advertisement
advertisement

নির্যাতনের ফুটেজ দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা হতো

আমাদের সময় ডেস্ক
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০১:১২
advertisement

লিবিয়ায় অপহরণকারীদের হাতে খুন হওয়া ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জন ছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরবের বাসিন্দা। তাদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে মানবপাচারকারী দালাল চক্রের স্থানীয় হোতা হেলাল মিয়া, খবির উদ্দিন ও শহিদ মিয়া ভারত এবং দুবাই হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পরে কয়েক হাতবদল করে অভিবাসী যুবকদের জিম্মি করে মুক্তিপণ হিসেবে নগদ ১০ হাজার ডলার দাবি করে। টাকা দিতে বিলম্ব করলে অভিবাসীদের জিম্মি করে নির্যাতন করা হতো। আর সেই নির্যাতনের ভিডিও ফুটেজ দেশে থাকা পরিবারের কাছে পাটিয়ে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। পরে ফুটেজ দেখে অপহরণকারীদের কাছে টাকা পাঠাতে বাধ্য হতেন পরিবারের সদস্যরা।

মানবপাচারের এ ঘটনায় মঙ্গলবার রাতে সিআইডি ৩৮ জনের বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টনে একটি মামলা করে। ওই মামলার তিন আসামি হেলাল মিয়া, খবির উদ্দিন ও শহিদ মিয়াসহ চারজনকে আটক করেছেন র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পের সদস্যরা। আটককৃত তিন পাচারকারীকে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত করলেও এক নারী সদস্যকে

তদন্তের স্বার্থে উপস্থিত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন র‌্যাব ১৪-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল এফতেখার উদ্দিন।

র‌্যাব জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে হেলাল উদ্দিন হেলু, শহিদ মিয়া, খবির উদ্দিনসহ আরও এক মহিলাকে আটক করা হয়। পরে গতকাল বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় র‌্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্পে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন র‌্যাব-১৪ ময়মনসিংহ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এফতেখার উদ্দিন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নিহত ২৬ জনের মধ্যে ভৈরবের ৬ যুবক রয়েছেন। এদের মধ্যে নিহত ছয় যুবককে আটককৃত মানবপাচারকারীরা তাদের বিভিন্ন কৌশলে কয়েকবার হাতবদলের মাধ্যমে লিবিয়ায় পাচার করে। আটকের পর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে লিবিয়ায় নিহতদের পাচারে তাদের সক্রিয় থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের এ কর্মকর্তা দাবি করেন।

তিনি আরও বলেন, আটককৃতরা অভিবাসীদের জিম্মি করে ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে অত্যাচার করে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করত। পরে এসব ভিডিও দেখে অপহরণকারীদের কাছে টাকা পাঠাতে বাধ্য হতেন পরিবারের সদস্যরা।

গত ২৮ মে বৃহস্পতিবার সকালে লিবিয়ায় বর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। আহতরা লিবিয়ার ত্রিপোলির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। প্রত্যেকের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। যারা নিহত হয়েছেন, তারা হলেনÑ ভৈরব উপজেলার আকবরনগর গ্রামের জিন্নত আলীর ছেলে মাহবুব (২১), রোসুলপুর গ্রামের মেহের আলীর ছেলে মো. আকাশ (২৬), শ্রীনগরের বাচ্ছু মিয়ার ছেলে সাকিব, ভৈরব বাজারের অধির দাসের ছেলে রাজন দাস। নিহত শাকিলের পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া সম্ভুপুর গ্রামের আ. সাত্তার মিয়ার ছেলে মো. জানু মিয়া (২৭), মৌটুপী গ্রামের আবদুল আলীর ছেলে মো. সোহাগ (২০), জগন্নাথপুর গ্রামের সজল গুরুতর আহত হয়ে ত্রিপোলির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

জানা যায়, করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত জটিলতা শুরু হওয়ার আগে ইতালি অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ভারত ও দুবাই হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি বিমানবন্দরে পৌঁছান। এর পর প্রায় দুই মাস মানবপাচারকারীরা তাদের লিবিয়ায় গোপন করে রেখেছিল বলে জানিয়েছে নিহতের পরিবার।

উপকূলীয় অঞ্চল যুওয়ারা হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসীদের নিয়ে ইতালির দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা ছিল পাচারকারীদের। কিন্তু প্রচলিত ও ব্যবহৃত পথে না গিয়ে মরুভূমির মধ্য দিয়ে বেশ বিপদসংকুল একটি পথে তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। অপহরণকারীদের সঙ্গে আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তিপণ নিয়ে দর কষাকষি চলছিল। আটককৃতদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কাক্সিক্ষত মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হয়। তবে পরিবার সূত্রে জানা যায়, অনেকেই মুক্তিপণ হিসেবে ১০ হাজার ডলার করে পাঠিয়েছেন। তবে দেশে লকডাউন থাকায় অনেকেরই টাকা পাঠাতে বিলম্ব হয়েছে।

মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় আাটককৃতদের ওপর নির্যাতন চালাতে থাকে অপহরণকারীরা। একপর্যায়ে বাংলাদেশিদের সঙ্গে থাকা সুদানি নাগরিকরা অপহরণকারী চক্রের এক সদস্যকে মেরে ফেলেন। এর পর অপহরণকারীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালালে ৩৮ বাংলাদেশির সবাই গুলিবিদ্ধ হন। মারা যায় ২৬ জন।

আমাদের সময়ের এক প্রশ্নের জবাবে র‌্যাব-১৪ অধিনায়ক এফতেখার উদ্দিন বলেন, সারাদেশে মোট ৩৮ জন মানবপাচারকারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এর বাইরে আরও অনেক দালাল রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। দালালদের বিচারের আওতায় না আনা গেলে এ সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।

লিবিয়ায় মানবপাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা এবং কয়েকজনকে জখম করার ঘটনায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার রাতে মামলা করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। মামলার প্রধান আসামি করা হয় লিবিয়া প্রবাসী কিশোরগঞ্জের ভৈরবের তানজিলুর ওরফে তানজিলুম ওরফে তানজিদকে। বাংলাদেশে অবস্থানরত তার ভাই বাচ্চু মিলিটারি মামলার ২ নম্বর আসামি এবং ভাতিজা নাজমুল ৩ নম্বর আসামি। অন্য আসামিদের মধ্যে তানজিদের লিবিয়া প্রবাসী দুই সহযোগী জাফর ও স্বপন অন্যতম।

সিআইডি সূত্র জানায়, এ মামলার আসামিদের অধিকাংশই দালাল। তারা সংঘবদ্ধ চক্র। তবে একাধিক ট্রাভেল এজেন্সিও এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। মামলায় ২৫/২ পুরানা পল্টন লেনের স্কাই ভিউ ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী (এজাহারে নাম নেই), শহীদ তাজউদ্দিন সরণির ফ্লাইওভার ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিক দুই ভাই শেখ মাহবুবুর রহমান ও শেখ সাহিদুর রহমান, বাংলামোটরের অজ্ঞাত ট্রাভেলসের মালিক লালনকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের এক হিসাবধারীকেও (শাহাদাত হোসেন, ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড হিসাব নং-৫৮৫০, আশ্রাফাবাদ কামরাঙ্গীরচর শাখা, ঢাকা) মামলার আসামি করা হয়েছে।

মামলার অন্য আসামিরা হলোÑ ভৈরবের জোবর আলী, মিন্টু মিয়া ও মুন্নি আক্তার রূপসী, কুষ্টিয়ার কামাল উদ্দিন ওরফে হাজী কামাল ও আলী হোসেন, শরীয়তপুরের সাদ্দাম, কামরাঙ্গীরচরের কামাল হোসেন, মাদারীপুরের রাশিদা বেগম, নুর হোসেন শেখ, ইমাম হোসেন শেখ, আকবর হোসেন শেখ, বুলু বেগম, জুলহাস সরদার, আমির শেখ, দিনা বেগম, নজরুল মোল্লা, জাহিদুল শেখ, জাকির মাতুব্বর, আমির হোসেন, কুদ্দুস বয়াতী, নাসির, সজীব মিয়া ও রেজাউল বয়াতী, গোপালগঞ্জের লিয়াকত শেখ ওরফে লেকু শেখ এবং আ. রব মোড়ল।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সংঘবদ্ধ দালাল চক্র লিবিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের পাচার করেছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে তাদের লিবিয়ায় পাচার করা হয়। সেখান থেকে ইতালি পাঠানোর নাম করে তাদের আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করা হচ্ছিল। পরে সেখানকার স্থানীয় মানবপাচারকারীরা ভুক্তভোগীদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। এই সংঘবদ্ধ চক্রে পুরানা পল্টনের স্কাই ভিউ ট্যুরস অ্যঅন্ড ট্রাভেলস, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, কর্মচারী ও দালালরা এর সঙ্গে জড়িত।

লিবিয়ায় বাংলাদেশি অপহরণ চক্রের ২ সদস্য বরগুনায় আটক

এদিকে লিবিয়ায় বাংলাদেশি অপহরণ চক্রের দুই সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব-১২ একটি দল। মঙ্গলবার রাতে বরগুনা জেলার পাথরঘাটায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলোÑ পাথরঘাটা থানার খাসতবক গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে সজল হোসেন (২৩), একই থানার নাচনাপাড়া গ্রামের ইউসুফ ঘরামির ছেলে ইদ্রিস আলী।

এ সময় তাদের কাছ থেকে নগদ টাকা, ১১টি মোবাইল ফোন, বিকাশ ও নগদে টাকা পাঠানোর রেজিস্টার খাতাসহ ২৯টি সিমকার্ড উদ্ধার করা হয়।

advertisement