advertisement
advertisement

সংক্রমণ রোধে ১২ সুপারিশ বিশেষজ্ঞ কমিটির
৪০ ছাড়ালেই রেড জোন

দুলাল হোসেন
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ১১:৪৩
advertisement

ঢাকা সিটির কোনো ওয়ার্ডে ৪০ জনের বেশি করোনা আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেলে সেটিকে রেড জোন, ৩০ জনের কম হলে ইয়েলো এবং ১০ জনের কম হলে গ্রিন জোন করার একটি প্রস্তাবনা দিয়েছে সরকারের গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি। গতকাল সকালে এ প্রস্তাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দাখিল করা হয়। করোনা সংক্রমণের লাগাম টানতে রেড জোন ঘোষিত এলাকাকে লকডাউন করে বেশি পরীক্ষা, কন্ট্রাক্ট ট্রেসিংসহ ১২ দফা সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রস্তাবনায়।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রস্তাবনাটি গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের কাছে উপস্থাপন করেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই প্রস্তাবনার ওপর আরও কিছু অবজারভেশন দেন। এটি সংশোধন করে আজকালের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

করোনা মোকাবিলায় গৃহীত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের লক্ষ্য সরকারের গঠিত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ করোনার সংক্রমণ রোধে জোনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি মঙ্গলবার রাতে বৈঠক করেন। বৈঠকে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সংক্রমণের হার বিবেচনায় নিয়ে আরবান এলাকাগুলোকে বিভিন্ন জোনে বিভক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের একটি প্রস্তাব গতকাল বুধবার সকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দাখিল করা হয়।

কমিটির একজন সদস্য আমাদের সময়কে বলেছেন, আমরা আরবান এলাকাগুলোকে বিভিন্ন জোনে ভাগ করে কার্যক্রম পরিচালানার একটি প্রস্তাবনা

দিয়েছি। প্রস্তাবে আছেÑ যে এলাকায় ৪০ জনের বেশি করোনা আক্রান্ত পাওয়া যাবে, সেটি হবে রেড জোন। এই ৪০ জন কি মহল্লা হিসেবে ধরা হবে, নাকি ক্যাচমেন্ট এরিয়া, নাকি ওয়ার্ডভিত্তিকÑ সে ইউনিট ঠিক করতে হবে। আমরা যে প্রস্তাবনা দিয়েছি এটাই চূড়ান্ত নয়। এ ক্ষেত্রে সরকার হয়তো সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আমরা একটা স্ট্যাট্রেজি দিয়েছি। এই সংখ্যা একটি ওয়ার্ড বা মহল্লাভিত্তিক হবে কিনা তা ঠিক করবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর সরকার এটা কীভাবে করবে সেটা সিদ্ধান্ত সরকারের। তিনি আরও বলেন, প্রস্তাবনায় রেড জোনের জন্য কী কী কাজ করতে হবে তার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। একইভাবে ইয়েলো ও গ্রিন জোনের করণীয়ও বলা হয়েছে। আমরা প্রস্তাবনায় বলেছি, যেটিকে রেড জোন ঘোষণা করা হবে সেই এলাকায় রেসট্রিকশন মুভমেন্ট থাকতে হবে। যাদের পজিটিভ হবে তাদের হাসপাতাল নিতে হবে। যারা রোগীর সংস্পর্শে এসেছেন তাদের হোম কোয়ারেন্টিন কনফার্ম করতে হবে। রেড জোন থেকে কাউকে বের হতে না দেওয়ার প্রস্তাব করেছি। তার পরও যদি কারও সেখান থেকে বের হতে হয় বা ঢুকতে হয় তা হলে একটি আইনের মাধ্যমে তা করতে হবে। রেড জোনের বিষয়ে ১২টি পয়েন্ট বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছি। এসব সঠিকভাবে মানা গেলে সংক্রমণ রোধ সম্ভব হবে। তবে এটি এখনো অফিসিয়ালি ডকুমেন্ট হয়নি, তাই বিস্তারিত বলা যাবে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটি বলেছেন কোনো এলাকায় শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১০ জনের মতো হয় এবং গত দুই সপ্তাহে নতুন কোনো রোগী শনাক্ত না হয়ে থাকে তা হলে সে এলাকাকে গ্রিন জোন বলা যেতে পারে। কোথায় রোগীর সংখ্যা ৩০ জনের নিচে হলে ইয়েলো জোন বলা যেতে পারে। ওনারা বলেছেন, রেড জোনে রোগীদের চিহ্নিত করতে হবে। ফ্ল্যাগ দিয়ে ওই জায়গায় সিল করতে হবে। ওই এলাকার কোনো লোককে বাইরে যেতে দেওয়া যাবে না। নজরদারি করতে হবে। কারও উগসর্গ পাওয়া গেলে টেস্ট করতে হবে। রোগীর সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। যদি ইয়েলো জোন হয় তা হলে রেড জোনের মতো কড়াকড়ি থাকবে না। তবে নজরদারিসহ অন্য ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। গ্রিন জোনে হবে সেখানকার লোক স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে। এই কাজগুলো সিভিল প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এবং কমিউনিটি ভলান্টিয়ার দেখাশোনা করবে। এটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রাথমিক প্রস্তাব। এটি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। মন্ত্রী আরও কিছু অবজারভেশন দিয়েছেন। এর পর ওনারা এটি বিশ্লেষণ করে প্রস্তাবনা আমাদের দেবেন। তার পরই প্রস্তাবনাটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে দেওয়া হবে।

অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিশেষজ্ঞ কমিটি ৪০ জন রোগী বিষয়ে অনেক ফ্যাক্টরের কথা বলেছেন। বস্তি এলাকা হলে এক রকম হবে আবার অন্য এলাকার ক্ষেত্রে আরেক রকম হবে। বস্তি এলাকায় যেহেতু অনেক মানুষ একসাথে থাকে, সেখানে হোম আইসোলেশন করতে চাইলে পারা যাবে না। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকা মহানগরের ওয়ার্ডভিত্তিক ম্যাপ করে দেখা হবে। যদি দেখা যায় কোনো ওয়ার্ডে ৪০ জন রোগী আছে আমরা সেটিকে বলব রেড ওয়ার্ড। যদি দেখা যায় গত ২ সপ্তাহ কোনো ওয়ার্ডে নতুন কোনো কেস হয়নি সেটিকে ইয়েলো। বিশষজ্ঞ কমিটি আমাদের যে প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি প্রাথমিক।

আইইডিসিআর তথ্যমতে, দেশে প্রথম করোনা শনাক্তকরণ পরীক্ষা শুরু হয় ২১ জানুয়ারি। এরপর গত ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয়। দেশে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ৫৫ হাজার ১৪০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের মধ্যে ৭৪৬ মারা গেছেন এবং ১১ হাজার ৫৯০ জন সুস্থ হয়েছেন। করোনার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ঢাকা সিটিতে। এর পর রয়েছে চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ জেলায়। ঢাকা সিটিতে করোনা রোগীর সংখ্যা ১৭ হাজার ৯৯৩ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৬৬২, নারায়ণগঞ্জে ২ হাজার ৩৩৩ জন, ঢাকা জেলায় ১ হাজার ৩০৭, গাজীপুর জেলায় ১ হাজার ১১৫, কুমিল্লায় ১ হাজার ৩৩ জন। এ ছাড়া জেলাগুলোয় রোগীর সংখ্যা ৮৭৭ জন থেকে শুরু করে মাত্র ২৯ জন পর্যন্ত।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মার্চ সরকার করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গৃহীত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম পর্যালোচনা ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে দেশে আটজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়ে একটি কমিটি করে। কমিটির একেকজন সদস্যকে একটি করে বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেনকে। চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক ডিজি অধ্যাপক এমএ ফয়েজ, রাজশাহীর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী, খুলনার আইসিডিসিআরবির সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার ডা. ইকবাল আনোয়ার, ময়মনসিংহের বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের অধ্যাপক ডা. ফজলুর রহমান, সিলেটের পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি ডা. এজেএম ফয়সাল, ইউনিসেফের সাবেক প্রধান কর্মসূচি সমন্বয়ক ডা. তারিখ হোসেন এবং রংপুরের দায়িত্ব পান রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. মো. মওদুদ হোসেন।

 

 

advertisement