advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কাজে ডুবে স্বাস্থ্যবিধি যাচ্ছেন ভুলে

৬৬ দিন পর খুলল অফিস

নিজস্ব প্রতিবেদক
১ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১ জুন ২০২০ ০৭:১৫
advertisement

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারার একটি দূতাবাসে কাজ করেন আকরামুল হাসান। থাকেন ওয়ারীতে। ২৬ মার্চ লকডাউনের পর গতকাল প্রথম অফিস করলেন। বাসা থেকে বের হয়ে ব্যক্তিগত গাড়িতে দূতাবাসে খুব সহজে এলেন, কোথাও যানজট ছিল না। মাস্ক পরে গাড়ি থেকে নেমে অফিস গেটে তার তাপমাত্রা মাপা হলো। তারপর নিজেকে জীবাণুমুক্ত করে ভেতরে প্রবেশ করলেন। অফিসের সবই ঠিক আছে। তিনি যে ডেস্কে কাজ করেন, তার ব্যবহৃত চেয়ার, কম্পিউটার কিংবা পানি খাওয়ার গ্লাস আগের মতোই।

কিন্তু এসব কিছু ‘ধরছেন’ সাবধানে। সবকিছু পুরনো, কিন্তু কোনো কিছ্ইু তার কাছে আগের মতো মনে হয়নি। যাই ধরছেন মনে হচ্ছে, তাতে ভাইরাস আছে। এমন আতঙ্কের সঙ্গে খাপ খেয়ে অনেকে প্রথমদিন অফিস করলেন ঠিকই, তবে ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন।

আমাদের সময়কে আকরাম বললেন, পুরোপুরি তাদের অফিসের কাজ শুরু হয়নি। সীমিত আকারে অফিস করছেন।

অফিস স্টাফদের ডিউটি রোস্টার করে দেওয়া হয়েছে। অফিসে শারীরিক দূরত্বও ছিল। যথারীতি কাজের গতির মধ্যে আটকে গেলেও স্বাভাবিক জীবনধারা মনে হয়নি। অফিসিয়াল কোনো কাগজ কিংবা অন্য যাই ধরছেন, মনে হচ্ছে এতেই ভাইরাস লুকিয়ে আছে।

অবশ্য, এই দূতাবাসের অফিসের চিত্র পুরো বাংলাদেশের চিত্র নয়। ঢাকাসহ সারাদেশে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির পর গতকাল রবিবার খুলছে সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি অফিস। কিন্তু সব জায়গায় সামাজিক দূরত্ব মানা হয়নি। অনেক অফিসের দিনের প্রথমে খুব সতর্কভাবে কাজ শুরু হলেও এক সময় কাজের মধ্যে ডুবে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি ভুলেই গেছেন। হঠাৎ করোনার বিষয়টি মাথায় এলে খানিকক্ষণ সাবধান হলেও কিছুক্ষণ পর আবার কাজের মাঝেই হারিয়ে যাচ্ছেন।

এই তো গেল অফিসের চিত্র। আর রাস্তাঘাটে গতকাল অন্য যে কোনো দিনের তুলনায় মানুষ এবং গাড়ির সংখ্যা বেশি থাকলেও তা স্বাভাবিক কর্মদিবসের মতো হয়নি। একে তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, তার ওপর ঈদের পর প্রথম কর্মদিবস। তবে রাজধানী ঢাকার সড়কে মানুষের চলাফেরার মধ্যে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার বিষয়টিও দেখা গেছে।

সরেজমিনে উত্তরা ও নয়াপল্টনের কয়েকটি শপিংমল, কমলাপুর ট্রেন স্টেশন, সদরঘাটের লঞ্চঘাট কিংবা অন্য দোকানপাটের যে চিত্র তাতে স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি মানতে দেখা যায়নি। আবার কাউকে তেমন অচেতনও মনে হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে সবার ব্যাখ্যা, করোনা থেকে বাঁচতে যেভাবে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, বাস্তবে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অফিস-আদালত কিংবা দোকানপাট খুলে ঢাকার মতো জনবহুল শহরে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি শুধু কাগজে-কলমেই সম্ভব।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আজ সোমবার থেকে গণপরিবহন চলবে। মানুষের যাতায়াতও বাড়তে থাকবে। তখনই স্বাস্থ্যবিধি মানার মূল চ্যালেঞ্জ শুরু হবে। গতকালকের চিত্র দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে না। লকডাউন প্রত্যাহার করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ কাগজে-কলমে সম্ভব। তিনি বলেন, করোনা আতঙ্ক মানুষের মাঝে কমতে শুরু করেছে। এটি একদিকে বিপজ্জনক। কারণ, এ কারণে অনেকে অচেতন হয়ে পড়বে। এতে সংক্রমণ বাড়তে থাকবে।

যাতায়াতের ক্ষেত্রে পরিবহন নিয়ে কিছুটা সমস্যা হলেও সড়কে যানজট না থাকায় কর্মস্থলে যেতে পেরেছেন কম সময়ে। তবে অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ ছিল বেশি। অনেকেই রিকশা, সিএনজিচালিত ও অটোরিকশায় করে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে অফিস করতে হয়েছে। কারণ, গণপরিবহনের চাকা আজ ঘোরেনি।

বাংলামোটরে একটি অফিসে কাজ করেন রিদিমা নাহার। তিনি জানান, তার অফিসে গতকাল প্রায় শতভাগ উপস্থিতি ছিল। অফিসে বসার জন্য সবার পৃথক ডেস্ক থাকলেও তাতে ৩ ফিট দূরত্ব নেই। কাজের জন্য প্রতিনিয়ত এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে যেতে হয়। অফিসের ভেতরে চলাফেরার এবং অফিসিয়াল কথাবার্তার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিংবা সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ছিল।

অফিসগামী ও অফিসফেরত কর্মজীবীরা গতকাল কিছুটা নির্বিঘেœ এলেও পরিস্থিতি কাল থেকে পাল্টে যেতে পারে। এমনই ধারণা অনেকের ভেতর। আর চিরচেনা যানজটে পড়লে অবস্থা কী হবে, তা নিয়েই বেশি চিন্তিত তারা।

এদিন প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়েরই অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন। তারা মাস্ক পরিধানসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অফিস করেছেন। কর্মকর্তাদের মধ্যেই সচেতনতা বেশি দেখা গেছে। সচিবালয়ের প্রবেশমুখে সবাইকে থার্মাল স্ক্যানারে তাপমাত্রা মেপেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, সকাল থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবালয়ে প্রবেশ করতে শুরু করেন। তবে দর্শনার্থীদের এখনো প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। লকডাউনের শুরু হওয়ার আগে থেকেই দর্শনার্থী প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল সরকার। সেটি এখনো বহাল আছে।

সচিবালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার রাজীব ঘোষ বলেন, যারা সচিবালয়ে হেঁটে প্রবেশ করছেন, তাদের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারেননি।

তবে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে কী আর সব কাজ হয় ভাই? দেখতেই তো পাচ্ছেন কীভাবে কাজ করছি। এইভাবেই কাজ করতে হবে। কিছুই করার নেই। কাজের চাপে সব সময় কী মনে থাকে করোনা ভাইরাসের যুগ চলছে।’

করোনা ভাইরাসের মহামারীর বিস্তারের মধ্যেই সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল দুই মাস পর ফের শুরু হয়েছে। রবিবার আট জোড়া ট্রেন সূচি অনুযায়ী চলাচল শুরু করেছে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী অনলাইনে টিকেট বিক্রির মাধ্যমে ট্রেনগুলো ধারণক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল শুরু করেছে।

গতকাল প্রথমদিনে যাত্রীসহ সবার মুখে মাস্ক পরিধান করতে দেখা যায়। যাত্রীদের স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে ট্রেনে প্রবেশ করানো হয়েছে। তবে ট্রেনের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব খুব ছিল না। তাড়াহুড়ো করে ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনের প্রবেশের চিত্রও দেখা গেছে।

ঢাকা সদরঘাটে ছয়টি ‘জীবাণুনাশক টানেল’ বসানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ১৪টি জীবাণুনাশক টানেল বসানো হবে। গতকাল স্বাস্থ্য ও নৌবিধি মেনে ঢাকা সদরঘাট থেকে চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন রুটে অন্তত ২০টি লঞ্চ ছেড়ে গেছে। এই ছিল দুপুর পর্যন্ত পরিস্থিতি।

গতকাল দুপুরে সদরঘাটে যান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, কাজ না থাকলে ঢাকামুখী হওয়ার দরকার নেই। আপনাদের-আমাদের সকলের করোনা ঝুঁকি রয়েছে। ঢাকা সদরঘাটে ‘জীবাণুনাশক টানেল’ বসানো হয়েছে, শুধু ঢাকা সদরঘাট নয়, অন্যান্য বন্দরেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এ দিকে রাজধানীর টিকাটুলি, নিউমার্কেট, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ি ও শনির আখড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা মানুষের মাঝে বাড়লেও সব জায়গায় একই চিত্র দেখা যায়নি। এদিন বেশকিছু মার্কেট, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্যের দোকান ও ছোট ফ্যাশন হাউজগুলো খুলছে। যেসব মার্কেট এখনো খোলেনি সেগুলোতেও দেখা গেছে প্রস্তুতির ব্যস্ততা।

ঈদ বাজারে বেশিরভাগ মার্কেট খুললেও বন্ধ রাখা হয় রাজধানীর বৃহত্তম মার্কেট বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স, যমুনা ফিউচার পার্ক ও ঢাকা নিউমার্কেট। এবারও বসুন্ধরা ও যমুনা গ্রুপ তাদের মার্কেট খোলার ঘোষণা দেয়নি। তবে নিউমার্কেট খুলেছে। রবিবার সকাল থেকে খোলা হয় মার্কেটটি। তবে ক্রেতার সংখ্যা ছিল খুবই কম।

advertisement