advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনা ভাইরাস এবং আরেকটি যুদ্ধ

আবু জাফর মো. সালেহ্
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০৮:১৯
প্রতীকী ছবি
advertisement

আমাদের প্রিয় পৃথিবী আজ এক কঠিন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিপর্যস্ত, অসহায়, স্তব্ধ ও নির্বাক। নিষ্ঠুর নিয়তির মতো মৃত্যু আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রতিটি জায়গায়, বাসাবাড়িতে-হাসপাতালে-আঙিনায়-রাস্তায় সর্বত্র। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশও ভয়াবহ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। মানুষের জীবন ও জীবিকা আজ হুমকির সম্মুখীন। জীবন ও জীবিকার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি চিন্তা করা যায় না। তাই জীবন ও জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে সময় উপযোগী, সঠিক ও বাস্তবভিত্তিক কাক্সিক্ষত কৌশল গ্রহণ করতে পারাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। একটি উদীয়মান দেশ হিসেবে আমাদের রেমিট্যান্স, রপ্তানি, আমদানি, বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ, পর্যটনশিল্প ইত্যাদির ওপর কোরোনা ভাইরাসের বিরূপ প্রভাব এখনই দৃশ্যমান। এসব মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং আরও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ ক্রমেই জরুরি হয়ে পড়ছে।

করোনা সংক্রমণ রোধ এবং মহামারীর পর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় ঠেকাতে আমাদের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। গ্রামাঞ্চলে ছোট ছোট প্রকল্প গ্রহণ করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের সরবরাহ অব্যাহত রাখতে রেশন কার্ড ব্যবস্থা চালু করতে হবে। সর্বোপরি হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।

করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রবাসী শ্রমিকরা। তারা ছিলেন আমাদের জাতীয় আয়ের অন্যতম উৎস। বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের কষ্টার্জিত আয় রেমিট্যান্সের মাধ্যমে পাঠিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। এই করোনাকালে যারা দেশে এসেছেন এখন আমাদের উচিত প্রথমত তাদের স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সেবা নিশ্চিত করা। সরকারকে ধন্যবাদ দিই এ জন্য যে, ইতোমধ্যে সরকার তাদের জন্য বিনা জামানতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যেই আমাদের শ্রমিক সংখ্যা বেশি কিন্তু সেখানে তেলের দাম আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় (সর্বোচ্চ ছিল ১৫০ ডলার, যা এখন প্রায় ১০ ডলার) এবং মহামন্দার অভিঘাতে সেসব দেশে বেশিরভাগ শ্রমিক আর যেতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে। আর তাই দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে প্রবাসে নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান করতে হবে। তা ছাড়া দেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকল্প গ্রহণ করে এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব প্রবাস ফেরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ ছাড়া দেশে বিদ্যমান বেকার এবং করোনার প্রভাবে বেকারসহ সবার জন্য গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক কর্মসূচি (কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির মতো) গ্রহণ করে এবং মাইক্রো ও স্মল এন্টারপ্রেনারদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অত্যন্ত অল্প সুদে আরও প্রণোদনা দিয়ে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৭৮ লাখ মাইক্রো ও স্মল এন্টারপ্রেনার রয়েছে, যাদের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ কর্মসংস্থান হচ্ছে। এটা আরও বাড়াতে হবে। করোনার কারণে রপ্তানিবাজার পড়ে গেছে। এ জন্য আমাদের এখন নতুন নতুন চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে হবে। করোনা ভাইরাসের তা-বলীলা বিশ্ব অর্থনীতিকে মহামন্দার মধ্যে নিয়ে ফেলবে। সে জন্য কৃষির উৎপাদনও বাড়াতে হবে। কারণ আগামীতে বিশ্বের অনেক দেশ খাদ্য সংকটে পড়বে। উর্বর ভূমির দেশ হিসেবে আমরা আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন জোরদার করলে রপ্তানির সমূহ সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। ‘আমাদের দেশ যেহেতু উন্নয়নশীল দেশ তাই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি বেশি। অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, এ প্রণোদনা প্যাকেজ আমাদের সাময়িক সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবে, তবে লং টার্ম বা দীর্ঘমেয়াদে তা দিয়ে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও রূপরেখা প্রণয়ন।

করোনা ভাইরাস একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। তাই এর মোকাবিলা করতে যেসব ডাক্তার, নার্স, ব্যাংকার, পুলিশ, সাংবাদিকসহ ফ্রন্টলাইন যোদ্ধারা লড়ছেন, করোনাযুদ্ধ শেষ হলে তাদের সংবর্ধনা এবং সরকারের পক্ষ থেকে সম্মাননা পদক দেওয়া যেতে পারে। ‘আমাদের উচিত এখনই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় মুক্তিযুদ্ধের মতো নারী-পুরুষ, ধনি-গরিব নির্বিশেষে সবাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছিলাম। আমরা আশা করি, এই যুদ্ধেও বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে জয়ী হব।’

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. আবুল বারাকাত তার ‘করোনাভাইরাস-১৯ : সম্ভাব্য অনিশ্চয়তা ও করণীয় কল্পচিত্র’ নামক নিবন্ধে বলেছেন, ‘কোভিড-১৯ প্রতিরোধের জন্য মূল দায়িত্ব দিতে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক মনোনীত একজন জ্ঞানসমৃদ্ধ দেশপ্রেমিক ব্যক্তিকে, যিনি জনগণের পক্ষে সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি হবেন আর অন্যসব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়-বিভাগ-দপ্তর-অধিদপ্তর থাকবে একক দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই ব্যক্তির অধীন এবং সম্পূর্ণ কার্যক্রম সুচারুরূপে সমন্বয় ও পরিচালনের জন্য তিনি জরুরি অবস্থা বা ইমারজেন্সি বিবেচনায় প্রয়োজনে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা-নিরাপত্তা-জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট সবার নিঃশর্ত সর্বাত্মক সহায়তা নেবেন। এ যুদ্ধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হবেন চিফ অব কমান্ড আর একক দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্মানিত ব্যক্তিটি হবেন চিফ অব অপারেশনস। এর কোনো বিকল্প নেই।’ তার বক্তব্যকে সমর্থন করে আমাদের উচিত এখনই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া। এ যুদ্ধ হবে ‘অর্থনৈতিক মুক্তিযুদ্ধ’।

আবু জাফর মো. সালেহ্ : ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইসলামিক ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড (আইএফআইএল), সহসভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমিতি

advertisement