advertisement
advertisement

একদিনের মৃত্যুর হিসাবে ঢাকাকে ছাড়াল চট্টগ্রাম

তৈয়ব সুমন, চট্টগ্রাম
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০১:১২
advertisement

করোনা রোগীর সংখ্যার দিক থেকে নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জকে পেছনে ফেলেছিল আগেই। এতদিন আক্রান্ত ও মৃত্যু হিসাবে শীর্ষে অবস্থান করছিল ঢাকা বিভাগ। পিছু পিছু হাঁটছিল চট্টগ্রাম। কিন্তু এবার মৃত্যুর হিসাবে ঢাকা বিভাগকে পেছনে ফেলল চট্টগ্রাম। আক্রান্তের সংখ্যায় নতুন নতুন রেকর্ড হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ২০৬ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে চট্টগ্রামের করোনা পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে শঙ্কিত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, সুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যুর দিক থেকেও সারাদেশে এগিয়ে চট্টগ্রাম। প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গত দুমাসে এখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার পেরিয়ে গেছে। আর মৃত্যু হয়েছে ৭৯ জনের, যা শনাক্তের বিপরীতে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর সুস্থ হয়েছেন ৯৯২ জন। এর মধ্যে সাড়ে সাতশ রোগী বাসায় চিকিৎসা

নিয়ে সুস্থ হয়েছেন, যা মোট রোগীর অন্তত ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষার পর এখানে রোগী শনাক্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৭ জন। এর মধ্যে নগরীর ১৬ থানায় রোগীর সংখ্যা ২৩০০। তবে গত ১৫ দিন ধরে এখানে রোগী সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও।

দেশে গত ৮ মার্চ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। গত ১৭ মার্চ আক্রান্ত প্রথম রোগীর মৃত্যু হয়। চট্টগ্রামে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৩ এপ্রিল। শুরুর দিকে হাতেগোনা দু-চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও সম্প্রতি এ সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজধানী ঢাকায়ই সবচেয়ে বেশি রোগী মৃত্যুর খবর আসে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণকারী ৩৭ করোনা রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ১৫ জনই চট্টগ্রাম বিভাগের। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগের রয়েছেন ১০ জন, সিলেটে চারজন, বরিশালে তিনজন, রাজশাহীতে দুজন, রংপুরে দুজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে একজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে রাজধানী ঢাকা তথা ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চসংখ্যক আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুঝুঁকির তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে চট্টগ্রামের নাম। কিন্তু একদিনে মারা যাওয়া সংখ্যা বিচারে চট্টগ্রাম এখন প্রথম স্থানে রয়েছে, যেটা বেশ চিন্তার বিষয়।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তের মধ্যে মৃত্যুর হার ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অথচ ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে এ হার দেড় শতাংশ। তেমনি সুস্থতার দিক থেকেও এগিয়ে এখানকার রোগীরা। বিভিন্ন হাসপাতালে থেকে ২৪২ জন এবং বাসায় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন আরও ৭৫০ জন।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আবদুর রব আমাদের সময়কে বলেন, প্রতিদিন প্রায় ২০০-২৫০ মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে যারা সুস্থ হয়ে উঠেছেন তাদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ এবং যুবক। আর মৃত্যুবরণকারীদের ৭০ শতাংশই বয়সে প্রবীণ। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, সবাই মিলে চিকিৎসার বিষয়টি সমন্বয় করে যদি একটা গাইডলাইন তৈরি করা যায়, তা হলে চট্টগ্রামকে দ্রুত সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।

এদিকে করোনা হটস্পট বিবেচনায় নগরীর ১২ থানা এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি আমাদের সময়কে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের তালিকায় ৩২৪ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় শীর্ষে রয়েছে নগরীর কোতোয়ালি থানা। এ ছাড়া পাঁচলাইশে ২১৫, খুলশীতে ১৮৩, পতেঙ্গায় ১৬৮, হালিশহরে ১৬৭, ডবলমুরিংয়ে ১৪১, বন্দরে ১২৩, পাহাড়তলীতে ১১৪, ইপিজেডে ১১২, বন্দরে ১১১, চকবাজারে ১১১ ও চান্দগাঁওয়ে ১০৬ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ায় এসব থানাকে রেড জোনে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রামে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের ৩ ল্যাব ও কক্সবাজার মেডিকেল ল্যাব মিলিয়ে ৬২১ জনের নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ২০৬ জন। এর মধ্যে ১১৯ জন মহানগরের এবং ৮৭ জন চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা।

গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামে করোনায় প্রথম চিকিৎসক ডা. এহসানুল করিমের মৃত্যু হয়েছে। তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি চট্টগ্রামের বেসরকারি মেরিন সিটি মেডিক্যালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী এলাকায়।

চারদিন আগে তার করোনা ভাইরাস শনাক্ত হলে তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বাস্থ্যের অবনতি হলে আইসিইউতে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। করোনা ভাইরাস শনাক্তের আগে থেকে ডা. এহসান ব্লাড ক্যানসারেও ভুগছিলেন।

করোনায় সাতদিন আগে চট্টগ্রামে মারা গেছেন শিল্পগ্রুপ এস আলমের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের বড়ভাই মোরশেদুল আলম। আক্রান্ত হয়েছেন তার মা, পুত্র ও চার ভাইসহ আরও ৭ জন। এর আগে গত ২০ মে বায়তুশ শরফের পীর মাওলানা মোহাম্মদ কুতুব উদ্দিন মারা যান। একদিন আগে চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা কাযী নুরুল ইসলাম হাশেমী, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সাবেক সদস্য এবং চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. কবির চৌধুরী, রাঙ্গুগুনিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও স্বনির্ভর রাঙ্গুগুনিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম চৌধুরী লেদুর মৃত্যু হয়। এভাবে মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে চট্টগ্রামে।

advertisement