advertisement
advertisement

মাত্রাতিরিক্ত ভাড়ার চাপে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা

বাস-ট্রেনে যাত্রী কম # লঞ্চে সুরক্ষার বালাই নেই

তাওহীদুল ইসলাম
২ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুন ২০২০ ১১:২৭
রাজধানী বেড়েছে গণপরিবহনের ভাড়া, ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। সংগৃহীত ছবি
advertisement

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ২৬ মার্চ থেকে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে সরকার। এ ছুটির আওতায় গণপরিবহনও ছিল বন্ধ। সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী টানা ৬৬ দিন পর গতকাল থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নেওয়ার শর্তে ফের শুরু হয়েছে বাস-মিনিবাস চলাচল। এরও একদিন আগে থেকে শুরু হয়েছে ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল।

এমন একটি সময়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে সাধারণ যান চলাচল শুরু হলো, যখন দেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি নয় বরং আরও অবনতি ঘটছে। এ নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগের ক্ষেত্রে সরকার বলছে, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা তথা সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করোনার বিস্তার রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শর্তেই গণপরিবহন চলবে। কিন্তু সেই স্বাস্থ্যবিধি কতটা মানা হচ্ছে? এ ক্ষেত্রে নৌপথের বাস্তব চিত্র খুবই উদ্বেগজনক। সড়কপথে রাজধানীর চিত্র অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক হলেও এর বাইরের অবস্থা নাজুক। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ঝুঁকি। একমাত্র ট্রেনই চলছে স্বাস্থ্যবিধি যথাসম্ভব মেনে।

এদিকে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে বাড়তি ভাড়ার চাপ। এ চাপে পিষ্ট হতে হচ্ছে পথে বের হওয়া সাধারণ মানুষকে। উপার্জন বন্ধ থাকা মানুষগুলোর অনেকেই জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে গুনেছেন অতিরিক্ত এমনকি দ্বিগুণ বা তারও বেশি ভাড়া। দূরপাল্লার যানবাহনেও একই দশা।

এ নিয়ে যাত্রীদের বিস্তর অভিযোগ। এ ক্ষেত্রে পরিবহনকর্মীদের যুক্তি, আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম আদায় করা হতো। এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে ৬০ শতাংশ যোগ করায় বলা হচ্ছে দ্বিগুণ আদায় করা হয়।

অন্যদিকে, গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গতকাল হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চে রিট করা হয়েছে। এতে ভাড়া বৃদ্ধির ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে।

সাধারণ মানুষের স্বার্থে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া বাতিলের দাবি জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে সেবামূলক সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনও।

ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্টপেজ ও বাস টার্মিনাল ঘুরে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার চেষ্টা চোখে পড়েছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে কম সতর্কতা ছিল। তবে সর্বত্র বাড়তি ভাড়ার চাপ ছিল। উপার্জন বন্ধ থাকা মানুষগুলো জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন বিপাকে। গুনেছেন অতিরিক্ত ভাড়া।

গতকাল সকাল থেকেই রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যাত্রী চাপ তুলনামূলক কম। কোনো স্টপেজে বাস থামার পর সতর্কতার সঙ্গেই যাত্রী তোলা হচ্ছিল। বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও হেলপারের কাছে মাস্ক, গ্লাভস ছিল। যাত্রীরাও মুখে মাস্ক ব্যবহার করে । যাত্রীরা গাড়িতে ওঠার সময় তাদের হাতে জীবানুনাশক স্প্রে করতে দেখা যায় অনেক শ্রমিককে। গতকালের যান চলাচলের হার ছিল তুলামূলক কম। যাত্রী সংখ্যাও স্বাভাবিক সময়ের মতো দেখা যায়নি। একাধিক বাসে চড়ে দেখা যায়, এক সিট ফাঁকা রেখেই যাত্রীদের বসানো হয়েছে। সে হিসাবে সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল কম। তবে টিকিট সংগ্রহের সময় কাউন্টারে গাদাগাদি করে দাঁড়ানোর দৃশ্য চোখে পড়ে। স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় অনেক স্টপেজে দেখা গেছে সেই পুরনো দৃশ্যÑ ছেড়ে যাওয়া বাসের পেছনে ছুটছেন যাত্রীদের কেউ কেউ; স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লাফিয়ে উঠছেন চলতি বাসে।

গণপরিবহন চালুর প্রথম দিন বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল বিস্তর। নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেক যাত্রী বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। ঢাকার শেওড়াপাড়া থেকে মিরপুরে শাহআলী মাকের্টের সামনে অন্য সময়ের ৫ টাকার ভাড়া এবার নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। মিরপুর থেকে ফার্মগেট আগে ছিল ১৫ টাকা এখন তা ২৫ টাকা। আবার মোহাম্মদপুর থেকে গুলিস্তানের ভাড়া এখন নেওয়া হচ্ছে ৩২ টাকা আগে ছিল ২০ টাকা। আবার বাসে যে একই হারে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে এমনটি নয়। একই গন্তব্যে ভাড়া ৮০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি নেওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। মিরপুর থেকে গুলশান ৪০ টাকা নেওয়া হয় আগে ছিল তা ২৫ টাকা। কিছু বাসে এ ভাড়া ৫০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ মেলে। মিরপুর ১৩ নম্বর থেকে ১ নম্বরে অন্য সময়ে যেতেন ১০ টাকায়। এবার সেই ভাড়া হয়ে গেছে ৩০ টাকা। হানিফ নামের ৪০ বছরের এই শ্রমিক মিরপুরে মূলত কুলির কাজ করেন। বাজারের পণ্য ওঠানামার কাজ করেই চলে তার সংসার। বাড়তি ভাড়ায় তার ওপর বাড়তি চাপ বলে কষ্টের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি। অবশ্য এ নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদেরও বক্তব্য আছে নিজেদের মতো করে। প্রথম কথা, ভাড়ার কোনো চার্ট তৈরি হয়নি। ফলে ইচ্ছামতো আদায় করা যাচ্ছে। তা ছাড়া তুলনামূলক যাত্রী কম হওয়ায় ভাড়া বেশি আদায়ের যুক্তি দেখান বিকল্প পরিবহনের কন্ডাক্টর আনিস।

গতকাল বিআরটিএর চেয়ারম্যান ইউসুব আলী মোল্লার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিআরটিএর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা পৃথকভাবে রাজধানীর বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখেছেন। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গাড়ি চলছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি আমাদের সময়কে জানান, বিআরটিএর মোবাইলকোর্ট ছিল মাঠে। তারা পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করছেন এবং ব্যবস্থা নিচ্ছেন। মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সবাই চেষ্টা করছে।

সরেজমিনে গতকাল নগরীর ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আসাদগেট, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, ফার্মগেট, এলাকায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে গণপরিবহন চলতে দেখা গেছে। এ সময় গাড়ির চালক ও সহকারীদের জীবাণু প্রতিরোধক হেড কাভার, গ্লাভস, মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে দেখা গেছে। পরিবহনগুলোতে ওঠানামা এবং ভাড়া আদান-প্রদানের আগে ও পরে বাস সহকারীর হাতে থাকা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করতেও দেখা গেছে যাত্রী, চালক ও সহকারীদের। ভাড়া বেশি হলেও যাত্রাপথে কোনো ধরনের অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে দেখা যায়নি। ফার্মগেট এলাকায় কথা হয় ট্রাস্ট পরিবহনের বাস চালকের সঙ্গে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিজেদের সাধ্যমতো স্বাস্থ্যবিধি ও আরোপিত নির্দেশনা মেনেই রাস্তায় বাস নামিয়েছেন তারা। এ ছাড়া শহরে যথারিতি ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা, অটোরিকশা ও মোটরবাইক চলাচল করতে দেখা গেছে।

দূরপাল্লার রুটেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ আছে। রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কুমিল্লা, কোম্পানিগঞ্জ রুটের ভাড়া ছিল ১৮০-২০০ টাকা। এখন আদায় করা হচ্ছে ৪০০ টাকা। কল্যাণপুর থেকে কুষ্টিয়া রুটে আগে ভাড়া ছিল ৪০০-৪৫০ টাকা, এখন ৮০০ টাকা। একইভাবে সব রুটের ভাড়া বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবহন কর্মীদের যুক্তি, আগে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও কম আদায় করা হতো। এখন সরকার নির্ধারিত ভাড়ার সঙ্গে ৬০ শতাংশ যোগ করায় বলা হচ্ছে দ্বিগুণ আদায় করা হয়। তবে যানবাহনে অফিসমুখী যাত্রী ছাড়া সাধারণ যাত্রীদের চাপ নেই বলে জানিয়েছেন পরিবহনের চালক ও হেলপাররা (সহকারী)।

বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান খান আমাদের সময়কে বলেন, ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তটি অনেকের জন্য অসুবিধার। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষের বাসে চড়াও এখন কঠিন হয়ে গেল। যেসব যাত্রী বাসে চড়ে কর্মস্থলে যায়, তাদের একটা অংশ শ্রমিক। বাড়তি ভাড়ার চাপ নেওয়া তাদের জন্য কঠিন। এমনিতেই করোনার কারণে তাদের সংসারে অনটন বেড়েছে।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সর্বাগ্রে ট্রেন, উল্টোপথে লঞ্চ

গতকাল ছিল ট্রেন চলাচলের দ্বিতীয় দিন। অনলাইনে টিকিট প্রাপ্তিতে দুর্ভোগের অভিযোগ ছিল। তবে সামাজিক সুরক্ষা মানার ব্যাপারে রেল ছিল সর্বাগ্রে। বনলতা এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস, পঞ্চগড়, লালমনি এক্সপ্রেস, সোনারবাংলা, সুবর্ণ, কালনী উদয়ন এক্সপ্রেস চলছে। ৩ জুন থেকে ট্রেন আরও বাড়বে। যাত্রীদের ট্রেনে ওঠা থেকে শুরু করে স্টেশনে প্রবেশ, প্লাটফরমে অপেক্ষা সর্বত্র চিল সতর্কতা। জীবানুনাশক ছিটানো, মাস্ক, গ্লাভস ব্যবহারে সবাইকে আগ্রহী করতে তৎপর ছিলেন রেল কর্মকর্তারা। ট্রেনের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারেও সজাগ থাকতে দেখা যায়। তবে কিছু যাত্রীকে দেখা যায় মাস্ক থাকা সত্ত্বেও খুলে রাখতে।

গতকাল দুপুরে সদরঘাটে গিয়ে দেখা যায় বিকালের লঞ্চ ধরতে মানুষ দলে দলে টার্মিনালের দিকে হেঁটে চলেছে। তাদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব দূরে থাক করোনা আক্রান্ত হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে কোনো বিধিই মানা হচ্ছে না। বেশিরভাগেরই মাস্ক থাকলেও সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করতে দেখা যায়নি। যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। লঞ্চের ভেতরে গাদাগাদি করে মানুষ। ভেতরের অবস্থা দেখলে মনে হবে ঈদযাত্রা। সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় লঞ্চ কম, তাই ভিড়। কিন্তু তারা এটি বলছেন না; যাত্রীদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোথাও যেতে নিষেধ করা হচ্ছে। সরকারের সতর্কবার্তা এসব মানুষ গা করছেন বলে মনে হয়নি।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো প্রতিবেদন :

ভাড়া বেশি হওয়ায় রাজশাহীতে যাত্রীদের আগ্রহ নেই বাসে

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেশের অন্যান্য স্থানের মতো বিভাগীয় শহর রাজশাহীতেও গতকাল থেকে শুরু হয়েছে বাস চলাচল। রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল বাস টার্মিনাল থেকে দুই মাস পর ছেড়ে গেছে দূরপাল্লার বাস। তবে বাড়তি ভাড়ার কারণে বাসযাত্রায় তেমন আগ্রহ নেই সাধারণ যাত্রীদের। নেহাত জরুরি কাজ ছাড়া কেউই বাসে যেতে চাচ্ছেন না। নিরাপদ ভ্রমণ ও বাড়তি ভাড়ার কোনো ঝামেলা না থাকায় ভরসার একমাত্র বাহন হিসেবে এখনো ট্রেনই বেছে নিচ্ছেন সবাই।

মহানগরীর নওদাপাড়া কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে চলাচল শুরু করেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট রুটের আন্তঃজেলা বাস সার্ভিস।

রাজশাহীতে সোমবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে বাস চলাচল

সোমবার সকালে রাজশাহী মহানগরীর ‘ঢাকা বাস বাসস্ট্যান্ড’ খ্যাত শিরোইল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাস কাউন্টার ও যাত্রীবাহী বাসের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। প্রতিটি টিকিট কাউন্টারের প্রবেশ মুখেই জীবাণুনাশক পাদানি, স্প্রে ও হ্যান্ড সেনিটাইজেশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বাস ছাড়ার আগে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে সিট ও হাতল জীবাণুমুক্ত করতে দেখা গেছে। হ্যান্ড থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে যাত্রীদের শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করে বাসের মধ্যে প্রবেশ করানো হচ্ছে। একটি সিট ফাঁকা রেখে আরেকটি সিটে যাত্রী বসানো হয়েছে।

বাড়তি বাস ভাড়া নিয়ে চরম আপত্তি দেখা গেছে যাত্রীদের মধ্যে। মহানগরীর ভদ্রা ও রেলগেট বাসস্টপ এলাকায় গিয়ে বাস ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও বাসের সুপারভাইজারের সঙ্গে বিতর্কে জড়াতে দেখা গেছে।

সিলেট থেকে ছাড়ল দূরপাল্লার বাস

সিলেট ব্যুরোর পাঠানো খবরে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ৬৬ দিন বন্ধ থাকার পর গতকাল সিলেট থেকে ছেড়েছে দূরপাল্লার বাস। এদিন সকাল থেকেই সিলেটে পরিবহন চলাচল শুরু হয়। তবে বাসের ভেতর শারীরিক দূরত্ব কিছুটা থাকলেও বাস টার্মিনালে মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। শারীরিক দূরত্ব তো দূরের কথা, মানুষের ব্যাপক ভিড়।

দক্ষিণ সুরমার টার্মিনাল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রথম দিন হওয়ায় অনেক গণপরিবহনই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রী তুলছে। তবে গাড়ির ভেতর অনেক যাত্রীরই মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস নেই। স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই গাড়িতে উঠছে যাত্রীরা।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, প্রথম দিন স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে। পরে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বগুড়ায় স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই বাস চলাচল শুরু

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া জানান, গতকাল সকাল থেকে বগুড়ায় দূরপাল্লার, অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃজেলা বাস চলাচল শুরু হয়েছে। ঢাকার পথে সীমিতসংখ্যক দূরপাল্লার কোচ চলাচল শুরু হলেও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।

শহরের সাতমাথা এবং ঠনঠনিয়া কোচ টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, এসআর ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ পরিবহন, শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, নাবিল পরিবহন, আগমনী পরিবহনসহ অধিকাংশ দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার বন্ধ। সকালের দিকে মানিক এন্টারপ্রাইজের দুটি এসি হুন্দাই বাস, টিআর ট্রাভেলস, আরকে ট্রাভেলসসহ কয়েকটি কোম্পানির নন-এসি বাস ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। যাত্রী ওঠানোর আগে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও জীবাণুনাশক ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও তা অনেকটা উপেক্ষিত। যাত্রীদের কাছেও ছিল না স্যানিটাইজার।

সোমবার সকালে শহরের সাতমাথা থেকে ছেড়ে গেছে বগুড়া-ময়মনসিংহ, বগুড়া-রাজশাহী, বগুড়া-রংপুর, বগুড়া-জয়পুরহাট, বগুড়া-শেরপুর রুটের বেশ কিছু বাস। এসব বাসে যাত্রী তোলার আগে কোনো স্যানিটাইজার বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হয়নি। ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে যাত্রীও ছিল কম।

বগুড়া জেলা মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক ও পৌরসভার প্যানেল মেয়র আমিনুল ইসলাম জানান, সরকারি নির্দেশনা মেনে স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী বগুড়ার সব রুটে বাস চলাচল করছে। সব যাত্রীকে মাস্ক পরতে বলা হচ্ছে। যাত্রী উঠানোর সময় জীবাণুনাশক স্প্রে করা হচ্ছে। প্রত্যেক বাস কাউন্টার ও চেইন মাস্টাররা পিপিইসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করছে। বাসের চালক, হেলপার, সুপারভাইজাররা মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করছে।

বগুড়া জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ জানান, তিনি টার্মিনাল পরিদর্শন করে মালিক-শ্রমিক ও বাসের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাসগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী উঠানো হচ্ছে। প্রথমদিনে বগুড়া থেকে যাতায়াতকারী বাসগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করছে। তবে যদি কেউ সরকারি নির্দেশনা না মানে সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।

এ ছাড়া রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, জেলায় দীর্ঘদিন পর সোমবার সকাল থেকে যাত্রীবাহী বাস চালু হয়েছে। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী দেখা যায়নি। লোকাল বাসে গোয়ালন্দ মোড় হতে রাজবাড়ী পর্যন্ত পূর্বে ১৫ টাকা ভাড়া ছিল। সরকার ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করিলেও ১৫ টাকার স্থলে ৩০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানান। ছোটগাড়ী টেম্পো (মাহিন্দ্র) ১০ সিটের ১৫ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। সড়কে যাত্রীদের তেমন চাপ দেখা যায়নি। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের ২১টি জেলা থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহীবাস দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরি স্বল্পতার কারণে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ছোট-বড় ১৩টি ফেরি দিয়ে যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। যাত্রী কম থাকায় দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া লঞ্চ ও ধীরগতিতে চলছে।

পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, সরকারের নির্দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশের ন্যায় পঞ্চগড়েও সোমবার থেকে গণপরিবহন চালু হয়েছে। পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে। যানবাহন চালুর প্রথম দিন হওয়ায় যাত্রীর সংখ্যা কম লক্ষ্য করা গেছে।

পঞ্চগড় জেলা পুলিশ পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ প্রত্যেকটি উপজেলার বাসস্ট্যান্ডগুলোতে পুলিশি চেক পোস্ট বসিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী ওঠানামার তদারকি করছেন। রাস্তায় চলাচল যানবাহন, মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারীদের মাক্স ব্যবহারে বাধ্য করছেন। তবে অভ্যন্তরীণ রুটে ভাড়ায়চালিত সিঅ্যান্ডজি, ত্রিহুইলার, অটোচার্জার, ভ্যান যাত্রীদের স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা নেই বললেই চলে। এসব বাহনে গাদাগাদি করে মানুষজন চলাচল করছে। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ সম্পর্কে ধারণা থাকলেও অধিকাংশ মানুষ অবহেলা করে স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা দেখা গেছে।

বিধি না মানলে ফের কঠিন সিদ্ধান্ত : সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেছেন হুড়োহুড়ি, বাড়তি যাত্রী বহন, স্বাস্থ্যবিধি না মানা হলে দেশ আরও সংকটে নিমজ্জিত হতে পারে। পরিস্থিতির যদি আরও অবনতি হয়, তাহলে জনস্বার্থে সরকার আবারও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সরকারের দেওয়া শর্ত পালন সাপেক্ষে পরিবহন চলছে। অতিরিক্ত যাত্রী না হতে সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করেছেন মন্ত্রী। এ ছাড়া পরিবহন খাতের মালিক ও শ্রমিকদের মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের অনুরোধ করেছেন তিনি। অর্ধেক আসন খালি রেখে গাড়ি চালনার শর্তের কারণে সরকার ভাড়াও সমন্বয় করেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ১১টি বিষয় উল্লেখ আছে। এর মধ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয় স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক দূরত্ব ও শারীরিক দূরত্ব কঠোরভাবে মানার। বলা হয়, বাস টার্মিনালে কোনোভাবেই ভিড় করা যাবে না। তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীরা গাড়ির জন্য লাইনে দাঁড়াবেন এবং টিকিট কাটবেন। স্টেশনে পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাসে কোনো যাত্রী দাঁড়িয়ে যেতে পারবে না। বাসের সব সিটে যাত্রী নেওয়া যাবে না। ৫০ শতাংশ সিট খালি রাখতে হবে। পরিবারের সদস্য হলে পাশের সিটে বসানো যাবে অন্যথায় নয়। যাত্রী, চালক, সহকারী, কাউন্টারের কর্মী সবার জন্য মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক। ট্রিপের শুরুতে এবং শেষে বাধ্যতামূলকভাবে গাড়ির অভ্যন্তরভাগসহ পুরো গাড়িতে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে হবে। যাত্রী ওঠানামার সময় শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে হবে। চালক, কন্ডাক্টদের ডিউটি একটানা দেওয়া যাবে না। তাদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোয়ারেন্টিন বা রেস্ট দিতে হবে।

ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট

গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করে জারি করা প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে। গতকাল সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি জেবিএম হাসানের একক ভার্চুয়াল বেঞ্চে জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ূন কবির পল্লব।

রিট আবেদনে ভাড়া বৃদ্ধির ওই প্রজ্ঞাপনের কার্যকারিতা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনটি কেন অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না তা জানতে রুল জারির আবেদন জানানো হয়েছে। আবেদনে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট করার পর আইনজীবী পল্লব জানান, বিচারপতি জেবিএম হাসানের নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল বেঞ্চে আজ মঙ্গলবার এ রিটের শুনানি হতে পারে। তিনি বলেন, ৬০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক। এটা সাধারণ মানুষের ওপর একটি নিপীড়নমূলক সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্ত বৈষম্যমূলকও। এ কারণে জনস্বার্থে রিটটি করা হয়েছে।

আইনজীবী হুমায়ূন কবির পল্লব আরও জানান, যাদের প্রাইভেটকার নেই সেই সব নি¤œ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ গণপরিবহনে দেশের সাধারণ মানুষ যাতায়াত করে। অন্যদিকে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবায় নি¤œ ও মধ্যম আয়ের মানুষের অধিকাংশ কর্মহীন হয়ে বেকার এবং মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ অবস্থায় ৬০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি অসহায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে আরও বেশি বিপর্যস্ত ও হতাশাগ্রস্ত করেছে। এ কারণে প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত চাওয়া হয়েছে। এদিকে প্রজ্ঞাপনটি স্থগিত চেয়ে গতকাল সোমবার সরকারকে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আরেক আইনজীবী মনিরুজ্জামান লিংকন। এর আগে রবিবার গণপরিবহনের ভাড়া ৬০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

জনস্বার্থে বর্ধিত বাস ভাড়া বাতিলের দাবি রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের

সাধারণ মানুষের স্বার্থে গণপরিবহনে ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া বাতিল করে পূর্বের ভাড়া চালুর জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গতকাল সংগঠনের পক্ষ থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, সরকার গণপরিবহন মালিক এবং কিছু শ্রমিক নেতার স্বার্থরক্ষায় অযৌক্তিভাবে বাস ভাড়া ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। এই বর্ধিত ভাড়া করোনা মহামারীতে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত নি¤œ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে।

তিনি বলেন, দেশে গণপরিবহন যাত্রীর সংখ্যা, মালিক-শ্রমিকদের মানসিকতা, রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দুর্নীতি ও দুর্বলতার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে গণপরিবহন চালানোর সিদ্ধান্ত অবাস্তব এবং এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া অনেকটা প্রতারণার শামিল, যার প্রমাণ আজকেই বিভিন্ন সড়কে দেখা গেছে। যে অল্প কয়েকটি বাস-মিনিবাস সড়কে চলেছে, তার অধিকাংশই স্বাস্থ্যবিধি মানেনি। সব আসন পূর্ণ করে এমনকি দাঁড়ানো যাত্রীও বহন করেছে। অথচ বর্ধিত যাত্রীভাড়া ঠিকই আদায় করা হয়েছে। আগামীতেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

advertisement