advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন চট্টগ্রাম বন্দরকর্মীরা অর্থনীতি রক্ষার লড়াই

মো. মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম
৬ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ৬ জুন ২০২০ ০০:০০
advertisement

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল সরকার। সরকারি-বেসরকারি অফিস, কল-কারখানা, পরিবহন সবকিছুই বন্ধ হয়ে যায়। এতে বড় ধরনের হুমকিতে পড়ে দেশের অর্থনীতি। খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ ও জরুরি পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বন্ধ হয়নি চট্টগ্রাম বন্দর। নিরাপত্তার জন্য সবাই যখন ঘরবন্দি তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়েছেন দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কর্মীরা। জাতীয় সংকটে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন তারা। পরিবহন, নৌ এবং নিরাপত্তা বিভাগের কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। সদ্য যোগ দেওয়া বন্দর চেয়ারম্যানের নিয়মিত তদারকিতে কাজ করেছে সচিব ও প্রশাসন বিভাগের কর্মীরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতীতে এ ধরনের সংকট তৈরি হয়নি কখনো। তাই জাতীয় সংকটে দেশের অর্থনীতির স্বার্থে দায়িত্ববোধ থেকেই কাজ করেছে সবাই। ঝুঁকি জেনেও কেউ কোনো ধরনের অজুহাত তোলেনি। বিভিন্ন ধরনের সুবিধার দাবি জানিয়ে প্রশাসনকে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেনি। ঝুঁকিভাতা, নিরাপত্তা, ক্ষতিপূরণ নানা দাবি উত্থাপন করে কাজে ব্যাঘাত ঘটানোর সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে উল্টো প্রশাসনকে সাহস জুগিয়েছেন তারা। সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে কীভাবে তারা কাজ করবেন; অসুস্থ হলে বা আক্রান্ত হলে কর্মী সংকটে কীভাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। দেশ, দেশের মানুষ ও অর্থনীতি সচল রাখার স্বার্থে তারা এখনো ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন-খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ পরিবাহিত হয়। ৯৮ শতাংশ রপ্তানি হয় এই বন্দর দিয়ে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণ ছুটির মধ্যে ঈদের দিন ৮ ঘণ্টা ছাড়া দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। প্রতিবছর রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। কিন্তু এবার কোনো ধরনের সংকট তৈরি হয়নি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিত্যপণ্যের চালান খালাস, ওষুধের কাঁচামাল ও বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম খালাসে অগ্রাধিকার

ছিল। দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিতে গিয়ে বন্দরের ৬১ জন কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। এর পরও কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করেনি কেউ। কর্মীদের ত্যাগের মূল্যায়ন করতে কাজ করছে বন্দর প্রশাসন। চট্টগ্রামে করোনা রোগীর চিকিৎসা সংকট থাকায় বন্দর হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধাসহ ৫০ শয্যার করোনা ইউনিট চালু সিদ্ধান্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম আবুল কালাম আজাদ আমাদের সময়কে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন। এটি সচল রাখার দায়িত্ব বন্দরকর্মীদের। দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে সবাই কাজ করেছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েক জন মৃত্যুবরণ করেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন অনেকেই। জীবনের ঝুঁকি জেনেও সবাই আন্তরিকভাবে এখনো কাজ করছেন দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। প্রণোদনা বা সুবিধা কী পাবেন সেটার চিন্তা করছেন না।

তিনি আরও জানান, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমের সাথে সরকারি-বেসরকারি ২০টি সংস্থা জড়িত। সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর অধিকাংশের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বন্দরে জট তৈরি হয়েছিল। তা নিরসনে আমরা যেসব সুপারিশ করেছি তা দ্রুত বাস্তবায়ন করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। জরুরি পণ্য ছাড়া অন্য পণ্য ছাড় দিচ্ছিল না কাস্টম, ব্যাংক খোলা ছিল ২ ঘণ্টা, পরিবহন বন্ধ ছিল। আমাদের সুপারিশের ভিত্তিতে পুরোদমে চালু হওয়ায় দুই সপ্তার মধ্যে জট নিরসন হয়েছে। বর্তমানে বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সহসভাপতি তরফদার মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বন্দরের কর্মীরা কাজ করেছেন। ফলে দেশে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়নি। পাশাপাশি টার্মিনাল অপারেটরগুলোও কাজ করছে। দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ করছেন, তাদের প্রণোদনা দেওয়া উচিত। বন্দরকে এগিয়ে নিতে সেসব সহযোগী প্রতিষ্ঠানকে সরকারি প্রণোদনা ও আর্থিক সুবিধা দেওয়া প্রয়োজন।

বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম জানান, ২৬ মার্চের সাধারণ ছুটির পর থেকে ২০ মে পর্যন্ত ৩ লাখ ১৯ হাজার টিইইউস কনটেইনার ওঠানামা করেছে। ১ কোটি ৩৮ লাখ টন পণ্য ওঠানামা হয়েছে; পেঁয়াজ ছাড় খালাস হয়েছে ৮৭ হাজার টন। আদা ওঠানামা হয়েছে ৮ হাজার টন, রসুন খালাস হয়েছে ৬ হাজার ৬৫০ টন। রমজান উপলক্ষে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল, খেজুর খালাস দেওয়া হয়েছে ৮৬ হাজার টন।

বন্দর কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আবুল মনছুর বলেন, করোনায় পরিবহন বিভাগের একজনের মৃতুর পর কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু আমরা দেশের স্বার্থে কাজ চালিয়ে যেতে। দেশের অর্থনীতি যাতে অচল না হয় সে জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কাজ করছেন সবাই।

বন্দরের ডেপুটি কনজারভেটর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম বলেন, নৌ বিভাগের ৮০০ জন কর্মী ঝুঁকিতে থেকে কাজ করছেন। তারা বিদেশি নাবিকসহ বিভিন্ন ধরনের লোকের সংস্পর্শে যাচ্ছেন। দেশ ও জাতির স্বার্থে তারা কোনো ধরনের আবদার-অনুরোধ ছাড়াই কাজ করছেন।

advertisement