advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

অর্থবছর ২০২০-২১ এর বাজেট করোনাকালের চ্যালেঞ্জ

মাহফুজুর রহমান
১২ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১২ জুন ২০২০ ০৮:২২
advertisement

বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে বাজেট ঘোষিত হলে গতানুগতিক প্রথানুসারে সরকারি দল বলে, এটা হলো যুগান্তকারী বাজেট। এ বাজেটে দেশকে উন্নয়নের শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছে। আর বিরোধী দলগুলোও গতানুগতিক প্রথায় বলে থাকে, এটি গরিব মারার বাজেট; এ বাজেট বাস্তবায়িত হলে গরিব আরও গরিব হবে এবং ধনীরা আরও ধনী হবে। বহুকাল থেকেই আমরা এই চর্বিতচর্বণ দেখে বা শুনে আসছি। এবারও এর ব্যতিক্রম হবে না বলেই আশা করা যায়।

বড় ধরনের কোনো চমক বা প্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার ছাড়াই ঘোষিত হয়েছে ২০২০-২১ সালের জাতীয় বাজেট। এ বাজেটে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে একটা বড় ধরনের বরাদ্দ নিশ্চিতভাবেই থাকবে বলে সবাই আশা করেছিলেন। কিন্তু বাজেটে তেমনটি দেখা গেল না। প্রতিবছরের মতোই গতানুগতিক ধারায় অর্থনীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাজেট ঘোষিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের বেলায় করোনার উপস্থিতি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ বিগত কয়েক বছর ধরে বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে ধারাবাহিকভাবে এর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে পৃথিবীর ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকা প্রকাশ করে বাংলাদেশের অবস্থান নবম বলে উল্লেখ করেছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের মুখে বর্তমান করোনা পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট ধাক্কা। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাবনার অনেকগুলো খাতে অনিশ্চয়তা এবং বেকার সমস্যা বৃদ্ধির বিশাল আশঙ্কাকে সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা খুবই কঠিন কাজ। বর্তমান সরকার অতীতে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ হাতে নিয়ে সফল হয়েছে; এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতকে আধুনিকীকরণের সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ বর্তমান পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ছিল বলেই অনেকের ধারণা।

এবারের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট আরও বাড়িয়ে এবং তা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে ঘাটতির পরিমাণ বেড়ে গেলেও তা প্রশংসারই দাবিদার হতো।

উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাজেট ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস হতে ৮০ হাজার ১৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সংগ্রহ করা হবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সরকার অর্থনৈতিক কূটনৈতিক তৎপরতাকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক উৎস হতে আরও অধিক পরিমাণে টাকা সংগ্রহ করার টার্গেট নিতে পারলে ব্যাংকের টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ চাহিদা পূরণে অধিক সক্ষম হতো। করোনা-উত্তর অর্থনীতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য শিল্প কারখানাগুলোসহ ব্যক্তিখাতে যে ঋণের চাহিদা দেখা দেবে তা ব্যাংকগুলো পূরণ করতে সক্ষম হবে কিনা তা আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাত এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে অন্যান্য বছরের মতো এবারও অধিক বরাদ্দ প্রদত্ত হয়েছে। করোনাবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনে এরূপ বরাদ্দ কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধি গত দশ বছর ধরে একটানা বেড়ে চলেছে এবং এশিয়ায় সর্বোচ্চ অবস্থানে ছিল। এবার করোনা ভাইরাসের জন্য দীর্ঘদিন লকডাউন থাকায় এবং রপ্তানি শিল্প ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি কমিয়ে শতকরা ৫.৪ করা হয়েছে। কিন্তু আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার আবারও শতকরা ৮.২ নির্ধারিত হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির নিরসন বা ঝুঁকি না কমে এলে এ টার্গেট পূরণও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তবে উচ্চতর টার্গেটের প্রত্যাশা সব সেক্টরকে অধিকতর গতিশীল করতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে সরকারের বরাদ্দ আগের চেয়ে অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। এ খাতের বরাদ্দ মোট বাজেটের শতকরা ৪.৯ ভাগ থেকে বাড়িয়ে শতকরা ৫.৬ ভাগে উন্নীত করা হয়েছে। করোনার বিধ্বংসী তা-বের মোকাবিলা করতে গিয়ে নতুনভাবে অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন। এসব মানুষকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যেই এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা একান্তই যৌক্তিক এবং প্রশংসার দাবিদার।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হচ্ছে কৃষি। দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভর করে। করোনার আক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি হয়ে গেলে এই কৃষি খাতই আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে। এবারের বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে। গত এক দশকে কৃষির প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আনুকূল্য খাতটিতে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলেছে। এ খাতে সরকারি/বেসরকারি বিনিয়োগের ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে, রপ্তানি আয়ও বেড়েছে। তাই এ খাতে আরও অধিক পরিমাণে বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা প্রশংসার দাবিদার হতে পারত। আমদানি খরচ যা-ই হোক না কেন, আগামী অর্থবছরে রাসায়নিক সারের বিক্রয়মূল্য অপরিবর্তিত থাকবে এবং কৃষি প্রণোদনা অব্যাহত থাকবেÑ যা প্রশংসার দাবি রাখে।

শিক্ষা খাতের আওতায় বিভিন্ন উপ-খাতে কিছু কিছু বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, গত মার্চের মাঝামাঝি সময় হতে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অবশ্য টেলিভিশন ও অনলাইনে কিছুটা দূরশিক্ষণ কাজ চালু হয়েছেÑ যা প্রকৃতপক্ষে খুবই অপ্রতুল। করোনা যদি প্রলম্বিত হয় তা হলে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হলে যে সমস্ত সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে তা সহজলভ্য করা বা ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিতরণ করার উদ্যোগ নিতে গেলে এই খাতে অধিকতর অর্থের প্রয়োজন হতে পারেÑ যা বাজেটে উপেক্ষিত হয়েছে বলেই মনে হয়। যদিও বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে যে, এ দীর্ঘ ছুটির ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের জোগান রাখা হয়েছে। প্রকৃতই সে ব্যবস্থা রাখা হয়ে থাকলে এবং শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হলে তা হবে প্রশংসাযোগ্য।

বাজেটে কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও সেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ইত্যাদি খাতে গ্রামের দরিদ্র কৃষক, বিদেশ ফেরত প্রবাসী শ্রমিক এবং প্রশিক্ষিত তরুণ ও বেকার যুবাদের গ্রামীণ এলাকায় ব্যবসা ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের জন্য ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে-যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এ কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে অতালিকাভুক্ত তিনটি ব্যাংক ও পিকেএসএফকে। এই ব্যাংকগুলোর শাখা দেশের সর্বত্র নেই এবং ব্যাপকভাবে ঋণ প্রদান ও আদায় কাজের অভিজ্ঞতাও আছে বলে মনে হয় না। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখার সংখ্যা ৪৮৫টি, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের শাখা ২৮টি এবং কর্মসংস্থান ব্যাংকের ২৪৬টি। সুতরাং দেশের সব এলাকার মানুষ এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা গ্রহণ করতে পারবে বলে মনে হয় না।

শেয়ারবাজার উজ্জীবিতকরণের জন্য সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে কিনা তা লক্ষ করা হচ্ছে না।

এ বছরের বাজেটে আবারও ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাগণ আয়কর রিটার্নে অপ্রদর্শিত জমি, বিল্ডিং, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্টের প্রতিবর্গমিটারের ওপর নির্দিষ্ট হারে এবং নগদ অর্থ, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শেয়ার, বন্ড বা অন্য কোনো সিকিউরিটিজের ওপর ১০ শতাংশ কর প্রদান করে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শন করলে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করবে না বলে জানানো হয়েছে। একইভাবে পুঁজিবাজারে অর্থ বিনিয়োগ করে ১০ শতাংশ আয়কর প্রদান করা হলে তা প্রশ্নাতীত রাখা হবে। এ উদ্যোগটি দেশে দুর্নীতিকে উসকে দিতে পারে। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে কেবল অপ্রদর্শিত আয়ের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা বলে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। দুর্নীতি বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ এভাবে ১০ শতাংশ কর প্রদানের মাধ্যমে বৈধ করার সুযোগ প্রদান নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য হবে বলেও মনে হয় না। এ বিষয়টিও পরে স্পষ্ট করা হবে বলেই মনে হয়।

আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে রিটার্ন ফরম সহজ ও এক পৃষ্ঠায় করার উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভার ইনভয়েসিং ও ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থ পাচার ও কর ফাঁকি দাতাদের ওপর ৫০ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব আপাতদৃষ্টিতে একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এ বিষয়গুলো ধরা এবং নিশ্চিত করা অনেকটাই কঠিন। এটি সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় করা গেলে নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় কাজ বলেই বিবেচিত হবে।

বিড়ি, সিগারেট ও জর্দায় শুল্ক বৃদ্ধি প্রশংসার দাবি রাখে। তবে ব্যাংকে রাখা আমানতের ক্ষেত্রে শুল্কের হার বৃদ্ধি নির্ধারিত আয়ের মানুষ, কষ্টার্জিত সঞ্চয়কারী, পেনশনধারী মানুষদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনিতেই ব্যাংকে আমানতের সুদের হার কমেছে, উপরন্তু এবার মূল্যস্ফীতির পরিমাণ আগের চেয়েও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। এর বাইরেও এই শুল্কবৃদ্ধি আমানতকারীদের জন্য বিশেষ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিষয়টি হয়তো সরকার পুনর্বিবেচনা করতে পারে।

সব শেষে এ কথা বলা যায় যে, করোনার ছোবলকে দৃশ্যমান রেখে বর্তমান কঠিনতম সময়ে সরকার ঘোষিত এ বাজেট যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ নিয়েই প্রণীত হয়েছে। তবে বিজ্ঞজনদের পরামর্শ অনুসারে প্রয়োজনীয় পরিমার্জন ও এর যথাযথ বাস্তবায়ন নিঃসন্দেহে দেশের কল্যাণ বয়ে আনবে।

মাহফুজুর রহমান : চেয়ারম্যান, এক্সপার্টস একাডেমি লি. এবং প্রাক্তন নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

 

advertisement