advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অতঃপর গণপরিবহন

ইকবাল খন্দকার
৪ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৪ জুন ২০২০ ০৮:১৫
advertisement

করোনার প্রতিষেধক যেমন আবিষ্কৃত হয়নি, তেমনি আবিষ্কৃত হয়নি প্রতিশব্দও। যদি আবিষ্কৃত হতো, তা হলে করোনার প্রতিশব্দ হতে পারত ‘সিদ্ধান্তহীনতা’। অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। কারণ এ দেশে করোনা আর সিদ্ধান্তহীনতা পাশাপাশি হেঁটেছে, হাঁটছে। রেললাইনের মতো সমান্তরাল হয়ে। যখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে করোনার সংক্রমণ শুরু হলো, তখন বিমান চলাচলে কড়াকড়ি আরোপের দাবি তুলল আমজনতা। কিন্তু এই দাবি কানে তুলল না কর্তৃপক্ষ। এর পর যখন খোদ বাংলাদেশেই করোনা রোগী পাওয়া গেল, তখন দাবিটা আরও জোরাল হলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তো বটেই, গণমাধ্যমও অনুরোধ করলÑ কোনোভাবেই যেন কাউকে দেশে প্রবেশ করতে দেওয়া না হয়। তবু কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগল এবং কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই প্রবেশ করতে দেওয়া হলো বিদেশফেরতদের। আর বেড়ে চলল আক্রান্তের সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা। তা এখনো অব্যাহত আছে। অন্যদিকে অব্যাহত আছে সিদ্ধান্তহীনতাও। পদে পদে সিদ্ধান্তহীনতা, সিদ্ধান্তে সিদ্ধান্তে সিদ্ধান্তহীনতা। এর পর ঈদ এলো। ঈদ গেল। আমরা জানতে পারলাম, কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাধারণ ছুটি আর বাড়ানো হবে না। অফিস-আদালত খুলে দেওয়া হবে। সিদ্ধান্তটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অর্থনীতিসহ দেশের সামগ্রিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সবাই মেনে নিল। তবে মানতে দেরিÑ যাতায়াতের বিষয়টি সামনে আসতে দেরি হলো না। কারণ অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল, গণপরিবহন চালু করা হবে না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। মুখে মুখে প্রশ্ন ঘুরে বেড়াতে লাগলÑ গাড়ি না চললে অফিসে যাব কীভাবে? এই প্রশ্নের জবাবে রসিকজনরা এমন উত্তরও দাঁড় করালÑ ঘোড়া কেনেন। ঘোড়ায় চড়ে অফিসে যাবেন। রসিকতা আর লাগাতার সমালোচনার মুখে কর্তৃপক্ষ রীতিমতো দিশাহারা হয়ে পড়ল। অবশেষে গণপরিবহন চালু না করার সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণিত করে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিলÑ বাস, ট্রেন, লঞ্চ, বিমান সবই চলবে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। স্বাস্থ্যবিধির ধরনটা এমনÑ শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণের সুবিধার্থে প্রতিটি গণপরিবহনে যাত্রী তোলা হবে অর্ধেক। বিশেষ করে যে সিটে আগে যাত্রী বসত দুজন, এখন বসবে একজন। আর বিদ্যমান ভাড়া বাড়বে ৬০ শতাংশ। ভাড়া নিয়ে আপত্তি থাকলেও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সবাই মেনে নিল। ব্যস, ঘটনা এখানেই শেষ। এর পর যা হয়েছে বা হচ্ছে, এর প্রায় সবই দুর্ঘটনা। ভাড়ার কথাই ধরা যাক। যেখানে অধিকাংশ মানুষের আয়-রোজগার বন্ধ ছিল দুই মাসেরও বেশি সময়, সেখানে ৬০ শতাংশ বাড়তি ভাড়াটাই ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো ব্যাপার। অথচ গণপরিবহন চলাচল শুরু হতে না হতেই চারপাশ থেকে অভিযোগ আসতে লাগল দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের। এর মানে, কোনো কোনো পরিবহন-মালিক ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়াতেও সন্তুষ্ট থাকতে পারছেন না। বাকি ৪০ শতাংশও পূর্ণ করে নিচ্ছেন। এমন অনিয়মও কেউ কেউ মেনে নিচ্ছেন এটা ভেবে যে, অর্থের ওপর চাপ পড়লেও যাতায়াতটা তো নিরাপদ হচ্ছে! কিন্তু না। গণমাধ্যমের খবর বলছে, যাতায়াতও নিরাপদ নয়। কেন নিরাপদ নয়? কারণ মানুষের লোভের কোনো অন্ত নেই। ভাড়াও বেশি নিচ্ছে আবার ঠেসে যাত্রীও তুলছে। অর্থাৎ অর্ধেক যাত্রী তোলার নিয়মকে তারা বৃদ্ধাঙ্গুল দেখাচ্ছে। আর এটা বেশি হচ্ছে লঞ্চে। সেখানে শারীরিক দূরত্ব নেই। আছে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি। যেমনÑ একজন হাসতে হাসতে বললেন, লঞ্চে যে পরিমাণ ভিড় দেখলাম, এতে দুই রকম ঘটনাই ঘটতে পারে। করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেও পারে আবার করোনা নির্মূলও হয়ে যেতে পারে। ভদ্রলোকের কথায় অবাক হলাম! বললাম, ভিড়ের কারণে অবশ্যই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, দ্বিমত নেই। তা হলে নির্মূলের কথা কেন আসছে? এটা তো একটা উদ্ভট কথা! ভদ্রলোক আগের মতোই হাসতে হাসতে বললেনÑ উদ্ভট কথা না রে ভাই, উদ্ভট কথা নয়। সাধারণ ভিড়ে সংক্রমণ বাড়লেও লঞ্চে যে পরিমাণ ভিড় দেখা যাচ্ছে, এতে করোনা দম বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস না পেলে যা হয়। আবার ধাক্কাধাক্কি-ঠেলাঠেলির সময় মানুষের শরীরের চাপা খেয়েও প্রাণ হারাতে পারে বেচারা করোনা। ভদ্রলোক নিতান্ত মজা করার জন্য কথাগুলো বললেও লঞ্চের ভিড় মজা বা রসিকতার বিষয় নয়, বরং আতঙ্কের বিষয়। তবে কর্তৃপক্ষ কতটা আতঙ্কিত, সেটি হচ্ছে প্রশ্ন। কর্তৃপক্ষ যদি আতঙ্কিত না হয়। যদি ভিড় কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তা হলে মৃতের সংখ্যা আমেরিকা-ইতালিকে ছাড়িয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। অতিরিক্ত যাত্রী ও অতিরিক্ত ভাড়াÑ এ দুই অনিয়মের বাইরে আরেকটি আতঙ্ক জাগানিয়া অনিয়ম যেটি হচ্ছে, তা হলো স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন। বিশেষ করে জীবাণুনাশক ব্যবহারে অবহেলা বা অমনোযোগিতা। সংক্রমণ রোধে নির্দিষ্ট বিরতিতে জীবাণুনাশক ছিটানো হবেÑ এমন শর্তেই মূলত গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অথচ প্রথম এক-দুদিনেই অনিয়ম-অবহেলার যা খবর পাওয়া গেছে, এতে হতাশ হওয়াই যায়। কারণ নিয়ম-কানুন তথা আইন দিন দিন ঢিলে হতে থাকে। অর্থাৎ প্রথমে কড়া থাকলেও কয়েকদিন পর আর ততটা কড়া থাকে না। আর গণপরিবহনে জীবাণুনাশক ছিটানোর নির্দেশ পালনে প্রথম থেকেই যদি গড়িমসি থাকে, তা হলে কয়েকদিন পর কী অবস্থা হবে? যে অবস্থা হবে, সেটিকে কি আদৌ ‘অবস্থা’ বলা যাবে? ‘দুরবস্থা’ বলতে হবে না? যত্রতত্র গাড়ি থামানো যাবে না, একটু পর পর যাত্রী তোলা যাবে নাÑ এমন নির্দেশও দেওয়া আছে। কিন্তু তা পালনের প্রবণতা নেই অধিকাংশ চালকের মধ্যেই। সব মিলিয়ে গণপরিবহন নিয়ম ভঙ্গ করছে গণহারে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? প্রথম উপায়Ñ কর্তৃপক্ষের কঠোরতা। কর্তৃপক্ষ কঠোর হলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিলে ভাঙা নিয়ম জোড়া লাগতে সময় নেবে না। এবার আসা যাক ব্যক্তি সচেতনতা প্রসঙ্গে। একজন মানুষ যদি সচেতন না হয়, তা হলে আইন করে সেটিকে নিরাপদ বা বিপদমুক্ত রাখাটা কঠিন। অনেকাংশে অসম্ভবও। মাস্ক ছাড়া গণপরিবহনে ওঠা রীতিমতো জেনেশুনে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার শামিল। অথচ এখনো অনেকে মাস্ক ছাড়াই উঠছেন বাস-লঞ্চে। আবার কেউ কেউ পরছেন ভুল পদ্ধতিতে। যাত্রীরা সচেতন হলে অনেক সময় ড্রাইভার-হেলপাররা চাইলেও অনিয়ম করতে পারে না। তাই ঠিকমতো জীবণুনাশক প্রয়োগ করল কিনা, সত্যি সত্যি অর্ধেক যাত্রী তোলা হচ্ছে, নাকি আরও বেশিÑ এসব বিষয়ে চোখ-কান খোলা রাখাও প্রত্যেক যাত্রীর কর্তৃব্য। এই সম্মিলিত সচেতনতা তথা সতর্কতাই পারে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে, এমনকি রুখে দিতে। আবার অতটা সতর্কতারও দরকার নেই, যতটা সতর্ক হলে বিপদ বাড়ে। আমার পরিচিত একজনের বিপদের কথাই ধরা যাক। গণপরিবহনে উঠতে গিয়ে তিনি দরজায় ঠাস করে বাড়ি খেলেন এবং ধপাস করে পড়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম কীভাবে পড়লেন। ভদ্রলোক বললেন, আমি খুব সতর্ক মানুষ তো! বললাম, সতর্ক হলে তো পড়ার কথা নয়। ভদ্রলোক বললেন, আসলে আমি করোনার ব্যাপারে এতটাই সতর্ক যে, কোথাও হাত লাগলে করোনায় আক্রান্ত হতে পারিÑ এই ভয়ে বাসের হ্যান্ডেল না ধরেই উঠতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ব্যালান্স হারিয়ে পড়ে গেলাম। বললামÑ এতই যদি আক্রান্ত হওয়ার ভয়, তা হলে গ্লাভস পরেননি কেন? গ্লাভস পরলেই তো যেখানে খুশি ধরতে পারেন। ভদ্রলোক এবার অন্য প্রসঙ্গে চলে যাওয়ার রাস্তা খুঁজলেন। আসলে এমন ভদ্রলোকে আমাদের চারপাশ ভরা। যারা একদিকে সচেতন তো অন্যদিকে অচেতন। এক চোখ খোলা রাখেন তো আরেক চোখ বন্ধ রাখেন। অথচ করোনার সব চোখ খোলা। কে যে কখন এর চোখে পড়ে যাব! কয়েকদিন আগে যখন আমরা গৃহবন্দি ছিলাম, তখন সংক্রমণের ঝুঁকি কম ছিল। আর এখন আমরা বাইরে, গণপরিবহনে। তাই এখন সংক্রমণের ঝুঁকি চতুর্মুখী। কাজেই আমাদের সাবধানতা আর সচেতনতাও হোক বহুমুখী।

ইকবাল খন্দকার : কথাসাহিত্যিক ও টিভি উপস্থাপক

advertisement