advertisement
Azuba
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement
advertisement

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা যতটুকু অগ্রগতি

ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান
১৬ জুন ২০২০ ০০:০০ | আপডেট: ১৬ জুন ২০২০ ০৯:১২
advertisement

নভেল করোনা ভাইরাস বা ‘সার্স কোভি-২’ এবং এই ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট ‘কোভিড-১৯’ রোগটির পৃথিবীতে আবির্ভাবের ছয়টি মাস হয়ে গেল। আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ, মৃত্যুর মিছিল, স্বজনদের হাহাকারÑ সব মিলিয়ে এখন করোনার সঙ্গে বসবাস করায় ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। সম্পূর্ণ নতুন বা নভেল ভাইরাসজনিত রোগটি প্রতিরোধ বা প্রতিকার করার জন্য বিশে^র কোথাও কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। এমনকি রোগটির গতি-প্রকৃতি, শরীরে এই ভাইরাস দ্বারা কোথায়, কীভাবে, কী কী ক্ষতি, কেমনভাবে হয় সেটা সুনির্দিষ্টভাবে জানতে বেশ অনেকটা সময় লেগেছে। এই রোগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা পেতে আমাদের এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। তবে থেমে নেই চিকিৎসাবিজ্ঞান ও গবেষকরা। সর্বোচ্চ মেধা ও প্রচেষ্টা তারা নিবেদন করেছেন এ ভাইরাসটির গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা পেতে এবং ভাইরাসটির প্রতিষেধক ভ্যাকসিন ও এ রোগটির চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ আবিষ্কার করার জন্য। অনেক ক্ষেত্রেই কিছুটা সফলতার সম্ভাবনা দেখা দিলেও উপসংহারে আসার সময় এখনো আসেনি। এখন পর্যন্ত এ রোগের চিকিৎসার যে অগ্রগতি, সেটা নিয়েই আজকের আলোচনা।

ভ্যাকসিন নিয়ে যত কথা : সারাবিশে^র সব বড় বড় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার জন্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, কোনো ভ্যাকসিন তৈরি করা এবং এটিকে প্রায়োগিক পর্যায়ে আনা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। ভ্যাকসিন তৈরির মূল কথা হচ্ছে, ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বা যে কোনো জীবাণুকে দুর্বল করে অথবা এই জীবাণুর মৃত কিছু অংশ শরীরে প্রয়োগ করা, ফলে জীবাণু রোগ তৈরি করতে পারে না কিন্তু আমাদের শরীরের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। তবে কোন মাত্রায় জীবাণুর কোন অংশ কীভাবে প্রয়োগ করা যায় যেন সেটা রোগ সৃষ্টি না করে শরীরে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলেÑ সেটাই গবেষণা করে নির্ধারণ করতে হয়। এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জীবাণুটির সম্পূর্ণ জেনেটিক মানচিত্র চিহ্নিত করা, কম্পিউটারের মাধ্যমে সম্ভাব্য মলিকিউল নকশা করা, যেটি এন্টিজেন হিসেবে কাজ করবে সেই অংশটিকে আলাদাভাবে তৈরি করা, পরিশোধন করা এবং প্রাণিদেহে এর কার্যকারিতা ও পাশর্^প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে, চীনের বিজ্ঞানীরা অতিদ্রুত ২০২০-এর জানুয়ারির প্রথমেই করোনা ভাইরাসের জিনগত বিন্যাসের মানচিত্র চিহ্নিত করেছেন, যা ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের কাজটি ত্বরান্বিত করেছে।

গবেষণাধীন ভ্যাকসিনটির কার্যকরিতা এর পর প্রাণিদেহে এবং এর পরবর্তী সময়ে সুস্থ মানবদেহে (স্বপ্রণোদিত) প্রয়োগ করা হয়। সুস্থ মানবদেহে ওষুধের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে সীমিত পরিসরে আরও চার পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়। সবশেষে কার্যকারিতা ও পাশর্^প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার অনুমোদনসাপেক্ষে ভ্যাকসিনটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আসতে পারে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পর এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগে। কখনো কখনো এই সময় ৮ থেকে ১০ বছর বা তার বেশিও লাগতে পারে। যেমনÑ এইচআইভি, হেপাটাইটিস সি, জিকা, এমনকি সার্স বা মার্স করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন এখনো পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য। বিভিন্ন বিত্তশালী দেশের সরকার সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও সহায়তা দিচ্ছে আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি নিয়মনীতি শিথিল করে ভ্যাকসিন উৎপাদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ এ প্রাণিদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ ও তার প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সময়কে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। স্বতঃপ্রণোদিত স্বেচ্ছাসেবকের দেহে প্রয়োগের জন্য কঠোর আইনি জটিলতা সহজ করা হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, ফেজ-২ বা ফেজ-৩ এর জন্য গবেষণায় ব্যাপকসংখ্যক মানবদেহে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে এটির কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে নিরাপত্তা সুনিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঔষধ প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধকে বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ব্যবহার অনুমোদন করতে পারে না।

কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের বর্তমান অগ্রগতি : সারাবিশে^র ৪০টি দেশের ৩৫টি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করার জন্য। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মে মাসের শেষ নাগাদ প্রায় ১২০টি প্রস্তাবিত ভ্যাকসিনের খবর এসেছে, এর মধ্যে ৭০টি প্রাক-ক্লিনিক্যাল এবং ছয়টি ক্লিনিক্যাল গবেষণা পর্যায়ে আছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা চেষ্টা করছে সব দেশের বিজ্ঞানীর মধ্যে একটি সহযোগিতা ও সংহতি মাধ্যম হিসেবে যোগাযোগ রক্ষা করতে, যার ফলে সংস্থাগুলোয় আবিষ্কার দ্রুততর হয় এবং এর সুফল বাণিজ্যিক দিকটি উপেক্ষা না করেও সর্বোচ্চসংখ্যক বিশ^বাসী পেতে পারে। যেমন অনেকে নিশ্চই জানেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গঙউঊজঘঅ এ ব্যাপারে পথিকৃত। গত ২৩ মে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাদের আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনটি ফেজ-১ ট্রায়াল শেষ কওে ফেজ-২ ট্রায়াল করার জন্য ফাস্ট ট্র্যাক অনুমতি পেয়েছে। এ পর্যায়ে ৬০০ সুস্থ ব্যক্তির ওপর এটি প্রয়োগ করে এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে জুলাইয়ের শেষে এটি ফেজ-৩ ট্রায়ালে প্রবেশ করতে পারে। মার্চে সম্পাদিত ফেজ-১ ট্রায়েলে দেখা গিয়েছিল যে, ৪৫ জন স্বতঃপ্রণোদিত আগ্রহী সুস্থ ব্যক্তির শরীরে প্রয়োগের পর আটজন ব্যক্তির ইতিবাচক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। তবে ফেজ-৩ ট্রায়াল এই ভ্যাকসিনের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যা সম্পন্ন হতে ১৮ মাস সময় লাগতে পারে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, আরও প্রায় সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির ব্যাপারে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। এদের মধ্যে আছে নোভাভাক্স, ইনোভা, ফাইজার অ্যান্ড বেনেডিক্ট, জনসন অ্যান্ড জনসন, সিনোভ্যাক, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি, সানোফি ইত্যাদি। এদের মধ্যে কেউ কেউ প্রাণিদেহে (যেমনÑ শিম্পাঞ্জি, বানর ইত্যাদি) ভ্যাকসিন প্রয়োগ সম্পন্ন করেছে। কেউ কেউ স্বেচ্ছায় রাজি হওয়া আগ্রহী ব্যক্তির ওপর ভ্যাকসিন প্রয়োগ করেছে (যেমনÑ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে স্বেচ্ছায় প্রথম যে দুজন ব্যক্তি এপ্রিলে ভ্যাকসিনটি নিয়েছিলেন তারা হচ্ছেন ওই বিজ্ঞানী দলের একজন অনুজীব বিজ্ঞানী ও অন্যজন একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ। তবে এই বিজ্ঞানী দলটি এখন ফেজ-২-৩ ট্রায়ালের জন্য ১০ হাজার জন আগ্রহী ব্যক্তির নিবন্ধন করছে (জুনের প্রথম সপ্তাহ)। যদিও সেপ্টেম্বর নাগাদ সম্ভাব্য ফলাফল ধারণা করা যাবে, তবুও পরিপূর্ণ ফলাফল জানতে আমাদের আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এই বিজ্ঞানী দল ইনহেলার ফর্মে (শ^াসের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য) ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ব্যাপারে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে উল্লেখ্য, অনেক সময় ফেজ-৩ ট্রায়ালের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ তথা তৃতীয় বিশে^র দেশগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিবন্ধন করতে পারে। ফলে বাণিজ্যিক অনুমোদন পাওয়ার অনেক আগেই বাংলাদেশের মানুষ হয়তো এই যে কোনো একটি ভ্যাকসিনের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।

কোভিড-১৯ এর ওষুধের বর্তমান অবস্থা : করোনা ভাইরাস একটি আরএনএ ভাইরাস। অন্যান্য যে কোনো ভাইরাসজনিত রোগের মতোই এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ওষুধ উদ্ভাবন ও প্রয়োগ একটি কঠিন প্রক্রিয়া। এর একটি প্রধান কারণ, এ ভাইরাস তার জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে। তাই সঠিক এবং নির্দিষ্ট ওষুধ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে একাধিক ওষুধ প্রয়োগ করে বেশ আশানুরূপ ফল পাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভ্যাকসিন আবিষ্কারের মতোই কোনো রোগের সুনির্দিষ্ট ওষুধ আবিষ্কার একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়া। বিশ^ব্যাপী মহামারীর এই জরুরি অবস্থায় বিজ্ঞানীরা নতুন ওষুধ আবিষ্কারের দীর্ঘ পথের পরিবর্তে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রোগে ব্যবহৃত সম্ভাব্য ওষুধ, যা করোনা ভাইরাসে কার্যকর হতে পারে সেগুলোকে প্রয়োগ করে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি : ঊনবিংশ শতাব্দী থেকেই এই চিকিৎসা পদ্ধতি বিভিন্ন সংক্রমক রোগে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিংশ শতাব্দী বিভিন্ন অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল ওষুধ জনপ্রিয় হওয়ায় এই চিকিৎসা পদ্ধতির গুরুত্ব কমে যায়। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নতুন ধরনের মহামারী যেমন ২০০২-এ ঝঅজঝ; ২০০৯-এ ঐ১ঘ১; বা ২০১২তে গঊজঝ-এর সংক্রমণের সময় এই চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগে সাফল্য পাওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কোভিড-১৯ রোগ থেকে সেরে ওঠা রোগীদের রক্ত থেকে আলাদা করা রোগ প্রতিরোধক উপাদান (অ্যান্টিবডি) যুক্ত প্লাজমা জটিল ও মুমূর্ষু কোভিড-১৯ রোগীদেও দেহে প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে। ইউএসএফডিএ (টঝঋউঅ) এই চিকিৎসা পদ্ধতি অনুমোদন দিয়েছে। তবে এই পদ্ধতি কার্যকর হতে হলে দাতার রক্তে যথেষ্ট পরিমাণ অ্যান্টিবডি উপস্থিত থাকতে হয় এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর ২৮ দিন অতিবাহিত হতে হবে। তবে চিকিৎসা পদ্ধতির ঝুঁকি বিবেচনা করে এটি এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অধীনে বিবেচনা করতে হবে।

কোভিড-১৯ এর অন্যান্য সহযোগী চিকিৎসা : আগেই আলোচনা করা হয়েছে কোভিড- ১৯ রোগের গতি-প্রকৃতি এবং রোগের ধরন সম্পর্কে আমাদের ধারণা বিগত কয়েক মাসে অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। আগের ধারণা অনুযায়ী এ ভাইরাসটি আমাদের ফুসফুসে প্রবেশ করে ‘ভাইরাল নিউমোনিয়া’জাতীয় ব্যাপক প্রদাহ তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে ফুসফুসের কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়া রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে ছড়িয়ে ভাইরাসটি সেপটিসেমিয়া বা সেপটিক শক করতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল করতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য ছিল যে, দেহে এ ভাইরাসের বৃদ্ধিকে যথাসম্ভব সীমিত করার জন্য বিভিন্ন অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োগ করা। এ ছাড়া ভাইরাসটি দ্বারা সৃষ্ট প্রদাহজনিত ফুসফুসের ক্ষতি সীমিত করার জন্য স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ, ইন্টারলিউকিন ৬-এর বিরুদ্ধে কার্যকর টসিলিজুমাব ইত্যাদি পরিস্থিতি অনুযায়ী শর্তসাপেক্ষে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ এ ভাইরাসের আক্রমণে সরাসরি প্রদাহ সৃষ্টির মাধ্যমে ফুসফুস যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, পাশাপাশি এই প্রদাহ শরীরে এমন কিছু শরীরবৃত্তিয় পরিবর্তন করে যে, আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা তৈরি হয়। প্রধানত ফুসফুসের রক্তনালিগুলোয় রক্ত জমাট বাঁধার ফলে ফুসফুস অকেজো হয়ে যায় এবং অক্সিজেনের অভাব হয়। একইভাবে হার্ট, ব্রেইন, কিডনির রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধলে ওই প্রত্যঙ্গগুলোর ক্ষতি হতে পারে এবং রোগীর মৃত্যু ত্বরান্বিত হয়। ফলে সরাসরি ভাইরাস নির্মূল করার জন্য অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের ব্যবহারের পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধা নিরোধক ওষুধ ব্যবহার এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সর্বোপরি সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট ফুসফুসের ক্ষতিজনিত কারণে অক্সিজেনের ঘাটতি হলে অক্সিজেন প্রয়োগ করার মাধ্যমে রোগীর শ^াস-প্রশ্বাসে সহায়তা করাই সত্যিকার অর্থে কোভিড-১৯ রোগের একমাত্র সুনিশ্চিত চিকিৎসা।

কোভিড-১৯ কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছু। কিন্তু এই ভয়াবহ অবস্থা আমাদের শিখিয়েছেও অনেক। প্রধানমন্ত্রী গত ৪ জুন ভার্চুয়াল ভ্যাকসিন সামিটে যোগদান করে বিশ্ব নেতাদের আহ্বান করেন যে, যেহেতু এই সংক্রামক ব্যাধি কোনো দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বিত্ত-দৈন্যের বিভেদ না মেনে সবাইকে সমান হারে সংক্রমিত করছে, তাই গোটা মানবজাতিকে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবেই এ ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় অবদান রাখতে হবে সবাইকে। বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কার করবেন, চিকিৎসকরা চিকিৎসা প্রয়োগ করবেন; কিন্তু ধৈর্যসহকারে, সাহসের সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জীবনযাপন করতে হবে জনসাধারণকে। আক্রান্তের সঙ্গে মানবিক আচরণ, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষের জন্য সহায়তা, তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে অর্থনীতির চাকার গতি সচল রাখার নতুন উপায় খুঁজে নেওয়াÑ সবই এখন সময়ের দাবি। সহযোগিতা, সহমর্মিতা আর আন্তরিক প্রচেষ্টা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে আবারও উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনবে নিশ্চয়ই। স্বাধীনতার অর্ধশততম বর্ষ অবশ্যই আমরা সাফল্যের সঙ্গে উদযাপন করব। এবার হবে নতুন বিজয়ের গল্প। করোনা ভাইরাসের ভয়াল অবস্থা থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক স্থবিরতা থেকে মুক্তি সংগ্রামের গল্প।

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান : অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগ ও কোষাধ্যক্ষ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়

advertisement