advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষায় মিলবে দেশের সঠিক চিত্র
আক্রান্তের সর্বোচ্চ পর্যায়

হাসান শিপলু ও নজরুল ইসলাম
৩ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৩ জুন ২০২০ ০৯:০১
দেশে বেড়েই চলেছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা
advertisement

সপ্তাহ দু-এক ধরে দেশে গড়ে ২০ শতাংশের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ এ সময়ে প্রতি ১০০ জনে ২০ জনের শরীরে করোনা ভাইরাস উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও ইতালিসহ যেসব দেশ করোনা সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত হয়েছে, সেই দেশগুলোতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ১৮-২২ শতাংশ আক্রান্ত ছিল। সে হিসাবে বাংলাদেশ আক্রান্তের দিক থেকে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে (পিকে) আছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ফেরদৌস হাসানও মনে করেন, বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা লাখ লাখ, সেটি এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা কম বিধায় তা অনুমেয় হচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঊর্ধ্বগতির ধারা আরও দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলবে। তারপর কিছুদিন স্থিতিশীল থেকে কমতে থাকবে। অবশ্য কারও কারও মতে, সর্বোচ্চ পর্যায়ে যেতে আরও এক থেকে দেড় সপ্তাহ লাগবে। তারা এও বলেন, এখন যত বেশি নমুনা পরীক্ষা করা হবে তত বেশি আক্রান্ত পাওয়া যাবে। তাই র‌্যাপিড টেস্টের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত অনলাইন বুলেটিনের তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার দেশে করোনা সংক্রমিত কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২টি ল্যাবের মধ্যে নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১৪ হাজার ৯৫০টি। নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে ১২ হাজার ৭০৪টি। এর মধ্যে

শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯১১ জন; শনাক্তের হার ২২.৯১ শতাংশ। আগের দিন ছিল ২০.৮১ শতাংশ; ৩১ মে ২১.৪৩ শতাংশ, ৩০ মে ১৭.৬৬ শতাংশ, ২৯ মে ২২.৩২ শতাংশ। ২৫ থেকে ২৮ মে পর্যন্ত যথাক্রমে ২০.৯০, ২১.৫৬, ২১.৫৬ ও ২১.৭৯ শতাংশের শরীরে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল। এর আগের সপ্তাহে শনাক্তের হার ছিল ১৬ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে।

যদিও ৫ থেকে ১১ মে পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১১ মে ৭ হাজার ২০৮টি নমুনা পরীক্ষা করে ১ হাজার ৩৪ জনের মধ্যে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়ে। ১০ মে ৫ হাজার ৭৩৮টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৭ জন করোনা শনাক্ত হন। ৯ মে ৫ হাজার ৪৬৫টি নমুনা করে ৬৩৬ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে। ৮ মে ৭০৯, ৭ মে ৭০৬ জন। ৬ মে ৭৯০ এবং ৫ মে ৭৮৬ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে। অর্থাৎ ওই সময়ে করোনা পরীক্ষা এবং শনাক্ত দুই-ই কম ছিল। ২০ মের পর করোনা আক্রান্ত রোগী সংখ্যায় প্রতিদিনই রেকর্ড হচ্ছে।

এর আগে এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ১৪ দশমিক ৪০ শতাংশ, চতুর্থ সপ্তাহে ছিল ১২ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আর এপ্রিলের শেষ সাত দিনে এই হার ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের স্বনামধন্য একজন চিকিৎসক বলেছেন, বাংলাদেশে এখন করোনা রোগী লাখ লাখ। যেহেতু আমাদের সীমাবদ্ধ আছে, জনবলের স্বল্পতা আছে; তাই বেশি পরীক্ষা করা যাচ্ছে না। তাই প্রকৃত সংখ্যা জানতে পারছি না।

রবিবার বেসরকারি একটি টেলিভিশনের টকশোতে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক ফেরদৌস হাসান বলেন, বাংলাদেশ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। দেশে রোগী শনাক্তের হার ২০ শতাংশের বেশি। যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলো যখন আক্রান্তের শীর্ষ পর্যায়ে ছিল তখন হার ছিল ১৮ থেকে ২০ শতাংশের মতো। সে হিসাবে এখন বাংলাদেশ পিকে আছে। এ সময় ওই টক শোতে একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক মাথা নেড়ে এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে আবিষ্কৃত করোনা কিটের উদ্ভাবক বিজ্ঞানী বিজন কুমার শীলও সোমবার গণমাধ্যমকে বললেন, বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকে আক্রান্ত হয়ে ভালো হয়ে গেছেন, নিজেও হয়তো জানেন না। তিনি বলেন, আগামী ১৫ দিন থেকে এক মাস বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। তারপর কমতে থাকবে। তবে আক্রান্ত হলেও তার খুব খারাপ প্রভাব পড়বে না।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম ‘করোনা’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। রোগী শনাক্ত হওয়ার ২ মাস ৩ দিনের মাথায় একদিনে আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। যদিও বাংলাদেশে পরীক্ষার সংখ্যার একেবারেই অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ। যার কারণে প্রকৃত আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জানা যাচ্ছে না।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ২১ জানুয়ারি। দেশটিতে ৫৬ দিনের মাথায় একদিনে ১ হাজার রোগী শনাক্ত করা হয়। দেশটিতে রোগী শনাক্ত হওয়ার পর ৭৬ দিনের মাথায় একদিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত পাওয়া যায় ৩২ হাজার ১০৫ জন। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে স্পেনে প্রথম করোনা শনাক্ত হয় ৩১ জানুয়ারি। দেশটিতে ৪১ দিনের মাথায় প্রথম একদিনে হাজারের বেশি করোনা রোগী শনাক্ত হয়।

চীনের পর যেসব দেশে ব্যাপকভাবে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে সেখানে প্রথম সংক্রমণের পর ৩৮ থেকে ৭৬ দিনের মাথায় একদিনে সর্বোচ্চ সংক্রমণ শনাক্ত হতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্য ৬৭তম দিনে, ফ্রান্স ৬৬, জার্মানি ও স্পেনে ৬১, ইতালি ৫৩, ইরানে ৪২ এবং নেদারল্যান্ডসে ৩৮তম দিনে সর্বোচ্চ আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। সে হিসাবে বাংলাদেশ গতকাল ৮৭তম দিন শেষ করেছে।

বিশেষজ্ঞ অনেকের মতে, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহে তা আরও বাড়বে, তারপর ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। তবে যেহেতু বাংলাদেশে উপসর্গহীন রোগী বেশি এবং পরীক্ষাও পর্যাপ্ত নয়, তাই বাংলাদেশে সর্বোচ্চ শনাক্তের বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, পৃথিবীর অন্য দেশে প্রতিদিন পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, যার কারণে রোগী সংখ্যাও বেড়েছে। বাংলাদেশে পিসিআর ল্যাবের স্বল্পতা ও দক্ষ জনবলের অভাবে পরীক্ষা বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা একদিন বাড়বে তো অন্য দিন কমছে। যার কারণে রোগীর সংখ্যাও কম-বেশি হচ্ছে। অর্থাৎ বেশি পরীক্ষায় বেশি শনাক্ত, কম পরীক্ষায় কম শনাক্ত হচ্ছে।

অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক এবং প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, বাংলাদেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি, এখন শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ডা. মোজাহেরুল হক আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত রোগী ঊর্ধ্বমুখী। যেহেতু এখন লকডাউন তুলে দেওয়া হয়েছে তাই কখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে এবং কখন তা নি¤œমুখী হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না।

ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, আমরা সর্বোচ্চ চূড়ান্তের দিকে যাচ্ছি। আগামী সপ্তাহ দেড়েকের মধ্যে পিকে উঠবে। তারপর কিছুদিন স্থিতিশীল থেকে কমতে থাকবে। এটি রোগতাত্ত্বিক ধারণা।

advertisement