advertisement
advertisement

আক্রান্তের হারে ভয়ঙ্কর বার্তা

আহমদুল হাসান আসিক
২ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ২ জুন ২০২০ ১২:১৯
প্রতীকী ছবি
advertisement

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তে দেশে গত ১৮ দিনে নমুনা পরীক্ষা বেড়ে এখন দ্বিগুণের চেয়েও বেশি। এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে আড়াই গুণেরও বেশি। নমুনা পরীক্ষা যত বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যাও তত বেশি জানা যাচ্ছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে নমুনা পরীক্ষা খুবই কম ছিল। এখন প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হলেও সেটি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছেনি। এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে বিশে^ বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় তৃতীয়। তবে আক্রান্তের শীর্ষ ২৫ দেশের মধ্যে জনসংখ্যার ভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান এখনো তলানিতে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখে ৩০১ জন, পাকিস্তানে ৩১৭ জন এবং ভারতে ১৩৯ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। তবে গত ১৪ দিনে প্রতি ১০ লাখে বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৫৬ জন, ভারতে ৬৯ এবং পাকিস্তানে ১৩৮ জন।

গতকাল সোমবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নমুনা পরীক্ষা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত শনাক্তের যে ঊর্ধ্বমুখী চিত্র তা সামনের দিনগুলোতে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির বার্তা দিচ্ছে। নমুনা পরীক্ষা ও কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ে শুরু থেকেই দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এখন গণপরিবহনের পাশাপাশি সব ধরনের অফিস খুলে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আক্রান্তের দিক থেকে দুই শীর্ষ দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে নমুনা পরীক্ষায় অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। তবে নমুনা পরীক্ষায় ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে রোগী শনাক্ত হচ্ছে বেশি। গত ১৪ দিনে পরিস্থিতি আরও বেশি অবনতি হয়েছে বাংলাদেশে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আমাদের সময়কে বলেন, পরীক্ষার আওতা বাড়ানো উচিত। আক্রান্তের যে সংখ্যা আমাদের সামনে আছে সেটি হচ্ছে নমুনা পরীক্ষার ভিত্তিতে সংক্রমণের চিত্র। কিন্তু এটি প্রকৃত আক্রান্তের হার নয়। পরীক্ষা বাড়লেই সংক্রমণের হার বেশি দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হলো অনেক সংক্রমিত লোক সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, যারা শনাক্ত হয়নি। তারা অন্যদের সংক্রমিত করছে এবং সংক্রমণ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নমুনা দেওয়ার পর ফল পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফল পাওয়া পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীদের আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে নেওয়া হচ্ছে না। তারাও তো সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। এর অর্থ হলো সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছেই।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুর রহমান খান বলেন, ল্যাবের সামর্থ্য অনুযায়ী নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আগে আইইডিসিআরের একটি ল্যাবে পরীক্ষা হতো। এখন নতুন নতুন ল্যাব তৈরি করে পরীক্ষার আওতা বাড়ানো হচ্ছে। শুধু ল্যাব বাড়ালেই তো হচ্ছে না, তার সঙ্গে উপযুক্ত জনবল প্রয়োজন হয়। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী নমুনা পরীক্ষার আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।

দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ তিন দেশের পরিস্থিতি

আইইডিসিআর, ডব্লিউএইচও ও ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এক হাজার ৯৫১ জনের। এই সংখ্যা ভারতে দুই হাজার ৭৮৩ এবং পাকিস্তানে দুই হাজার ৫৪৫ জন। তবে গত ১৪ দিনে (১৯ মে থেকে ১ জুন) জনসংখ্যার ভিত্তিতে নমুনা পরীক্ষায় পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য এগিয়েছে বাংলাদেশ। এই ১৪ দিনে প্রতি ১০ লাখের মধ্যে বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৮২১ জনের। ভারতে এক হাজার ১১৩ এবং পাকিস্তানে ৭৮৮ জন।

আবার নমুনা পরীক্ষায় রোগী শনাক্তের হার ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি। প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবশেষ ১৪ দিনে বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক লাখ ৩৫ হাজার ১৭৩টি এবং রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৫ হাজার ৬৬০ জন। এই হিসেবে রোগী শনাক্ত হয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। গতকাল পর্যন্ত প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় ভারতে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১২ দশমিক ৯১ শতাংশ। আর সবশেষ ১৪ দিনে ভারতে নমুনা পরীক্ষার শতকরা ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং পাকিস্তানে ১৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে।

নমুনা পরীক্ষায় তলানিতে

ওয়ার্ল্ডোমিটার বলছে, করোনা সংক্রমণের সংখ্যার দিক থেকে শীর্ষ ২৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২১ নম্বরে। কিন্তু নমুনা পরীক্ষার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। গতকাল পর্যন্ত প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে বাংলাদেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক হাজার ৯৫১ জনের। এই ২৫ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়া কোনো দেশই প্রতি ১০ লাখের মধ্যে দুই হাজারের কম নমুনা পরীক্ষা করেনি। তবে জনসংখ্যার ভিত্তিতে আক্রান্তের হার বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৩ নম্বরে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে শীর্ষ ২৫ দেশের মধ্যে চীন ও ভারতে আক্রান্তের হার সবচেয়ে কম। এরপরই বাংলাদেশের অবস্থান।

আইইডিসিআর বলছে, গত এপ্রিলে দেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৬৩ হাজার ৬৪ জনের। মে মাসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৯৭ হাজার ৬৫৪ জনে। অর্থাৎ, নমুনা পরীক্ষা বেড়েছে সাড়ে চার গুণেরও বেশি।

advertisement