয়ার পর লাল চাঁদকে মিজদা শহরের একটি ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য বাড়িতে যোগাযোগ করত পাচারকারীরা। চলত নির্যাতনও। গত বুধবার মোবাইলে ভিডিও কলে সর্বশেষ কথা হয় লাল চাঁদের সঙ্গে। তখন তিনি জানান, পরদিন বৃহস্পতিবার মিজদাহ থেকে রাজধানী ত্রিপোলিতে পাঠানো হবে তাকে। কিন্তু ওইদিনই গুলিতে নিহত হন ওই হতভাগা, যে খবর পরদিন শুক্রবার লিবিয়ায় থাকা জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে জানতে পারে পরিবার।

তারিকুলের বাবা ফুল মিয়া জানান, তার ছেলেকেও একই দালালের মাধ্যমে লিবিয়ায় কাজের জন্য পাঠানো হয়। এ জন্য দিতে হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। কিন্তু লিবিয়া যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ নামে এক ব্যক্তির ক্যাম্পে আটকে রেখে মোবাইল ফোনে লাল চাঁদ ও তারিকুলের জন্য ১০ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কিন্তু তারা আড়াই লাখ টাকা দিতে পারবেন বলে জানান। এরই মধ্যে হতাহতের ঘটনা ঘটল। শুক্রবার রাতে ভিডিও কলে গুলিবিদ্ধ তারিকুলের সঙ্গে কথা হয় তার বাবার।

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম বলেন, ‘অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক জেলায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবাসীকল্যাণ শাখায় ভিসার যথার্থতা যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থা আছে। নিশ্চিত না হয়ে এ ধরনের বিদেশ গমন ও মর্মান্তিক মৃত্যু দুঃখজনক।’

‘ছেলেকে আমার বুকে ফিরায় দেও’ : পরিবারের অভাব মেটাতে ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র সুজন মৃধা গত জানুয়ারিতে লিবিয়ায় পাড়ি জমান। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার গোহালা ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামের কৃষক কাবুল মৃধার ছেলে তিনি। স্থানীয় মহাজন ও কৃষিজমি বন্ধক রেখে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকায় পাশের গ্রাম যাত্রাবাড়ীর রব মোড়লের মাধ্যমে সুজনকে পাঠানো হয়। কথা ছিল মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা। কিন্তু লিবিয়ায় যাওয়ার পর কোনো কাজই দেওয়া হয়নি। উল্টো মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে ১৭ দিন আগে মানবপাচারকারীদের হাতে তুলে দেয় দালালচক্র। পরে গত বুধবার সুজনের পরিবারের কাছে আরও ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ভয়েস কল পাঠানো হয়। আর সেই টাকা সোমালিয়ায় আহমেদ মোহাম্মদ আদম সালামের ব্যাংক হিসাবে পাঠাতে বলা হয়। তখন বাবা কাবুল মৃধা তাদের কাছে ১ জুন পর্যন্ত সময় চান। কিন্তু তার আগেই ওরা সুজনকে গুলি করে হত্যা করে।

নিহতের মা চায়না বেগম বিলাপের সুরে বলেন, ‘আমার ছেলেকে আমার বুকে ফিরায় দেও। আমার ছেলেকে দালালরা নিয়ে গিয়ে ১৭ দিন কোনো খাবার দেয়নি। মারপিট করেছে। পরে মুক্তিপণ চেয়ে গুলি করে মেরে ফেলেছে। আমি আমার সন্তানের লাশ চাই। দালালদের ফাঁসি চাই, যাতে তারা আর কোনো মায়ের কোল খালি করতে না পারে।’

একই গ্রামের কালাম শেখের ছেলে ওমর শেখ (২২) গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লিবিয়ার ত্রিপোলি হাসপাতালে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। পরিবারে একটু সচ্ছলতার জন্য ৪ লাখ ৫ হাজার টাকায় স্থানীয় দালাল লিয়াকত মোল্লার মাধ্যমে ছেলেকে লিবিয়া পাঠান কাঠুরী বাবা কালাম শেখ। ওই গ্রামের জয়নাল সরদার (৬৫), লিটন মৃধা (৪৫), আকিজুল ইসলাম বাবুল (৬৫) জানান, এই দালালচক্রের হাতে গোহালা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের আরও বেশ কিছু যুবক লিবিয়ায় বন্দি আছেন।

জেলা প্রশাসক শাহিদা সুলতানা বলেন, ‘আমরা বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ইউএনওকে পাঠানো হয়েছে হতাহতদের বাড়ি। আমরা দালাল চক্র ধরতে চেষ্টা চালাচ্ছি। এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’

মাদারীপুরেও শোকের মাতম : আমাদের মাদারীপুর প্রতিনিধি মাতুব্বর শফিক স্বপনের পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, লিবিয়ায় হতাহত ও নিখোঁজ বেশ কয়েক জনের বাড়ি এ জেলায়। সবার বাড়িতেই বইছে শোকের মাতম।

মাদারীপুরের ১৩ জন নিখোঁজ ও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ৪ জন। তবে প্রশাসন বলছে, ১১ জনের তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। এদেরই একজন রাজৈর উপজেলার রাজন্দী দারাদিয়া এলাকার নিখোঁজ আসাদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সন্তানের জন্য বিছানায় কাতরাচ্ছেন অসুস্থ বাবা। কেঁদে কেঁদে কিছুক্ষণ পর মূর্ছা যাচ্ছেন মা। শোকে পাথর বড় ভাই ও বোন।

এদিকে লিবিয়ায় হতাহতের ঘটনায় গত শুক্রবার দালাল জুলহাস শেখের বাড়িতে হামলা করে নিখোঁজ যুবকদের অভিভাবক ও এলাকাবাসী। খবর পেয়ে রাজৈর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। এ সময় দালাল জুলহাস নিজেকে করোনা রোগী দাবি করলে পুলিশ তাকে মাদারীপুর সদর হাসপাতালের   আইসোলেশন ওয়ার্ডে নিয়ে ভর্তি করে।

নিখোঁজ ১৩ জন হলেন- মাদারীপুর সদর উপজেলার জাকির হোসেন, সৈয়দুল, শামীম, জুয়েল ও ফিরুজ; রাজৈরের বিদ্যানন্দী গ্রামের রাজ্জাক হাওলাদারের ছেলে জুয়েল হাওলাদার (২২) ও শাহ আলম হাওলাদারের ছেলে মানিক হাওলাদার (২৮), টেকেরহাট এলাকার আয়নাল মোল্লা ও মনির, ইশবপুরের আড়াই পাড়ার আনজু বেপারীর ছেলে সজীব বেপারী (২৩) ও দক্ষিণ গোয়ালদি কালাম মাতুব্বরের ছেলে শাহীন মাতুব্বর (২৪), বদরপাশার রাজন্দীর দারাদিয়ার সিদ্দিক আকনের ছেলে আসাদুল আকন (১৭) ও আব্দুল খালেক খালাশীর ছেলে আব্দুর রহিম খালাসী (২৮)। বৃহস্পতিবারের ঘটনায় আহত হয়েছেনÑ রাজৈরের কদমবাড়ির মহিষমারী গ্রামের মোক্তার আলী শিকদারের ছেলে মোহাম্মদ আলী শিকদার (২২), ইশবপুরের আড়াইপাড়া গ্রামের খলিল খালাসীর ছেলে মো. সম্রাট খালাসী (২৯), বদরপাশার পাঠানকান্দি গ্রামের নারায়ণ চন্দ্র কায়েস্থের ছেলে সিতু কায়েস্থ বাপ্পী (২৫) ও সদর উপজেলার তীর বাগদি গ্রামের ফিরোজ বেপারী (২৫)। তারা লিবিয়ার ত্রিপোলি মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার কথা শুনেছি, যার মধ্যে মাদারীপুরের নিখোঁজ ১১ জনের তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের কাছে এসেছে। যারা মারা গেছেন তাদের লাশ সরকারিভাবে দেশে আনার ব্যবস্থা করা হবে।’

advertisement