advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

কৃষিতে করোনার প্রভাব
সংকট মোকাবিলায় আর্থিক বাজারের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রয়োজন

এমএ বাকী খলীলী
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০৮:১৫
advertisement

বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের ভূমিকা এখন অনেক কম। কিন্তু উৎপাদনে কৃষি খাতের ব্যাপ্তি এবং ফসলের বিন্যাস অনেক। ফসল উৎপাদনের ঘনত্ব বেড়েছে এবং একই সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বেড়েছে। যদিও জিডিপিতে ভূমিকা এক-পঞ্চমাংশ, কিন্তু শ্রমশক্তির প্রায় ৫০ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। প্রশ্ন উঠেছে, করোনায় কৃষকরা কেমন আছেন এবং কীভাবে তারা সংকট মোকাবিলা করছেন?

গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ‘ইনোভেশন’ নামে একটি জরিপ প্রতিষ্ঠান জাতীয় পর্যায়ে নমুনা জরিপের মাধ্যমে ৫৭৬ জন কৃষকের ওপর জরিপ শেষ করে। আজকের প্রবন্ধের প্রস্তুতিতে তাদের ফলাফল অনেকাংশে ব্যবহার করা হয়েছে। আমাকে ফলাফল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার জন্য ‘ইনোভেশন’কে অনেক ধন্যবাদ।

বাংলাদেশে প্রতিবছর কমবেশি অভিঘাত এসে থাকে। কখনো বন্যা, কখনো সাইক্লোন, কখনো খরা। এবারের অভিঘাত ভিন্ন রকমের। করোনার প্রভাব সীমিত করার জন্য সারাদেশ কমবেশি লকডাউনের মধ্যে রয়েছে। যদিও পণ্য বহন করার অনুমতি রয়েছে, কিন্তু সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে পাইকারি বাজার পরিচালনা করা যায় না। সে কারণে গ্রামপর্যায়ে পাইকারি কেনাবেচা কম। গত দুই মাস গ্রামীণ অর্থনীতি লকডাউনের আওতায়। এটা অনেকটা যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাতের সঙ্গে তুলনীয়। বোরো ধান উঠছে; শাকসবজি উঠছে। এমন অবস্থায় কৃষকদের ওপর করোনার প্রভাব কেমন তা বোঝার প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে শুধু বর্তমান অবস্থা জানার জন্য, প্রয়োজন ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কা-ের ওপর প্রভাব বোঝার জন্য। সে ক্ষেত্রে বোঝার প্রয়োজন আছে আর্থিক বাজারের ভূমিকা নিয়ে।

যে কোনো অভিঘাতের কয়েক ধরনের প্রভাব হয়। প্রথম প্রভাব হয় আয় হ্রাস; দ্বিতীয় প্রভাব হয় সংকট মোকাবিলায় গৃহীত বিরূপ পদক্ষেপ এবং তৃতীয় প্রভাব হয় ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের ওপর।

আয় হ্রাস : আয় হ্রাসের প্রধান কারণ উৎপাদিত পণ্যের দাম না পাওয়া। জরিপে দেখা গেছে, কৃষকদের মতো মোট পারিবারিক আয় গত বছরের তুলনায় ৬১ শতাংশ এবং কৃষি আয় ৫৮ শতাংশ কমেছে। অনেকগুলো উপাদান দায়ীÑ রেমিট্যান্স না পাওয়া, গবাদি পশু থেকে আয় কম, মজুরি থেকে আয় কম, ফসলের দাম কম অন্যতম। তবে দেখা যায় যে, যেসব এলাকায় ফসলের বৈচিত্র্যতা আছে, সেখানে ফসলের দামের তারতম্য কম। অর্থাৎ যদি সাবস্টিউশন থাকে, তা হলে দামের তারতম্য কম হবে। অন্যদিকে স্বল্প আয়ের কারণে কম চাহিদা, দামের কম তারতম্যের জন্যও অন্যতম উপাদান। পরেরটির ক্ষেত্রে অবশ্য দাম অনেক কম হতে পারে। এই অভিঘাতের সময় বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা কার্যকর না হওয়ার ফলে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ৯৩ শতাংশ বিক্রেতা নিজের গ্রামেই বিক্রি করেছেন।

করোনার প্রভাব খাদ্যনিরাপত্তায় : যখন আয় প্রায় ৬০ শতাংশ কমে যায়, তখন খাদ্যনিরাপত্তা প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। জরিপে খুব কঠিন অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় ৮ শতাংশ পরিবারের বর্তমানে খাদ্যনিরাপত্তা একেবারেই নেই। খাদ্যনিরাপত্তার জন্য দুটি প্রধান উপাদানÑ বাড়িতে খাদ্য মজুদ এবং দ্রব্য ক্রয়ের জন্য হাতে নগদ থাকা। জরিপে দেখা যায়, যেই সময় জরিপ করা হয়, সেই সময় থেকে পরবর্তী দুই সপ্তাহের খাদ্য মজুৎ আছে প্রায় ৬৮ শতাংশের এবং দুই সপ্তাহের দ্রব্য ক্রয়ের জন্য নগদ আছে ৫৮ শতাংশের। লকডাউন পুরো মে মাস চললে ৯০ শতাংশ কৃষক পরিবারের কোনো খাদ্যনিরাপত্তা থাকবে না। কিন্তু মানের দিক থেকে এই নিরাপত্তা কেমন? খাদ্য প্রোটিনসমৃদ্ধ বা সমৃদ্ধ নয়, এটা প্রধান বিষয় নয়। তবে খাদ্য রেশনিং হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। খেয়ে বেঁচে থাকাটা প্রধান লক্ষ্য। সেই চিত্র এ জরিপ থেকে বেরিয়ে এসেছে। একদিকে খাদ্য ঘাটতি, অন্যদিকে খাদ্যের প্রোটিন ব্যয় কমেছেÑ এ রকম অবস্থায় সংকট মোকাবিলা করা সত্যি কঠিন হয়ে পড়ে।

সংকট মোকাবিলার কৌশল : যে কোনো অভিঘাত মোকাবিলায় পরিবার বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে নিজেদের সীমাবদ্ধতার মধ্যে। সাধারণ কৌশল হচ্ছেÑ সঞ্চয় ব্যবহার, সম্পদ বিক্রয়, অগ্রিম শ্রম বিক্রয়, অগ্রিম ফসল বিক্রয়, বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ। বর্তমানে কৃষকরাও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। প্রায় ১৩ শতাংশ পরিবার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি। অন্যরা বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সঞ্চয় অবশ্যই প্রধান উৎস হয়। যখন সঞ্চয় যথার্থ না হয়, তখন তারা অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

জরিপে দেখা গেছে, ৫৩ শতাংশ কৃষক নিজস্ব সঞ্চয় ব্যবহার করেন। ১৫ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে মোকাবিলা করছেন। প্রায় ১০ শতাংশ পরিবার জমি বন্ধক, অগ্রিম মজুর বিক্রয়, অগ্রিম ফসল বিক্রয়ের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করে জীবন কালাতিপাত করছে। এ জাতীয় কৌশল শুধু ক্ষয়িষ্ণু নয়; এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। বর্তমানে নগদ প্রবাহ হলেও পরবর্তী সময়ে এ প্রবাহ থাকবে না। দক্ষিণ ও উত্তর অঞ্চলে মঙ্গার সময়ও দেখা গেছে, যে কৌশলই নেওয়া হোক না কেন, তার প্রভাব ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের ওপর পড়বে।

যারা ঋণ নিয়েছেন বা সম্পদ কিংবা শ্রম বিক্রি করে বর্তমান খাদ্যনিরাপত্তাকে অর্থায়ন করছেন তাদের জন্য এর প্রভাব আরও বেশি। সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা না নিলে আগামীতে খাদ্যনিরাপত্তা এবং বাজারও থাকবে না।

কৃষকদের ঋণ এবং উৎসÑ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রধান উৎস : বেশিরভাগ কৃষক ঋণ নিয়ে চাষবাস করে থাকেন। জরিপটিতে দেখা গেছে, কৃষকদের গড় ঋণ স্থিতি প্রায় ২৪ হাজার টাকা। প্রশ্ন হলো, এই ঋণ কোথা থেকে নিয়েছেন কৃষকরা? জরিপে দেখা গেছে, কৃষকদের প্রায় ৭৫ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছেন। অন্যদিকে মাত্র ১০ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। এ ফলাফল কোনো অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির তথ্য থেকে দেখা যায়, মাত্র ৯ শতাংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে থাকেন। অতএব জরিপে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার যে তথ্য উঠে এসেছে, তা জাতীয় তথ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যাদের ধারণা নেই, তাদের জ্ঞাতার্থে বলা যেতে পারে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান প্রায় ২০ হাজার ব্রাঞ্চের মাধ্যমে গ্রামে আর্থিক সেবা দিয়ে থাকে। প্রায় দুই লাখেরও বেশি মানুষকে সেবা দিতে কাজ করে। বছরে প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে থাকে প্রায় তিন কোটি ঋণীকে। আর তা ছাড়া বেসরকারি ব্যাংকগুলোও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও কৃষিঋণ বিতরণ করে থাকে।

কৃষকদের দায় এবং ভবিষ্যৎ কর্মকা-ে প্রভাব : একদিকে দায় পরিশোধ, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মকা-ের জন্য প্রবাহ দরকার। জরিপটিতে এ চিত্রই উঠে এসেছে। বাইরের আর্থিক সহযোগিতা ছাড়া তারা একদিকে যেমন দায় পরিশোধ করতে পারবেন না, অন্যদিকে তাদের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করতে পারবেন না। জরিপে দেখানো হয়েছে যে, ঋণ বা সরকারি আর্থিক সহায়তা ছাড়া প্রায় ৫৩ শতাংশ কৃষক পরবর্তী ফসল চাষ করতে পারবেন না।

নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন : কৃষিতে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন। যারা ঋণ নিতে চান এবং যারা চান না, সব মিলিয়ে গড় ঋণের চাহিদা ১৬ হাজার টাকা। এই বিনিয়োগ ছাড়া পরবর্তী ফসল বা অর্থনৈতিক কর্মকা- ব্যাহত হবে, কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতীতের বিভিন্ন গবেষণাতেও গড় বিনিয়োগের চাহিদা অনেকটা এ রকমই পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে ১ দশমিক ৬৫ কোটি কৃষক রয়েছেন। এটাকে যদি ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করি, তা হলে পরবর্তী কৃষির কর্মকা-ের জন্য কৃষকের প্রয়োজন পড়বে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। আগের ঋণ স্থিতি আদায় করতে সময় লাগবে। একদিকে আগের ঋণ স্থিতির পুনঃসঞ্চালনের প্রয়োজন পড়বে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের জন্য ঋণ প্রয়োজন।

আর্থিক খাতের ভূমিকা : আমাদের কৃষি অর্থনীতি সচল রাখার জন্য বিশাল অঙ্কের প্রয়োজন। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের নির্দেশে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার কৃষির জন্য স্কিম ঘোষণা করেছে। কিন্তু চাহিদা আরও বেশি। এ অবস্থায় করণীয় কী? কৃষির স্বার্থে অতিরিক্ত ১৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন পড়বে। এই ফান্ড বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারি প্রয়োজন পড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক পিকেএসএফ ও ব্যাংকের সহযোগিতায় অতিরিক্ত স্কিম গ্রহণ করতে পারে। টাকার জোগানের তুলনায় বেশি প্রয়োজন সঠিক ডেলিভারি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এখন যেহেতু গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ব্যাপক, সেহেতু তাদেই ঋণ বিতরণ এবং আদায়ের প্রধান মাধ্যম হওয়া উচিত। কৃষি ব্যাংক ছাড়া হোলসেল এজেন্সি যেমন পিকেএসএফের মাধ্যমে বিতরণ করা প্রয়োজন বেশি।

উপসংহার : কৃষক এবং কৃষি এখন খুব কঠিন সময়ের মধ্যে যাচ্ছে। কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে; কৃষি বাঁচলে গ্রামীণ অর্থনীতি বাঁচবে। গ্রামীণ অর্থনীতি বাঁচলে দেশ বাঁচবে। খাদ্যনিরাপত্তা আসবে। কৃষি খাত তথা গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন আর্থিক খাতের ভূমিকা। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে; বাংলাদেশ ব্যাংককে এগিয়ে আসতে হবে নতুন স্কিম নিয়ে। বেশি আলোচনায় আনা প্রয়োজন ঋণ বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত হবে সবগুলো আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা।

আমরা প্রায়ই ভুলে যায় যে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কোনো ভলান্টারি প্রতিষ্ঠান নয়; তারা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার (এমআরএ) দ্বারা লাইসেন্সপ্রাপ্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানÑ মূলত সামাজিক ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠান’। অন্যদিকে পিকেএসএফ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক বাজারের অংশ। গ্রামীণ অর্থনীতির অর্থায়নে গ্রামীণ আর্থিক বাজারকে দক্ষতার সঙ্গে সুষ্ঠুভাবে ব্যবহার করার মধ্যেই কৃষি তথা গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন নিহিত। চিরাচরিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সরকারের অর্থ মন্ত্রালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংককে ভাবতে হবে।

এমএ বাকী খলীলী : অধ্যাপক, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক অধ্যাপক, ফিন্যান্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

advertisement