advertisement
advertisement

লিবিয়ায় এখনো জিম্মি অনেকে

আরিফুজ্জামান মামুন
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০৯:২৫
পুরোনো ছবি
advertisement

স্বপ্নের ইউরোপযাত্রার প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারের ‘নিরাপদ’ রুট লিবিয়া। অবৈধপথের এ যাত্রায় নির্মম প্রাণহানির শিকার হচ্ছেন শত শত লোক। যুদ্ধাবস্থার কারণে দেশটির একেক অঞ্চল একেক গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। এ সুযোগ নিয়েই লিবিয়াতে গড়ে ওঠা ছোট ছোট মিলিশিয়া গ্রুপই এখন মানবপাচারের নিয়ন্ত্রক। তাদের যোশসাজশে বাংলাদেশের পাচারকারীরা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এ দেশেও। ঠিক এমনই এক মিলিশিয়া নেতা খালেদ আল মিশাই ঘারিয়ানকে ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ সমর্থিত ত্রিপলি সরকার। যে কিনা সম্প্রতি দেশটির মিজদাহ শহরে ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যার মূলহোতা। তবে এখনো দেশটিতে অনেক বাংলাদেশি অন্য গ্রুপের হাতে জিম্মিদশায় রয়েছেন।

জানা যায়, কয়েকটি পথ ধরে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাঠানো হয় বাংলাদেশিদের। প্রথমটি হলো বাংলাদেশ থেকে ইস্তাম্বুল হয়ে লিবিয়া। দ্বিতীয়টি ঢাকা থেকে লিবিয়া, ভায়া দুবাই। ঢাকা থেকে দক্ষিণ সুদান, এর পর মরুভূমি হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয় যারা কম টাকা দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ থেকে দুবাই (৭-৮ দিন অবস্থান), জর্ডানের আম্মানে ট্রানজিট শেষে লিবিয়ার বেনগাজি হয়েও ত্রিপলি পাঠানো হয়। আর লিবিয়া থেকে নৌপথে তিউনিসিয়ার উপকূল হয়ে পাঠানো হয় ইউরোপে। সর্বশেষ পথে যাত্রাটিই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সাগরের শীতল জলে অনেকেরই হয়েছে সলিল সমাধি।

এদিকে ত্রিপলির বাংলাদেশ দূতাবাস

জানায়, মিজদাহ হত্যাকা-ে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে যারা যায় তাদের বেশিরভাগই সিলেট ও বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের নওগাঁ, নাটোর এবং ঢাকার আশপাশের মানিকগঞ্জ ও নবাবগঞ্জের কিছু লোক রয়েছেন। পাচারের কবল থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় সবাই জানান, মধ্যপ্রাচ্যের মানবপাচারকারীরা লিবিয়ায় নেওয়ার জন্য ঢাকা থেকে দুবাই, দুবাই থেকে তিউনিসিয়া হয়ে তাদের সেখানে পাঠিয়েছে। দেশটির মরুভূমিতে এখনো বহু বাংলাদেশি জিম্মি। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তাদের ইউরোপে পাচারের পরিকল্পনা চলছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার দুর্গম মরুপথ ও ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে অবৈধ উপায়ে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটকদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে ৫ হাজার বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু গত কয়েক মাসে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার সময় ৭০০ বাংলাদেশি উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে।

জিম্মি থাকাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে ত্রিপলির বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শেখ সিকান্দার আলী বলেন, ‘কোনো একটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিষয়টি এসেছে। আমরা তথ্যটা খতিয়ে দেখছি। তবে এখনো নিশ্চিত বা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘যুদ্ধকবলিত লিবিয়া মানবপাচারের তুলনামূলক নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহু দিন ধরেই। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং স্থানীয় সূত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া যায়। দূতাবাস তা যাচাই করে।’

এদিকে লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমবিষয়ক কাউন্সিলর আশরাফুল ইসলাম গণমাধ্যমে ২৬ বাংলাদেশি হত্যাকা- ও তাদের পাচারের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। তার দেওয়া তথ্য মতে, নিহত ২৬ জনসহ মোট ৩৮ বাংলাদেশি ও কিছু সুদানি সেখানে ছিলেন। রাজধানী ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদায় আটকে রাখা হয়েছিল তাদের। মূলত ইতালিতে অভিবাসনের উদ্দেশে ওই ৩৮ বাংলাদেশি লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। তার দাবি, করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে ডিসেম্বরে তারা ভারত ও দুবাই হয়ে বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছেন। এর পর কয়েক মাস তাদের লিবিয়ার ভেতরে গোপনে রাখা হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের। লিবিয়ায় নানা মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর রয়েছে জানিয়ে তিনি জানান, বছরের এই সময়টায় সাগর অপেক্ষাকৃত শান্ত থাকায় পাড়ি দেওয়ার আদর্শ সময় বলে মনে করে পাচারকারী চক্র।

লিবিয়া সরকার জানায়, মিজদাহ শহরে ২৮ এপ্রিল ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে গুলি করে হত্যার মূলহোতা খালেদ আল মিশাই ঘারিয়ান গতকাল নিহত হয়েছে। ত্রিপলি থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের ওই শহরে লিবিয়ার বিমানবাহিনীর ড্রোন হামলায় হাফতার মিলিশিয়া বাহিনীর অন্যতম এ সদস্যের মৃত্যু হয়। লিবীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এটি নিশ্চিত করেছে।

advertisement