advertisement
advertisement

নিজস্ব প্রেস রেখে ঢাবির ছাপা কাজ চলে বাইরে

পকেট ভরছে অসাধু কর্মকর্তা কর্মচারীর

৬ জুন ২০২০ ০৬:০২
আপডেট: ৬ জুন ২০২০ ০৮:০৮
advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসকে আধুনিকায়নের চেষ্টা চলছিল সেই নব্বই দশকের আগে থেকেই। প্রায় দেড় কোটি টাকায় কেনা হয় জাপানের তৈরি নতুন অফসেট মেশিন। নিয়োগ দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় লোকবলও। কিন্তু এত কিছুর পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা, জার্নালসহ ছাপার প্রায় সব কাজই করা হচ্ছে বাইরে থেকে। নিজেদের পকেট ভারী করতেই মূলত কর্তৃপক্ষকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে এসব করছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর এতে বছরে গচ্চা যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

জানা গেছে, নিজস্ব প্রেস থাকার পরও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসিক পত্রিকা, বার্ষিক রিপোর্ট বই, বিভিন্ন জার্নাল, বাজেট বই, ডায়েরি, বার্ষিক ক্যালেন্ডার বাইরে থেকে ছাপানো হয়। এমনকি অতিগোপনীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নও ছাপানো হয় অন্য প্রেস থেকে। এ কারণে কয়েক বছর ধরে প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে নানা সমালোচনা হলেও টনক নড়ছে না কর্তৃপক্ষের। টনক নড়বেই বা কী করে, নিজেদের প্রেসের কার্যক্ষমতা নিয়ে যে ভুল তথ্য দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুদ্রণ বিভাগ।

প্রশাসনিক ভবন সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালের প্রেসের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে জাপানের তৈরি নতুন অফসেট মেশিন কেনা হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। সেটি পরিচালনার জন্য আনা হয় দামি কম্পিউটার, নিয়োগ দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় লোকবল-পুরনো ঝেরে রূপান্তরিত করা পরিপূর্ণ কম্পিউটারাইজড সর্বাধনিক প্রেসে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ওই মেশিন দিয়ে হাইকোয়ালিটির রঙিন, সাদাকালো-যে কোনো ধরনের কাজ করা যায় খুব সহজেই। কিন্তু প্রায় দুই বছর অতিক্রম হলেও সেটিকে এক প্রকার অকার্যকর করেই ফেলে রাখা হয়েছে। এর অন্যতম কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে মুদ্রণ বিভাগের দেওয়া ভুল তথ্য।

কেননা ২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘ঢাবির প্রেসে সম্প্রতি একটি ডিমাই সাইজের সিঙ্গেল কালার অফসেট মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। তাই এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অফিস, হল-হোস্টেল, অনুষদ-বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র (এক কালার) ছাপানোর জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ অথচ নতুন মেশিন সরবরাহকৃত কোম্পানি ও মুদ্রণালয় বিভাগের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সর্বাধুনিক ওই প্রেসটি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কিছুই ছাপানো সম্ভব।

এ বিষয়ে মেশিন সরবরাহকৃত জেএমই লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) ইঞ্জিনিয়ার মো. ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন, ‘ঢাবির ওই মেশিন দিয়ে সব কিছুই ছাপানো যায়। সাপ্লাই দেওয়ার সময়ই পত্রিকাসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিস ছেপে আমাদের মেশিনের কোয়ালিটি এনসিওর করে কমিটির কাছ থেকে অনুমোদন নিয়েছিলাম। এখন যারা মেশিন কিনেছেন তারা সেটি দিয়ে কাজ না করলে আমাদের কী করার আছে? একই মেশিন দিয়ে তো অন্যান্য জায়গায় তাদের সব কাজই করছে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং মেশিন ক্রয় কমিটির প্রধান জীবন কুমার মিশ্র বলেন, ‘মেশিনটি এক কালারের হলেও এটি দিয়ে অন্য কাজও করা যায়। এক কালার করে চারবারে চার কালার চাপা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘গ্রাফিক্স ডিজাইন, নেমপ্লেট, লোকবলসহ পারিপার্শ্বিক সাপোর্ট থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাসিক পত্রিকা, জার্নালসহ যাবতীয় ছাপার কাজ করা যাবে।’

মুদ্রণালয় বিভাগের এক কর্মকতা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমাদের প্রেস থেকে সব কাজই করা যায়। কিন্তু অনেকেই এটা জানেন না। তাই সব কিছুই এখন বাইরে ছাপানো হয়। অথচ সেগুলো নিজেদের প্রেস থেকে ছাপলে অনেক কম খরচ পড়ত। তা ছাড়া মেশিন কেনা হয়েছে তো নিজেদের কাজ নিজেরা করবে বলেই। সে জন্য লোকও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমাসে তাদের পেছনে বেতন ও অন্যান্য বাবদ অনেক টাকা খরচ হচ্ছে। অতএব মেশিন থাকতে, লোক থাকতে কেন বাইরে ছাপা হচ্ছে, এটাই বড় প্রশ্ন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৬০টি জার্নাল ছাপা হয়। ওই টাকাগুলো তো বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকত। বাংলা একাডেমিসহ অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ছাপার মেশিন আছে। তারা নিজেদের ছাপার কাজ নিজস্ব ছাপাখানায়ই করছে। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য থাকার পরও আমরা বাইরে থেকে সব করছি। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন অফসেট মেশিনটি যখন কেনা হয় তখন সেটি পরিচালনার জন্য একজন মেশিনম্যানকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়োগকৃত প্রধান মেশিনম্যান মূলত একজন মেকানিক, আগে তিনি জেএমই লিমিটেডের মেশিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবেই কর্মরত ছিলেন। মেশিনে ছাপার কাজ করতে মোটেও পারদর্শী নন এ ব্যক্তি। বর্তমানে তাকে দিয়ে বাঁধাই শাখায় খাতা তৈরির কাজ করানো হয়।

এ ছাড়া কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া দুজনকে দিয়ে পুরনো পদ্ধতির সিসার টাইপের কম্পোজের কাজ করানো হচ্ছে, আরেকজন স্টোর শাখায় নন-টেকনিক্যাল কাজ করেন। আর ছাপার কাজ করার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন যে কম্পিউটারগুলো কেনা হয়েছিল, তার একটির সিপিইউ থেকে খুলে এনে সিসি ক্যামেরার মনিটর বানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মুদ্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজার ও উপপরিচালক মো. সামছুল আলম বলেন, ‘পরীক্ষা-সংক্রান্ত যত কাজ আছে তা আমরা আমাদের প্রেস থেকেই করে থাকি। পরীক্ষার খাতা, ভর্তি ফরম, প্রবেশপত্র আমরাই করি। তবে যেগুলো কালারিং কাজ সেগুলো বাইরে থেকে করানো হয়। কারণ ওগুলো করানোর জন্য আমাদের সে রকম মেশিন নেই, মেশিনম্যানও নেই।’

মেশিন সরবরাহকৃত প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ‘আমাদের যে মেশিন ও জনবল আছে; তা দিয়ে পত্রিকা, বার্ষিক রিপোর্ট বই, বিভিন্ন জার্নাল, বাজেট বই, ডায়েরি, বার্ষিক ক্যালেন্ডার- এগুলো ছাপানো সম্ভব নয়। এখন যারা বলে এগুলো সম্ভব তাদের এসে ছাপাতে বলেন। মেশিনটি তখন কেনা হয়েছিল শুধু পরীক্ষার খাতার কভার পেজের কাজ করার জন্য।’

নিয়োগকৃত মেশিনম্যানের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। তিনি সব কাজ করতেই পারদর্শী। যখন যেটা দরকার তখন সেটাই করেন। আমাদের পক্ষে যা যা করা সম্ভব আমাদের প্রেস থেকে তাই করছি।’

এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসে সব কাজ করা যায় না। তবে আমাদের যা প্রয়োজন তার অনেকটাই করা যায়। অনেক কাজও হচ্ছে এখন। তবে এটা দীর্ঘদিনের একটা জট। হঠাৎ করে সব ঠিক করে ফেলা যায় না। আস্তে আস্তে উন্নতি করে আমরা একটা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেব যে, যাবতীয় কাজ আমাদের প্রেসেই করার জন্য। উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আমরা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রেস তৈরি করব। আমি জানি এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজ বাইরে থেকে করানো হয়। পত্রিকা, বার্ষিক বইসহ সব কাজ যেন আমাদের প্রেসেই করা হয় তার ব্যবস্থা করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসে কোনো অনিয়ম হবে না।’

advertisement